আবু সুফিয়ান ঠাট্টাচ্ছলে অট্টহাসি দিয়ে উচ্চকণ্ঠে বলে– “ইবনে খাত্তাব! তোমার আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করুক। তুমি এখনও আমাদের শাস্তির কথা বলছ? তুমি নিশ্চিত করে বলতে পার যে, মুহাম্মাদ বেঁচে আছে?”
‘আল্লাহর কসম! আমাদের নবী জীবিত।” হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জবাব আসে– “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের প্রতিটি শব্দ শুনতে পাচ্ছেন।”
আরবের প্রথা ছিল, যুদ্ধ শেষে দু’পক্ষের অধিনায়ক একে অপরের প্রতি ব্যঙ্গোক্তির তীর ছুড়ত। আবু সুফিয়ান সে প্রথা অনুযায়ী দূরে দাঁড়িয়ে হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে কথা চালাচালি করতে থাকে।
“তোমরা হুবল এবং উযযার সম্মান জান না।” আবু সুফিয়ান বলে।
হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকান। জোরে কথা বলার মত পরিস্থিতি তাঁর ছিল না। তিনি হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জবাব শিখিয়ে দেন।
‘বাতিলের পূজারী শোনে রাখ” হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চঃস্বরে বলেন– “আল্লাহ্র বড়ত্ব ও মহত্ব সম্পর্কে জেনে নে; যিনি সুমহান এবং সর্বশক্তিমান।”
“আমাদের হুবল দেবতা এবং উযযা দেবী আছে।” আবু সুফিয়ান বলেতোমাদের কি এমন কেউ আছে?”
“আমাদের আছেন আল্লাহ।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জবানে জানিয়ে দেন, যা হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চঃস্বরে বলেন–“তোমাদের কোন আল্লাহ নেই।”
আবু সুফিয়ান বলে–“যুদ্ধের ফলাফল বেরিয়ে গেছে” “তোমরা বদরে বিজয় লাভ করেছিলে। আমরা এই পাহাড়ের পাদদেশে তার উপযুক্ত প্রতিশোধ নিয়েছি। আগামী বছর আমরা তোমাদেরকে বদরের রণাঙ্গনে আবার মোকাবিলার জন্য আহবান করব।
“ইনশাল্লাহ্!” হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথাগুলো উচ্চঃস্বরে শুনিয়ে দেন–“তোমাদের সাথে আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎ বদর প্রান্তরেই হবে।”
আবু সুফিয়ান সেখানে আর বিলম্ব করেনি। ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দ্রুত চলে যেতে থাকে। কিন্তু দু’কদম গিয়ে আবার থমকে দাঁড়ায়।
“ওমর, আবু বকর এবং মুহাম্মাদ।” আবু সুফিয়ান একটু ক্ষীন আওয়াজে বলে–“মৃতদেহ উদ্ধার করতে গেলে কিছু লাশ বিকৃত পাবে। আল্লাহর কসম করে বলছি, লাশ বিকৃত করতে আমি কাউকে আদেশ দেইনি। আর এমন আচরণ আমি পছন্দ করিনা। তারপরেও এর জন্য আমাকে দায়ী করা হলে কিংবা এ জন্য আমাকে অভিযুক্ত করা হলে সেটা আমার অপমানই হবে।” এ কথাগুলো বলে আবু সুফিয়ান ঘোড়া ছুটিয়ে নিজ বাহিনীর কাছে চলে আসে।
পথ চলতে চলতে এক সময় খালিদের ঘোড়া নিজেই নিজের গতি পরিবর্তন করে। তিনি ঘোড়ার এই ইচ্ছায় বাধা দেননি। বুঝতে পারলেন ঘোড়া পানির সন্ধান পেয়েছে। কিন্তু দূরে গিয়ে সে নিচের দিকে অবতরণ করতে থাকে। তিনি জায়গাটি চিনতে পারেন। উহুদ যুদ্ধ শেষে প্রত্যাবর্তনকালে কুরাইশরা এস্থানে কিছুক্ষণ অবস্থান করেছিল। নিচে পানির প্রচুর মজুদ ছিল। ঘোড়া দ্রুততার সাথে পাথুরে জমিন মাড়িয়ে পানির নিকট এসে দাঁড়ায়। খালিদ লাফিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে হাঁটু গেড়ে বসে অঞ্জলি ভরে পানি নিয়ে চোখে-মুখে ঝাপটা মারেন। একটু আরামের জন্য ধূসর এক স্থানে বসে যান। উহুদ থেকে প্রত্যাবর্তন সময়ের একটি ঘটনা এখানে তাঁর স্মরণ হয়। তারা যখন উহুদ থেকে প্রত্যাবর্তন করে এই স্থানে এসে যাত্রাবিরতি করে তখন একটি বিষয় তাদের মধ্যে বিতর্কের সৃষ্টি করে। বিষয়টি হচ্ছে যে, মক্কায় চলে যাওয়া ভাল হবে না-কি মুসলমানদের উপর আরেকবার আক্রমণ করা হবে।
সফওয়ান ইবনে উমাইয়া বলে– “আমরা পরাজিত নই। মুসলমানদের বিপর্যস্ত অবস্থা থেকে ফায়দা লুটতে চাইলে নিজেদের অবস্থারও একটু পর্যালোচনা কর। আমাদের জোশ-শক্তিও নিস্তেজ প্রায়। এমতাবস্থায় পুনরায় মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ঠিক হবে না। ভাগ্য আমাদের বিপক্ষে চলে যেতে পারে।”
এই বিতর্ক চলার সময় কুরাইশ সৈন্যরা দু’জন মুসাফিরকে টেনে হেঁচড়ে তাদের অধিনায়কের সামনে এনে দাঁড় করায়। তাকে জানানো হয়, তারা নিজেদেরকে মুসাফির হিসেবে পরিচয় দিচ্ছে। আমাদের তাঁবুর আশে-পাশে সন্দেহজনকভাবে এদেরকে ঘুরাফেরা করতে দেখা যায় এবং চার-পাঁচজনের নিকট তাদের গন্তব্যস্থল জানতে চায়। মুসাফিরদ্বয় আবু সুফিয়ান ও অন্যান্য নেতাদের কাছেও নিজেদের মুসাফির বলে পরিচয় দেয়। একটি স্থানের নাম বলে সেদিকে যাচ্ছে বলে জানায়। আবু সুফিয়ানের নির্দেশে তাদের পরিহিত ছেঁড়া-ফাটা পোশাক খুলে ফেলা হলে অভ্যন্তরে লুকানো খঞ্জর এবং তরবারি বেরিয়ে যায়। তাদেরকে এই গোপনীয়তার কারণ জিজ্ঞেস করলে তারা সন্তোষজনক কোন উত্তর দিতে পারে নি। খালিদের গভীর সন্দেহ হলো যে, ধৃত মুসাফির মুসলমান গোয়েন্দা। তাদেরকে সকলের সম্মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে কেউ তাদের চেনে কি-না জিজ্ঞেস করা হয়।
দুই-তিন জন জানায়, তারা তাদের চেনে। তারা মদীনার লোক।
“একজনকে আমি ভাল করে চিনতে পেরেছি।” এক কুরাইশ দাঁড়িয়ে বলল – “সে আমার বিরুদ্ধে লড়েছিল।”
“তোমরা নিজেরাই বলো যে, তোমরা মুহাম্মাদের গোয়েন্দা।” আবু সুফিয়ান তাদের দু’জনকে বলে– “এবং যাও, আমি তোমাদের প্রাণ ভিক্ষা দিলাম।”
