ইউহাওয়া তার রূপের যাদু চালাতেও ত্রুটি করেনি। তাকে উপলক্ষ্য করে একটি নৃত্যানুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে ইউহাওয়া প্রায় অর্ধউলঙ্গ ছিল। নামমাত্র তার কমনীয় শরীরে পোশাক ছিল। নাচতে নাচতে এক সময় এ অর্ধউলঙ্গ পোশাকটুকুও শরীর থেকে খসে পড়ে। ইহুদীরা প্রযোজকও সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল।
পরের দিন শারযার চোখ খুললে এই মাত্র সুন্দর কোন স্বপ্ন দেখে জাগ্রত বলে তার মনে হয়। মুসলমানদের সম্পর্কে তার পূর্বধারণা বদলে গিয়েছিল। অল্পক্ষণ পর গোত্রের অন্যান্য নেতাদের সাথে সে ইহুদীদের কাছে বসা ছিল। ইউহাওয়াও সেখানে ছিল। শারযা তাকে দেখেই অস্থির হয়ে ওঠে। হুড়মুড় করে উঠে গিয়ে ইউহাওয়ার হাত ধরে নিজের পাশে এনে বসায়।
শত্রুকে খোলা ময়দানে ডেকে এনে পরাস্ত করতে হবে, এটা মোটেও আবশ্যক নয়।” এক ইহুদী বলে– “আমরা মুসলমানদেরকে অন্যান্য উপায়ে নিঃশেষ করে দিতে পারি। একটি পদ্ধতি বলছি শোন।”
খালেদকে জানানো হয় যে, ছয় মুসলিম মদীনা থেকে এভাবে প্রতারণা করে নিয়ে আসার পরিকল্পনা ইহুদীরাই পেশ করেছিল। তাদের কথা মত মুসলমানদের প্রতারিত করতে শারযা যাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট প্রেরণ করে তাদের মধ্যে একজন ইহুদীও ছিল। খালিদ মুসলমানদেরকে নিকৃষ্ট দুশমন মনে করতেন ঠিক কিন্তু তাই বলে এই জঘন্য ও অনৈতিক পন্থা তিনি মোটেও পছন্দ করেন না।
খালিদ বিস্তারিত তথ্য জেনে বাড়িতে ফিরে এসে চাকরানীকে নির্দেশ দেন, এখনই যেন সে ইউহাওয়া, ইহুদী মহিলাকে ডেকে নিয়ে আসে। ইউহাওয়া এত তাড়াতাড়ি তার কাছে উপস্থিত হয় যেন সে তারই ডাকের অপেক্ষায় আশেপাশে কোথাও অপেক্ষমাণ ছিল।
১.৩ সাফল্যের সাথে ধোঁকা
খালিদ ইউহাওয়াকে বলেন– “তোমরা মুসলমানদেরকে সাফল্যের সাথে ধোঁকা দিতে সক্ষম হয়েছ।” “মুগীছের কওমের লোকেরাও তোমাদেরকে জাদুগীর বলছে। কিন্তু এ পন্থা আমার পছন্দ নয়।”
“মনোযোগ সহকারে আমার কথা শোন খালিদ!” ইউহাওয়া তার গা ঘেঁষে বসে এবং তার উরুর উপর হাত রেখে বলে– “এটা সত্য যে, তুমি একজন বিশিষ্ট বীর যোদ্ধা। কিন্তু তোমার জ্ঞান-বুদ্ধি এখনও পরিপক্ক হয়নি। দুশমনকে প্রতিহত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। তা তলোয়ারের মাধ্যমেই হোক, তীরের মাধ্যমেই হোক কিংবা দৃষ্টি-বাণ নিক্ষেপণের মাধ্যমেই হোক। তীর-তরবারি ছাড়া দুশমনকে বস বানানো আমার মত মহিলাই কেবল পারে।”
খালিদ ইউহাওয়ার শরীরের উত্তাপ অনুভব করেন। ইউহাওয়া তার এত শরীর ঘেঁষে বসেছিল যে, একবার ইউহাওযার চেহারা খালিদের দিকে ঘুরালে তুলার ন্যায় তার মোলায়েম গাল খালিদের গাল স্পর্শ করে। কিন্তু তারপরেও কোন খেয়ালে যেন একটু সরে বসেন।
দীর্ঘ চার বছর পর মরুভূমি পারাপারের সময় খালিদ পুনরায় তার গালে ইউহাওয়ার গালের স্পর্শ অনুভব করেন। ইহুদীরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের পাশে আছে– বিষয়টি তাকে খুশী করলেও তিনি ভাল করেই জানতেন যে, মুসলমানদের বিরোধিতায় ইহুদীরা তাদের জোট বাঁধলেও তাদের জাতীয় স্বার্থও এর সাথে জড়িত আছে। অবশ্য এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত হন যে, ইউহাওয়া জাদুবাজ না হলেও তার আপাদমস্তক অবশ্যই জাদুস্নাত।
খালিদের ঘোড়া মদীনার দিকে চলছে। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কথা আবার তার স্মরণ হয়। নিলাম স্থলে মানুষ উচদর হাঁকছিল। এক সময় বিক্রি হয়ে যায়। দু’কুরাইশ প্রচুর স্বর্ণের বিনিময়ে তাদেরকে কিনে নেয়। ক্রেতাদ্বয় দু’সাহাবীকে আবু সুফিয়ানের নিকট নিয়ে যায়।
ক্রেতাদ্বয় বলে– “আমরা দু’মুরতাদকে কিনেছি শুধু উহুদে নিহত কুরাইশদের রক্তের প্রতিশোধ নেয়ার জন্য।” “আমরা তাদেরকে আপনার হাতে তুলে দিচ্ছি। আপনি আমাদের সিপাহসালার।”
আবু সুফিয়ান বলে “হ্যাঁ”। মক্কাভূমি মুসলমানদের রক্ত পিয়াসী। তাদের রক্ত দ্বারা জমিনের পিপাসা মিটাও।… কিন্তু এখনই এটা সম্ভব নয়। কারণ, চলতি মাস আমাদের দেবতা হুবল ও উযযার সম্মানিত মাস। এ মাস সমাপ্ত হতে দাও। আর মাত্র একদিন বাকী। আগামীকাল উন্মুক্ত প্রান্তরে একটি খুঁটির সাথে তাদেরকে বেঁধে আমাকে খবর দিও।”
খালিদ আবু সুফিয়ানের এই নির্দেশ শুনে তার কাছে যান।
খালিদ আবু সুফিয়ানকে বলে– “আপনার এই সিদ্ধান্ত আমার পছন্দনীয় নয়।” সংখ্যায় দ্বিগুণ, তিনগুণ হওয়া সত্ত্বেও যদি আমরা লড়াইয়ের মাধ্যমে মাতৃভূমিকে মুসলমানদের রক্ত পান না করাতে পারি তাহলে প্রতারণা করে দুই মুসলিমকে ধরে এনে রক্ত ঝরানোর অধিকার রাখি না।… আবু সুফিয়ান! মুসলমানদের প্রতারণার মধ্যে তিন-চারজন মহিলারও দখল রয়েছে? তুমি কি চাও যে, দুশমন এ কথা বলার সুযোগ পাক যে, কুরাইশরা এখন মাঠে ময়দানে নারীদের নামিয়ে নিজেরা প্রাণ ভয়ে ঘরে বসে আছে?”
গম্ভীরকণ্ঠে আবু সুফিয়ান বলে– “খালিদ!” “খুবাইব এবং যায়েদকে আমিও এক সময় তোমার মত কাছের মনে করতাম। তুমি এখনও তাদের আগের দৃষ্টিতেই দেখছ। অথচ তুমি ভুলে গেছ যে, তারা এখন আমাদের প্রাণের দুশমনে পরিণত হয়েছে। একান্তই যদি তাদেরকে মুক্ত করতে চাও তাহলে দ্বিগুণ স্বর্ণের বিনিময়ে ক্রেতাদের কাছ থেকে তাদেরকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে পার।”
