“তাহলে তোমাদের তরবারি কিভাবে চলল?” খালিদ পাল্টা প্রশ্ন করেন– “যদি মুহাম্মাদের কাছে সত্যই যাদু থাকে, তাহলে সে তোমাদের সর্দার শারযার প্রতারণার ফাঁদে কিভাবে পরল? চার ব্যক্তিকে কি করে হত্যা করলে? গ্রেফতারকৃত এ দু’জনকে মুহাম্মাদের যাদু কেন ছাড়িয়ে নেয়না? মুক্ত করে না?… যাদু-টাদু কিছু নয়; আসল কথা হলো, তোমরা যার মোকাবিলার সাহস রাখ না তাকে যাদু বলে পাশ কাটিয়ে যাও।”
লোকটি বলে– “আমরা যাদু দ্বারা যাদু কেটেছি।” “আমাদের কাছে ইহুদী যাদুকর এসেছিল। তাদের সাথে তিনজন মহিলা যাদুকরও ছিল। এদের একজনের নাম ‘ইউহাওয়া’। আমরা তাদের যাদু-নৈপুণ্য স্বচক্ষে দেখেছি যে, ঘন ঝোঁপ থেকে একটি বর্শা বেরিয়ে আসে। বর্শাটি নিজে নিজেই ফিরে যায় এবং সাপ হয়ে আবার বেরিয়ে আসে। একটু পরে পুনরায় ঘন জঙ্গলে চলে যায়।
একদিকে ঘোড়া রাস্তা অতিক্রম করতে থাকে আর অন্যদিকে খালিদের স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টাতে থাকে। তিনি বেদনামাখা অতীত সম্মুখে আনতে চান না, কিন্তু বিষাক্ত ভীমরুলের ন্যায় অতীত তার স্মৃতিপটে ভাসতে থাকে। স্মৃতির পর্দা ইউহাওয়ার ছবি ভেসে ওঠে। সে জাদুকর ছিল কি-না, সে ব্যাপারে তিনি অনিশ্চিত। তবে তার রূপে, অঙ্গের ভাঁজে ভাঁজে, মুচকি হাসি এবং আলাপের ভঙ্গিতে অবশ্যই যাদু ছিল। তিনি শারযা বিন মুগীছের কওমের লোকটির কাছে ইউহাওয়ার নাম শুনেই চমকে ওঠেন। উহুদ যুদ্ধ শেষে কুরাইশরা মক্কা ফিরে গেলে মক্কার ইহুদীরা এমন ভাঙ্গা মন নিয়ে আবু সুফিয়ান, খালিদ এবং ইকরামার কাছে আসে, যেন ইহুদীদেরই উহুদে পরাজয় হয়েছে। ইহুদীদের সর্দার আবু সুফিয়ানকে বলে, মুসলমানদের পরাজয় হয়নি এবং কোন চূড়ান্ত ফলাফল ব্যতীত যুদ্ধ শেষ হয়েছে। অতএব এটা কুরাইশদেরই পরাজয়। ইহুদীদের চরম ব্যর্থতা…। ইহুদীরা কুরাইশদের নিকট এমনিভাবে সমবেদনা করে, যেন কুরাইশদের ব্যর্থতার বেদনায় তারা একেবারে মরে যাওয়ার উপক্রম।
এ সময় ইউহাওয়ার সঙ্গে খালিদের প্রথম দেখা হয়। তিনি তার অশ্বকে পায়চারি করানোর জন্য আবাসিক এলাকার বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে আসার সময় রাস্তায় ইউহাওয়ার সাথে সাক্ষাৎ হয়। ইউহাওয়ার মুচকি হাসি তাকে থামিয়ে দেয়।
“আমি মানতে পারছি না যে, ওলীদের পুত্র যুদ্ধ থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছে।” ইউহাওয়া মুখে এ কথা বলে খালিদের অশ্বের গলায় হাত বুলাতে থাকে। আবার বলে– “ঐ ঘোড়া আমার খুবই প্রিয় যা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়েছিল।”
খালিদ ঘোড়া থেকে এমনভাবে নিচে নেমে আসেন, যেন ইউহাওয়ার যাদুই তাকে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে মাটিতে এনে দাঁড় করায়।
এর চেয়ে ব্যর্থতা আর কি হতে পারে যে, তোমরা মুসলমানদের পরাস্ত করতে পারনি।” ইউহাওয়া বলে– “তোমাদের পরাজয় মানে আমাদেরই পরাজয়। এখন আমরা তোমাদের সঙ্গ দিব বটে কিন্তু আমরা সাথে থাকলেও তোমরা আমাদের দেখা পাবে না।”
খালিদ অনুভব করেন, তার জবান কেমন যেন জড়িয়ে যাচ্ছে। তরবারি, বর্শা এবং তীরের আঘাত মোকাবিলায় নিপুণ খালিদ ইউহাওয়ার মুচকি হাসির মোকাবিলা করতে পারে না।
খালিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেন। “ইহুদীরা যদি রণাঙ্গনে আমাদের সাথে সাথেই না থাকে তাহলে তাদের দ্বারা আমাদের আর কি কাজ হবে?”
“মানুষের দেহে শুধু তীরই বিদ্ধ হয় বলে মনে হয়?” ইউহাওয়া দার্শনিক ভঙ্গিতে বলে– “নারীর অধরের এক চিলতে হাসি তোমার মত বীর-বাহাদুরের হাত থেকে তরবারি ফেলে দিতে পারে।”
খালিদ তাকে কিছু প্রশ্ন করতে চান, কিন্তু সুযোগ পান না। ইউহাওয়া তার নয়নে নয়ন রাখে এবং অধরে ফুলের পাপড়ির মত মুচকি হাসির ঝলক তুলে চলে যায়। খালিদ অপলক নেত্রে তার যাওয়ার পথে চেয়ে থাকেন। শত চেষ্টা করেও চোখ ফিরাতে পারেন না। তিনি স্বীয় দেহে এক ধরনের শিহরণ অনুভব করেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। এক সময় তার অশ্বটি মাটিতে ক্ষুরাঘাত করলে তিনি বাস্তবজগতে ফিরে আসেন। তিনি দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে দেন। কিছুদূর এসে পিছনে তাকিয়ে দেখেন যে, ইউহাওয়া ঠায় দাঁড়িয়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। চার চোখের মিলন ঘটলে ইউহাওয়া হাত বিদায়ের ভঙ্গিতে হাত নাড়ায়।
♣♣♣
নিলামকৃত দু’মুসলমানের প্রতারণামূলক আটকের কথা এবং এর সাথে ইউহাওয়ার জড়িত থাকার কথা জানতে পেরে খালিদ এ রহস্য উদ্ধারে আগ্রহী হয়ে ওঠেন যে, ইউহাওয়া তার এ জাদু কি করে কার্যকর করল। হঠাৎ করে তারই গোত্রের এক নেতাগোছের লোকের সাথে তার দেখা হয়। সেই তাকে পুরো ঘটনা আদ্যোপান্ত বলেছে।
তিন-চারজন নেতৃস্থানীয় ইহুদী ইউহাওয়াসহ অন্য তিন ইহুদীকে নিয়ে শারযা বিন মুগীছের নিকট যায়। এই কওম দুর্ধর্ষ যুদ্ধবাজ হলেও তাদের উপর মুসলমানদের প্রভাব যাদুর ন্যায় প্রভাবিত হয়েছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জাদু আছে একথা এই গোত্রের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা যুদ্ধবাজ হওয়ায় ইহুদীরা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য এই গোত্রকে বেছে নেয়।
ইহুদী জাতটাই খুবই বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী। তারা চিন্তা করে মুসলমানদের জাদুর ধারণা এভাবে ছড়াতে থাকলে অন্যান্য গোত্রেও তার প্রভাব দেখা দিবে। এটা ঠেকাতেই মূলত ইহুদীরা গোত্রপ্রধান শারযার নিকট যায়। তাকে বিভিন্ন যুক্তি-তর্কে এই ধারণা ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে বোঝাতে চেষ্টা করে কিন্তু শারযা তাদের কথা বিশ্বাস করে না। ইহুদীদের অনুরোধে শারযা একটি খোলা ময়দানে রাতে তাদের পানাহারের ব্যবস্থা করে। ইহুদী অতিথিরা ধন্যবাদস্বরূপ মেজবানদের শরাব পান করায়। শারযাসহ নেতৃস্থানীয় লোকদের শরাব ছিল উন্নতমানের। এতে ইহুদীরা আবার হাশীশ নামক নেশা জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে দেয়। এরপর ইহুদীরা কিছু ভেল্কিবাজিও তাদের দেখায়।
