আবু জেহেল তনয় ইকরামা বর্শা হাতে বালকদের কাছে যায় এবং তাদেরকে বিভিন্ন কলা-কৌশল শিখাতে থাকে। বালকেরা এবার বর্শার ফলা হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শরীরে আমূল বিদ্ধ করতে থাকে। তারা বৃত্তাকারে নেচে-গেয়ে বল্লম বিদ্ধ করছিল। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর শরীর বর্শার আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। দেহের এমন কোন স্থান ছিল না, যেখানে বর্শা বিদ্ধ হয়নি এবং সেখান থেকে রক্ত টপটপ করে পড়েনি। মুখমণ্ডলেও বর্শার আঘাত করা হয়। অনেকক্ষণ ধরে ছেলেরা এভাবে নাচতে নাচতে এবং বর্শা মারতে মারতে হাফিয়ে উঠলে তখন ইকরামা এসে তাদের দূরে সরিয়ে দেয়। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন রক্তস্নাত। দেহে তখনও প্রাণ ছিল। চোখ ঘুরিয়ে চতুর্দিকে নজর বুলাচ্ছিলেন। শত জখমের মাঝেও মুখে শ্লোগান ঠিকই অব্যাহত ছিল। ইকরামা এবার তাঁর বরাবর এসে দাঁড়ায় এবং বর্শা উঁচু করে হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বুকে তীব্র বেগে আঘাত করে। ব্যবধান কম থাকায় বর্শা তার বক্ষ এফোঁড়-ফোড় করে দেয়। তিনি শহীদ হয়ে যান।
♣♣♣
৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের এক নৃশংস ঘটনা। অতীত এ ঘটনা স্মরণ হওয়ায় খালিদ হৃদয়ে এক গভীর বেদনা অনুভব করেন। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হত্যা কুরাইশ নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করছিল। শেষবারের মত তাদের নামায আদায় এবং ইসলাম ত্যাগের উপর মৃত্যুকে অগ্রাধিকার দান কুরাইশদের কয়েক সর্দারের অন্তরে গভীর দাগ কাটে। স্বয়ং খালিদ মনে মনে হযরত খুবাইব ও হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। মূলত এ ঘটনা থেকেই আবু সুফিয়ান ও তার স্ত্রী হিন্দার প্রতি তার হৃদয়ে অসম্মান ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়।
খালিদ মনে মনে বলেন– “এটা বীরের ধর্ম ও বৈশিষ্ট্য নয়”, “এটা কাপুরুষোচিত আচরণ, বীরের ক্ষেত্রে অশোভনীয়।”
যে সমস্ত কুরাইশ নেতারা শহীদ সাহাবীদ্বয়ের হত্যার বিরোধী ছিল তাদের আহূত এক বৈঠকে খালিদ হাজির ছিলেন।
“আপনারা জানেন কি, সেদিন যাদেরকে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হল, তারা মাত্র দু’জন ছিলেন না; বরং ছয়জন ছিলেন?” খালিদ নেতৃবৃন্দকে জিজ্ঞেস করেন।
এক নেতা জবাবে বলে “হ্যাঁ”, “এটা শারযা বিন মুগীছের কারসাজি ছিল। সে-ই এই ছয় মুসলমানকে প্রতারণাপূর্বক ফাঁদে ফেলে।”
“আর এর পিছনে মক্কার ইহুদীদের মস্তিষ্ক কাজ করে। খালিদ বলেন, ইউহাওয়া নাম্নী এক মহিলার সাথে আরও দু’তিন ইহুদী নারী নিয়ে গিয়ে তাদেরকে রূপের জাদুতে ঘায়েল করে।”
এক নেতা মন্তব্য করে– “ইউহাওয়া একজন জাদুকর মহিলা।”, “সে ইচ্ছা করলে ভাইকে ভাইয়ের হাতে খুন করাতে পারে।”
“এটা কি ভয়ের কারণ নয় যে, ইহুদীরা আমাদের একে অপরের দুশমনে পরিণত করবে?” আরেক নেতা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে বলে।
“না।” এক বয়োবৃদ্ধ নেতা বলে– “ইহুদীরা আমাদের মতই মুহাম্মাদের শত্রু। ইহুদীদের স্বার্থ নিহিত যে, তারা আমাদের আর মুসলমানদের মধ্যে বৈরীতা এত তীব্র করবে, যাতে আমরা মুসলমানদের নাম-নিশানা মিটিয়ে দিই।”
“এই মুহূর্তে ইহুদীদের প্রতি সন্ধিহান হওয়া উচিত হবে না।” এ নেতা বলে– “বরং উচিত হল, গোপনে ইহুদীদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা।”
“তবে সেটা এমন নয়; যেমনটি শারযা করেছে।” খালিদ বলেন– “আবার এমন নয়, যেমনটি দেখিয়েছে আবু সুফিয়ান এবং তার স্ত্রী।”
“এ খবর কেউ রাখ কি যে, ইউহাওয়া মক্কার কয়েকজন ইহুদীকে নিয়ে মদীনায় গেছে?” প্রবীণ নেতা অন্যান্যদের এ কথা জিজ্ঞেস করে নিজেই আবার বলে– “সে মদীনা ও মদীনার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ইহুদী এবং অন্যান্য গোত্রকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। ইহুদীরা ইসলামের প্রচার-প্রসারকে ‘ঈশান কোণে কালো মেঘ’ মনে করছে। যদি এভাবে মুহাম্মাদের আকীদা-বিশ্বাস প্রসারিত হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্রে মুহাম্মাদের অনুসারীরা বীরত্বের ধারা অব্যাহত রাখে, তাহলে ইহুদীদের সূর্য নিঃসন্দেহে ডুবে যাবে।”
খালিদ বলেন– “কিন্তু ইহুদীরা তো যুদ্ধবাজ জাতি নয়, তারা যুদ্ধের মাঠে আমাদের পাশে থাকার যোগ্য নয়।”
“যুদ্ধের মাঠে তারা মুসলমানদের জন্য বেশি ভয়ঙ্কর প্রমাণিত হবে।” আরেকজন মন্তব্য করে– “তারা ইউহাওয়ার ন্যায় আকর্ষণীয় ললনাদের মাধ্যমে মুসলিম নেতা এবং অধিনায়কদেরকে রণাঙ্গনে অবতরণের যোগ্যতা রাখবে না।”
খালিদের চিন্তা-চেতনায় ইউহাওয়া আবার চরে বসে এবং চার বছর পূর্বের কথা তার কানে গুঞ্জন হতে থাকে। তিনি মদীনার দিকে যতই অগ্রসর হন, উহুদের পাহাড় ততই মাথা উঁচু করে দৃষ্টিগোচর হতে থাকে। অতঃপর এক সময় পাহাড়গুলো এক এক করে চোখের দৃষ্টি হতে হারিয়ে যেতে থাকে। তার ঘোড়াটি গিরিপথ অতিক্রম করছিল। এটা এক মাইল দৈর্ঘ্য এবং ২২০ গজ বা তার চেয়ে কিছু বেশি চওড়া একটি বিস্তৃত নিম্নাঞ্চল। গম্ভুজের অনেক টিলা এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়। এগুলোর সবাই বালু মাটির। এক স্থানে এসে খালিদ কার যেন পদধ্বনি শুনতে পান তিনি চমকে পিছনে ফিরে তাকান এবং হাত চলে যায় তরবারির বাটে। কিন্তু এ আওয়াজ মানুষের পদধ্বনি ছিল না। চার-পাঁচটি হরিণ ছিল, যারা নিচের দিকে দৌড়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে একটি হরিণ আরেকটি হরিণকে গুতো মারে। এতে একে অপরের মোকাবিলা করতে শুরু করে। কিছুক্ষণ শিংয়ে-শিংয়ে দুই হরিণের লড়াই চলে। অন্যান্য হরিণগুলো দাঁড়িয়ে তামাশা দেখতে থাকে।
