“না।” পর্দার অন্তরাল থেকে ক্রুদ্ধ এক নারীর আওয়াজ শোনা যায়। এটা ছিল আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার আওয়াজ। সে ক্রোধ কম্পিত হয়ে বলে– “হামযার কলিজা চিবিয়েও আমার আত্মা শান্ত হয়নি। দুনিয়ার সমস্ত স্বর্ণের বিনিময়ে হলেও আমি এ দু মুসলমানকে মুক্ত করতে দিব না।”
খালিদ বলেন– “আবু সুফিয়ান!” “যদি আমার স্ত্রী আমার কথার উপর এভাবে বলত, তাহলে আমি তার জিহ্বা টেনে ছিড়ে ফেলতাম।”
“স্ত্রীর জিহ্বা তুমি টেনে ছিড়তে পার?” হিন্দার প্রত্যুত্তর – “যুদ্ধে তোমার পিতা, চাচা ও পুত্র মারা যায়নি। এক ভাই বন্দি হলে তাও মদীনায় গিয়ে মুসলমানদের নির্ধারিত মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে এনেছ। যে আগুন আমার অন্তরে জ্বলছে তার তীব্রতা তোমার জানা নেই।”
খালিদ আবু সুফিয়ানের দিকে তাকান। তার চেহারাতে পৌরুষ সুলভ দীপ্ততা ও একজন দক্ষ সেনানায়কের বলিষ্ঠতার পাশাপাশি এক স্বামীর অসহায়ত্বের ছাপও স্পষ্ট ছিল।
আবু সুফিয়ান দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে– “হ্যাঁ খালিদ!” “বেদনাক্লিষ্ট ব্যক্তির অন্তরের অবস্থা তোমা থেকে ভিন্ন। কাউকে দুশমন ভাবা অনেক সহজ। কিন্তু আপনজনের রক্তের মোকাবিলায় কোন দুশমনকে মাফ করা অনেক কঠিন। এ দু’মুসলমানের প্রাণ বাঁচানোর ব্যাপারে কতজনকে রাজি করাতে পারবে? তুমি অনর্থক অনুরোধ করো না খালিদ। তাদের গোত্রের দয়া-মায়ার উপর তাদেরকে হাওলা করে দাও।”
খালিদ নীরবে প্রস্থান করেন।
এরপর খালিদের একটি ভয়ঙ্কর দৃশ্যের কথা স্মরণ হয়ে যায়। উম্মুক্ত প্রান্তরে দু’ খাম্বার সাথে দুবন্দি বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। হর্ষোৎফুল্ল জনতা হৈ-হুল্লোড় করে মাঠের চারপাশে জমায়েত হয়। এক সময় আবু সুফিয়ান ও হিন্দা অশ্বপৃষ্ঠে চড়ে সমবেত জনতার মাঝে উপস্থিত হলে উত্তেজনাকর শ্লোগান এবং উচ্চকিত প্রতিশোধমূলক বাক্য তীব্রতর উচ্চকিত হতে থাকে। এই জনসমুদ্রের মধ্যে কেউ যদি নীরব থাকেন তবে তিনি ছিলেন একমাত্র খালিদ।
আবু সুফিয়ান ঘোড়ায় চড়ে বন্দিদের কাছে যায়। তারা শেষবারের মত নামায আদায় করতে চান। আবু সুফিয়ান অনুমতি প্রদান করে।
খালিদ মদীনার পথে যাওয়ার সময় যখন তার সেই অতীত স্মৃতি মনে পড়ে যে, বন্দিদ্বয়কে বন্ধন মুক্ত করলে তারা অত্যন্ত স্থিরচিত্তে কেবলামুখী হয়ে নামায আদায় করেন, তখন এর যে গভীর প্রতিক্রিয়া তার মধ্যে প্রভাব ফেলে, দীর্ঘ চার বছর পরও তিনি সে প্রতিক্রিয়া আবার অনুভব করেন। ঘোড়ার পিঠে বসেই তার মস্তক অবনত হয়ে আসে।
হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত যায়েদ বিন দাছানা রাযিয়াল্লাহু আনহু জনগণের কলরব উপেক্ষা এবং মৃত্যুভয় এড়িয়ে নিবিষ্টমনে নামাযে হারিয়ে যান। নিরুদ্বেগ ও ধিরস্থিরভাবে নামাজ আদায় করেন। দোয়ার জন্য হাত উঠান। আল্লাহর দরবারে তাদের শেষ আরজি কি ছিল, তা কেউ বলতে পারে না। ইতিহাসও এ ব্যাপারে কিছুই বলেনি। তবে দুশমনের হাত থেকে মুক্তির আবেদন করেননি।
নামাজ শেষে তারা নিজেরাই নির্দিষ্ট খুঁটিতে গিয়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাড়িয়ে যান।
আবু সুফিয়ান হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে লক্ষ্য করে ঝাঝালো কণ্ঠে বলে– “বদ কিসমত মুসলমান।” “তোমাদের ভাগ্য এবং বাঁচা-মরা এখন আমার হাতে। বাঁচতে চাইলে বল, আমরা ইসলাম ত্যাগ করে কুরাইশদের দলে ভীড়েছি এবং ৩৬০ মূর্তিকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি … এতে রাজী না হলে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। মনে রেখ, তোমাদের মৃত্যু সহজ হবে না।”
হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গর্জে ওঠেন– “বাতিলের পূজারী আবু সুফিয়ান!” “পাথর দ্বারা নির্মিত ঐ মূর্তির উপর অভিশাপ, যারা নিজের শরীরে বসা মাছি পর্যন্ত তাড়াতে পারেনা। উযযা এবং হুবল মূর্তির উপর অভিশাপ দিই, যারা পরকালে তোমাদের জাহান্নামের কারণ হবে। আমরা এক ও অদ্বিতীয় পরম দয়ালু ও করুণাময়ের গোলামী করি এবং তাঁর প্রেরিত রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রাণাধিক ভালবাসি।”
“আমিও ঐ পথের পথিক যায়েদ যে পথ তোমাকে দেখিয়েছে।” হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলিষ্ঠ কণ্ঠে জানিয়ে দেন– “হে মক্কাবাসী! চিরন্তন সত্তা তিনিই, যার নামে আমরা জান কুরবান করতে যাচ্ছি। এতে আমাদের প্রাণ বিসর্জন হবে না, বরং আমরা লাভ করব এক নতুন জীবন, যা বর্তমান জীবন থেকে আরো সুন্দর, আরো উন্নত।”
আবু সুফিয়ান নির্দেশ দেয়– “খুঁটির সাথে তাদের বেঁধে ফেল।” “এরা জীবন নয়; মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদনে আগ্রহী।”
বন্দিদ্বয়ের হাত পিছমোড়া করে খুঁটির সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে দেয়া হয়। আবু সুফিয়ান ঘোড়া ঘুরিয়ে উপস্থিত জনতার দিকে এগিয়ে যায়।
আবু সুফিয়ান জলদগম্ভীর স্বরে উপস্থিত জনতার উদ্দেশে উচ্চারণ করে– “উযযা এবং হুবলের কসম!” –“মুহাম্মাদের অনুসারীরা যেরূপভাবে মুহাম্মাদের মহব্বতে হেসে-খেলে জীবন বিসর্জন দিতে প্রস্তুত অন্য কোন নেতার জন্য তার অনুসারীদের একজনও এমন পাওয়া যাবে না।”
ঘোড়ার পিঠে হিন্দা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। তার আশে-পাশে কয়েকজন গোলামও ছিল। এক গোলাম মনিবকে খুশি করার জন্য অতি উৎসাহ দেখায়। সে কারো নির্দেশ ব্যতীতই বর্শা হাতে দু’বন্দির দিকে দ্রুত ছুটে যায় এবং খুঁটির সাথে বাঁধা হযরত যায়েদ বিন দাছানা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বুক লক্ষ্য করে এমন প্রচণ্ডবেগে আঘাত করে যে, বর্শার ফলা তাঁর পিঠ ভেদ করে চলে যায়। তিনি তৎক্ষণাৎ শাহাদাত বরণ করেন।
