গোলামটি ধন্যবাদ পাবার জন্য বুক ফুলিয়ে জনতার দিকে তাকায়। কিন্তু তারা ধন্যবাদ না দিয়ে চরম হৈ চৈ শুরু করে। আনন্দপ্রেমী দর্শকরা আক্ষেপ করে বলে, এটা আকর্ষণীয় কোন কিছু হল না। নিহত মুসলমান এমন সহজ মৃত্যুর উপযোগী ছিল না। আমরা আকর্ষণীয় কিছু দেখতে চাই।
“এত সহজে যে গোলাম এক মুসলমানকে হত্যা করল তাকে হত্যা কর।” উত্তেজিত কণ্ঠে হিন্দা বলে।
কয়েকজন তরবারি এবং বর্শা ঘুরাতে ঘুরাতে এ গোলামের দিকে এগিয়ে যায়, কিন্তু অপর কয়েকজন গোলামের সামনে এসে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
“খবরদার! সামনে এগুবে না।” অশ্বারোহী এক ব্যক্তি হুঙ্কার ছেড়ে বলে– “আরবের রক্ত এত শীতল নয় যে, দু’ব্যক্তিকে বেঁধে হত্যা করতে কুরাইশরা সকলে এসে জমায়েত হয়েছে। খোদার শপথ! আবু সুফিয়ানের স্থানে আমি হলে বন্দিদ্বয়কে মুক্ত করে দিতাম। এরা তো আমাদেরই রক্ত, আমাদেরই অতিথি। তাদের সাথে লড়তে হলে ময়দানে নেমেই লড়ব।”
“ঠিক! ঠিক!” জনতার ভীড় ফাঁক করে একাধিক আওয়াজ আসে– “দুশমনকে বাঁধা অবস্থায় কতল করা আরবের নীতি বিরুদ্ধ কাজ।”
সমবেত জনতার মধ্য থেকে অসংখ্য আওয়াজ এমন আসে যে, আমরা আকর্ষণীয় কিছু দেখতে চাই। আমরা শত্রুকে এমনভাবে হত্যা করতে চাই, যেন সে মরতে মরতে বাঁচে।”
কিছুক্ষণ পর জনতা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক ভাগে হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু এর হত্যার বিরোধী ছিল। কারণ, তারা এভাবে হত্যা করাকে আরব নীতির বিরুদ্ধ মনে করে। দ্বিতীয় ভাগটি হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে হত্যার জোর শ্লোগান তোলে। খালিদ জনতাকে এভাবে দু’ভাগে বিভক্ত হতে এবং একদল অপর দলের বিপক্ষে শ্লোগান দিতে দেখে দ্রুত আবু সুফিয়ানের কাছে চলে যায়।
খালিদ বলেন– “দেখেছ আবু সুফিয়ান! “দেখেছ এখানে আমার কত সমর্থক লোক রয়েছে। একজনকে হত্যা করেছ, এখন অপরজনকে মুক্ত করে দাও। অন্যথায় কুরাইশদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ লেগে যাবার আশঙ্কা রয়েছে।
হিন্দা আবু সুফিয়ানের কাছে খালিদকে দাঁড়ানো দেখে বুঝে ফেলে যে, সে খুবাইবের মুক্তির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে। হিন্দা দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের কাছে এসে হাজির হয়।
হিন্দা কঠোর ভাষায় বলে – “খালিদ!” –“আমি জানি তুমি কি চাও। আবু সুফিয়ানকে তুমি নেতা বলে স্বীকার কর না? না করলে এখান থেকে চলে যাও। আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবেই।”
আবু সুফিয়ান বলে, “খালিদ!” আমার সিদ্ধান্ত সঠিক না হলেও বাস্ত বায়িত হতে দাও। এখন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিলে সেটা হবে আমার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এরপর মানুষ আমার প্রতিটি নির্দেশের সাথে সাথে তা প্রত্যাহারেরও ধারণা রাখবে।
মদীনার যাত্রা পথে এসব স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে তার আফসোসও হয় যে, তিনি কেন সেদিন আবু সুফিয়ানের সিদ্ধান্ত মেনে নেন। খালিদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও গুণ ছিল সু-শৃঙ্খল সৈন্য পরিচালনা ও নেতার প্রতি আনুগত্য। সেদিন তিনি বুকে পাথর বেঁধে আবু সুফিয়ানের সিদ্ধান্ত শুধু এ কারণে মেনে নেন যে, যাতে কুরাইশদের মধ্যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ধারা তার থেকে চালু না হয়।
“মক্কাবাসী!” দু’শিবিরে বিভক্ত জনতাকে লক্ষ্য করে আবু সুফিয়ান উচ্চকণ্ঠে বলে– “দু’জন মুসলিম হত্যার প্রশ্নে যদি এখানে আমরা এভাবে দু’শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাই, তাহলে রণাঙ্গনেও কোন সাধারণ ব্যাপার নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যেতে পারি। তখন শত্রুদেরই বিজয় হবে। যদি নেতার আনুগত্য করতে এভাবে সরে যাও তাহলে তোমাদের পরিণাম হবে ভয়াবহ।”
জনতার হৈ চৈ ও উত্তেজনা হ্রাস পায়। তবে কয়েক নেতাকে মুখ ভার করে ফিরে যেতে দেখে সে। নেতাদের পিছু পিছু অনেক দর্শকও বাড়িতে চলে যেতে থাকে।
অবশ্য খালিদও এখানে থাকতে সম্মত নন। ঘটনা গৃহযুদ্ধের দিকে মোড় নেয়ার আশঙ্কা করছিলেন তিনি। তার কওমের অনেক লোক দর্শক হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিল। গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনা দেখা দিলে তিনি অন্তত নিজ কওমের লোকদের নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে আশাবাদী ছিলেন।
হিন্দা বিনোদনের সকল ব্যবস্থা সুসম্পন্ন করে রাখে। তার হাতের ইশারায় বর্শা হাতে চল্লিশজন অল্পবয়স্ক বালক হৈ চৈ করতে করতে দৌড়ে জনতার ভীড় থেকে বের হয় এবং হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশে গিয়ে তাকে ঘিরে নাচতে থাকে। কয়েকজন বালক বর্শা নিয়ে হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু পর্যন্ত গিয়ে বর্শা উঁচু করে নিক্ষেপ করত। কিন্তু বর্শা তাঁকে আঘাত করার পূর্বেই আবার হাত গুটিয়ে নিত। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু চমকে উঠে শ্লোগান দিয়ে উঠতেন– “আমার আল্লাহ্ সত্য এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।”
একদলের পর আরেকদল এসে এমন ভঙ্গিতে হামলা করত যেন এখনই হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দেহ চালনী হয়ে যাবে। কিন্ত তারা আঘাত মাঝপথেই ফিরিয়ে নিতে থাকে। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু বারংবার চমকে উঠায় উপস্থিত জনতা বালকদের ধন্য ধন্য করে ওঠে এবং খিল খিল করে হাসতে থাকে।
বালকদের এ খেলা কিছুক্ষণ চলতে থাকে। দ্বিতীয় পর্বে এসে তারা এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে যে, বর্শা এভাবে মারে যে, বল্লমের ফলা হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চামড়া সামান্য ভেদ করে। দীর্ঘক্ষণ এ ধারা চলতে থাকে। দর্শকরা ধন্যবাদ জানাত আর হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু “আল্লাহ আকবার”, “মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ” বলতে থাকেন। এরই মধ্যে হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পরিধেয় বস্ত্র রক্তে লাল হয়ে যায়।
