একজন নিজেকে গোয়েন্দা বলে স্বীকার করে।
“যাও।” আবু সুফিয়ান বলে– “আমরা তোমাদের মাফ করে দিলাম।”
ধৃত দু’মুসাফিরদ্বয় বাস্তবেই মুসলমানদের গোয়েন্দা ছিল এবং কুরাইশদের গতিবিধি জানতে আসে, তারা খুশি মনে নিজেদের উটের দিকে যেতে থাকে। আবু সুফিয়ানের ইশারায় কয়েকজন তীরন্দাজ তাদের প্রতি তীর নিক্ষেপ করে। প্রত্যেকের গায়েই একই সাথে একাধিক তীরবিদ্ধ হয়।
“তোমরা এর উদ্দেশ্য বুঝতে পারছ?” আবু সুফিয়ান পাশে দাঁড়ানো নেতাদের লক্ষ্য করে বলে– “গোয়েন্দা পাঠানোর অর্থ হলো মুসলমানরা পরাস্ত হয়নি। তারা এখনই অথবা কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের উপর আক্রমণ করতে চায়। বাঁচতে চাইলে এখনই মক্কায় চল এবং পরবর্তী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।”
পরের দিন এক দূত এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানায় যে, কুরাইশদের যাত্রাবিরতি স্থলে দু’গোয়েন্দার মৃতদেহ পড়ে আছে। আর কুরাইশরা মক্কায় চলে গেছে।
এটা ছিল খালিদের সর্বপ্রথম বড় যুদ্ধ। কিন্তু যুদ্ধে পর তার প্রতিক্রিয়া ছিল যে, তিনি মুসলমানদের পরাস্ত করতে পারেননি। চার বছর পর আজ আবার তিনি চিন্তা করেন যে, মুসলমানদের এ শক্তি কোন সাধারণ শক্তি নয়, অবশ্যই কোন গোপন রহস্য আছে যা অদ্যাবধি তিনি উদ্ধার করতে সক্ষম হননি। কুরাইশদের কিছু ত্রুটিও তার মনে পড়ে। কিছু কথা এবং কিছু কাজ তার ভাল লাগে নি। দুই ইহুদী রূপসী নারীর কথাও তার মনে পড়ে, নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের কাছে যাদের হামেশা চলাচল ছিল। তিনি জানতেন ইহুদীরা নারী-রূপের জাদুতে কুরাইশদের মোহাবিষ্ট এবং এ প্রক্রিয়ায় তাদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে উস্তাদ। এ হীন প্রক্রিয়া তিনি মেনে নিতে পারেন নি। কিন্তু এমনি এক নারীর সাথে একবার খালিদের সাক্ষাৎ হলে তিনি উপলদ্ধি করেন যে, তার মধ্যে যথেষ্ট জ্ঞান ও বিচক্ষণতা রয়েছে। মহিলাটির রূপ এবং যৌবনের প্রভাব তো ছিলই। অধিকন্তু তার কথার মাঝেও যে এক ধরনের মাদকতা রয়েছে তা খালিদও বুঝতে পারেন। মহিলাটি কিছুক্ষণ তার কল্পনারাজ্য দখল করে বসে থাকে। এক সময় ঘোড়া ডেকে উঠলে খালিদ-এর ঘোরকাটে। তিনি দ্রুত উঠেন এবং ঘোড়ায় চড়ে মদীনার পথ ধরেন।
♣♣♣
খালিদ ইবনে ওলীদ ছিলেন বিলাসী লোক। সৌখিনতা ও বিলাস-উপকরণেরও অভাব ছিল না। কিন্তু যুদ্ধ-বিগ্রহের নেশা এমনই যে, এর সামনে সকল প্রকার সৌখিনতা ও বিলাসিতা তুচ্ছ। মদীনার পথে গমনকালে ইউহাওয়া নাম্নী এক ইহুদী রূপসীর কথা তার মনে পড়ে। তিনি এই নারীকে স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেন। কিন্তু সে নানারূপের প্রজাপতি সেজে তার মাথার উপর উড়তে থাকে। তিনি তার কথা অন্তর থেকে মুছতে পারেন না।
খালিদের স্মৃতিতে উড়ন্ত প্রজাপতির রঙ মোহনীয় হয়ে আবার এক সময় সব রঙ রক্তিম রঙে রূপ নেয়। রক্তের মত টকটকে লাল। এটা ছিল এক ভয়ঙ্কর অতীত। যা তিনি স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করেন। রঙিন প্রজাপতি এক সময় বিষাক্ত ভীমরুলে পরিণত হওয়ায় তিনি তা মন থেকে ঝেড়ে মুছে ফেলতে নাকাম হন।
এটি ছিল উহুদ যুদ্ধের তিন-চার মাস পরের এক ঘটনা। এটাকে দুরভিসন্ধি বলা চলে। এতে তার কোন ভূমিকা না থাকলেও কুরাইশদের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। সেজন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোন ষড়যন্ত্রে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও এ বিষয় এড়িয়ে যাওয়াও তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।
উহুদের রণাঙ্গনে আহত কোন কোন কুরাইশের জখম এখনও পুরোপুরি ভাল হয়নি। ইতোমধ্যে হঠাৎ একদিন খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, ছয় সদস্যের এক মুসলিম দল ইসলাম প্রচারের উদ্দেশে রযী নামক স্থানে যাওয়ার সময় আসফানের অনতিদূরে এক অমুসলিম কওম তাদের বাধা দেয়। তাদের মধ্যে থেকে দু’জনকে মক্কায় নিয়ে নিলাম করা হচ্ছে।
খালিদ দ্রুত নিলাম স্থলে চলে যান। নিলামকৃত দু’মুসলমানের একজন হযরত খুবাইব রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আরেকজন হযরত যায়েদ বিন দাছানা রাযিয়াল্লাহু আনহু। উভয়ে খালিদের ঘনিষ্ঠ ও পরিচিত লোক। তারা তারই গোত্রের লোক। ইসলাম গ্রহণ করে তাঁরা মদীনায় চলে যান। রাসূল-প্রেমে তারা খুবই উজ্জীবিত ছিলেন। যে কোন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে খুব মহব্বত করতেন। তারা একটি চত্বরের উপর দাঁড়িয়ে ছিলেন আর তাদের আশে-পাশে ছিল কুরাইশদের প্রচণ্ড ভীড়। চার ব্যক্তি তাদের কাছে দণ্ডায়মান ছিল। উভয়ের হাত ছিল রশি দ্বারা বাঁধা।
জনৈক ব্যক্তি চত্বরের পাশে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করছিল “এরা মুসলমান।” “এরা উহুদে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। তাদের হাতে তোমাদের আত্মীয়-স্বজন নিহত হয়েছে। প্রতিশোধের আগুন নির্বাপিত করার কেউ আছ কি?… তাদের কিনে নিয়ে যাও। নিজ হাতে হত্যা করে রক্তের প্রতিশোধ নাও।.. সবচে বেশী মূল্য যে দিবে তার হাতেই তাদের তুলে দেয়া হবে।..দাম বলো।”
“দু’টি ঘোড়া” একজন বলে।
“বলো… বেশি করে বলো।” নিলামদার লোকটি পুনরায় বলে।
“দুটি ঘোড়া আর একটি উট।” আরেকজন বলে।
“ঘোড়া-উট নয়, স্বর্ণের কথা বল।… স্বর্ণ নিয়ে এসো.. দুশমনের রক্তে প্রতিশোধের তৃষ্ণা মিটাও।” নিলামদার কড়া স্বরে বলে।
