যাদের নিকট আত্মীয়-স্বজন উহুদে নিহত হয়, তারা পালাক্রমে মূল্যের অংক বাড়াতে থাক। হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের চেহারায় ভয় ভীতির কোন লক্ষণ ছিল না। উদ্বেগ উৎকণ্ঠাও ছিল না। খালিদ ভীড় ঠেলে সামনে যান।
এসো কুরাইশ নেতার বাহাদুর পুত্র।” খালিদকে আসতে দেখে হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু সজোরে বলেন–“হেরা গুহা থেকে উত্থিত বিপ্লবের যে আওয়াজ আমাদের দুজনের রক্ত প্রবাহিত করে তোমার জাতি কখনোই তা রোধ করতে পারবে না। তোমার গোত্রের যে কোন বীর-বাহাদুর নিয়ে এসো এবং আমার হাতের বাঁধন খুলে দাও, দেখবে কে কার রক্ত দ্বারা তৃষ্ণা নিবারণ করে।”
হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তেজোদীপ্ত কণ্ঠে বলেন– “রণাঙ্গনে পৃষ্ঠপ্রদর্শনকারী।” “পরাজয়ের প্রতিশোধ তোমরা আমাদের ভাইদের লাশ থেকে নিয়েছ। তোমাদের নারীরা আমাদের লাশের নাক-কান কর্তন করে এগুলো দ্বারা হার বানিয়ে গলায় পড়েছে।”
আজ চার বছর পর মদীনা যাওয়ার সময় হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কঠোর তিরস্কারের আওয়াজ খালিদের কানে বাজতে থাকে। তিনি হযরত যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর তিরস্কার সহ্য করতে পারছিলেন না। দীর্ঘ চার বছর পূর্বের সেই তিরস্কারের কথা মনে পড়ায় আজও তার শরীর ভীষণ কেঁপে ওঠে। সাথে সাথে তার স্মরণ হয় আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার পৈশাচিক অমানবিক আচরণের লোমহর্ষক দৃশ্য। হিন্দা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু এর কলিজা বের করে এনে মুখে পুরে চিবিয়ে পরে উগরে দেয়। নিহত মুসলমানদের নাক-কান কেটে আনতে সে অন্যান্য নারীদের নির্দেশ দেয়। তারা নাক-কান কেটে এনে তার সম্মুখে স্তুপ করলে হিন্দা তা সুতায় গেথে মালা তৈরী করে তা গলায় দিয়ে উন্মাদের ন্যায় সারা ময়দান জুড়ে নেচে-গেয়ে ফিরতে থাকে। এ দৃশ্য তার স্বামী আবু সুফিয়ানের আদৌ পছন্দনীয় ছিল না। আর খালিদ তো ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নেন।
তিন-চার মাস পর গ্রেফতারকৃত এবং হাত বাঁধা দুমুসলমান তাকে তিরস্কারের পর তিরস্কার করে চলছিল। খালিদ ঘৃণ্য পন্থায় প্রতিশোধ গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি সেখান থেকে চলে আসেন এবং ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যান। যারা দু’মুসলমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে আসে ঘটনাক্রমে তাদের একজনের সাথে খালিদের সাক্ষাৎ হয়ে যায়।
খালিদ তাকে জিজ্ঞেস করেন, তাদেরকে কিভাবে বন্দি করা হল? “আল্লাহর কসম!” লোকটি বলে, “তোমরা চাইলে তাদের রসূলকেও বন্দি করে এই নিলাম স্থলে নিয়ে আসতে পারি।”
“যা কোন কালেও পারবে না তার কসম করো না।” খালিদ বলেন– “তাদেরকে বন্দি করার বিস্তারিত তথ্য আমাকে জানাও।”
লোকটি বলতে থাকে। তারা ছিল ছয়জন”। আমরা উহুদে নিহতদের প্রতিশোধ গ্রহণ করেছি। ভবিষ্যতেও এ ধারা যথারীতি অব্যাহত থাকবে। আমাদের কওমের কয়েকজন লোক মদীনায় মুহাম্মাদের নিকট গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে এসেছে বলে জানায়। তারা তাকে একথাও জানায় যে, তাদের গোত্রের সমস্ত লোক ইসলাম গ্রহণ করতে আগ্রহী। কিন্তু তাদের সকলের পক্ষে মদীনাতে আসা সম্ভব নয়। তারা মুহাম্মাদের কাছে বিনীত অনুরোধ করে, যেন তাদের সাথে কয়েকজন মুসলমান প্রেরণ করেন যারা গোত্রের সবাইকে মুসলমান করবে এবং তাদেরকে ধর্মীয় দীক্ষায় দীক্ষিত করতে কিছুদিন সেখানে অবস্থান করবে।
আমাদের লোকেরা ছয়জন মুসলমানকে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। তারা আসতে থাকে। এদিকে আমাদের সর্দার ‘শারযা বিন মুগীছ’ একশ সৈন্য রযী নামক স্থানে প্রেরণ করে। মুসলিম দলটি এ স্থানে পৌঁছা মাত্রই আমাদের একশ সৈন্য তাদের ঘিরে ফেলে।.. তুমি হতবাক হবে যে তারা সংখ্যায় ছয়জন হওয়া সত্ত্বেও একশ সৈন্যের মোকাবিলায় প্রস্তুত হয়ে যায়। কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলে। সংঘর্ষে তিনজন নিহত এবং অন্য তিনজন বন্দি হয়। তাদের হাত রশি দিয়ে বাঁধা হয়। আমাদের সর্দার নির্দেশ দেয় যে, এরা মদীনার প্রতারিত মুসলমান। তাদেরকে মক্কায় নিয়ে গিয়ে প্রতিশোধেছুদের নিকট উচ্চমূল্যে বিক্রি করে দিবে।…
আমরা তিনজনকে মক্কায় নিয়ে আসছিলাম। পথিমধ্যে একজন কৌশলে বন্ধনমুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো সে মুক্ত হয়ে পালায়নি বরং অস্ত্রহীন থাকায় ভেল্কিবাজির মত আমাদেরই একজনের তরবারি কেড়ে নিয়ে চোখের পলকে আক্রমণ করে আমাদের দু’ব্যক্তিকে হত্যা করে। এত মানুষের সাথে কতক্ষণই বা লড়তে পারে। এক সময় সে মারা যায়। আমরা তাকে কেটে টুকরো টুকরো করেছি। এরা দু’জন রয়ে যায়। আমরা তাদের হাত আরো শক্ত করে বেঁধে নিয়ে এসেছি।”
“তোমরা খুবই খুশি।” খালিদ তিরস্কারের ভঙ্গিতে তাকে বলে– “কিন্তু মুহাম্মাদ এ ঘটনাকে কি করে মেনে নেবে?.. কুরাইশ এবং তাদের মিত্র গোত্র এমন কাপুরুষ হয়ে গেছে যে, তারা এখন ধোঁকা এবং ছয়জনের মোকাবিলা একশ জন দ্বারা করা শুরু করেছে। ঘৃণ্য এ প্রতারণামূলক গল্প শুনাতে তোমার একটুও লজ্জা হয়নি? একশ সৈন্য কি তাদের দুগ্ধপানকারিণী মাকে শরমিন্দা করেনি?”
“ওলীদের পুত্র। তুমি রণাঙ্গনে মুসলমানদের কি করতে পেরেছিলে?” লোকটি খালিদকে বলে, “তোমরা মুহাম্মাদের শক্তির মোকাবিলা করতে পার? এদের ১০০০ হাজার কুরাইশ মাত্র ৩১৩ জনের হাতে চরমভাবে মার খেয়ে আসে। উহুদের যুদ্ধে মুহাম্মাদের অনুসারীর সংখ্যা কত ছিল?… ৭০০ থেকে কম, বেশী নয়। অপরদিকে কুরাইশরা কতজন ছিল?… হাজার.. হাজার।.. শোন খালিদ। মুহাম্মাদের কাছে জাদু আছে। যেখানে জাদুর ভেল্কিবাজি চলে সেখানে তরবারি চলে না।”
