খালিদ হিন্দাকে ভাল করেই চিনতেন। তিনি আবু সুফিয়ানের অসহায়ত্ব বুঝতে পারেন। আবু সুফিয়ান মাথা নত করে থেকে এক সময় ঘোড়ার লাগাম টেনে দ্রুত সেখান থেকে প্রস্থান করে। খালিদও বেশিক্ষণ এই দৃশ্য সহ্য করতে পারেনি।
হিন্দা হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কলিজা চিবিয়ে পরে যখন উদগিরণ করে দেয় তখন পিছনে কারো পদধ্বনি শুনে ফিরে তাকায়। তার পেছনে ওয়াহশী দাঁড়িয়ে ছিল। তার হাতে আফ্রিকী বর্শা। এই বর্শার আঘাতেই সে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কাপুরুষোচিতভাবে হত্যা করে।
“ইবনে হারব! এখানে কি করছ।” হিন্দা নির্দেশের সুরে তাকে বলে– “যাও, অন্যান্য মুসলমানের লাশও এভাবে টুকরো টুকরো কর।”
ওয়াহশী মুখে খুবই কম কথা বলত। সে তার বেশির ভাগ প্রয়োজন ইশারায় পূরণ করত। সে হিন্দার নির্দেশ পালনের পরিবর্তে স্বীয় হস্ত হিন্দার সম্মুখে বাড়িয়ে দেয়। ওয়াহশীর দৃষ্টি ছিল হিন্দার গলায় শোভিত স্বর্ণালঙ্কারের প্রতি। এতেই পূর্ব প্রতিশ্রুতির কথা হিন্দার মনে পড়ে যায়। সে যুদ্ধের শুরুতে ওয়াহশীর সাথে এ ব্যাপারে ওয়াদাবদ্ধ হয় যে, তুমি আমার পিতা, চাচা ও পুত্রের নিধনকারীকে হত্যা করতে পারলে আমার সকল অলঙ্কার তোমার হবে। এখন ওয়াহশী সেই পূর্ব ঘোষিত পুরস্কার নিতে এল। তার আগমনের কারণ বুঝতে পেরে হিন্দা তার দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তার গায়ের সমস্ত অলঙ্কার খুলে ওয়াহশীর প্রসারিত হাতে তুলে দেয়। মূল্যবান পুরস্কার পেয়ে ওয়াহশী মুচকি হেসে হেসে চলে যায়। হিন্দার বিবেক-বুদ্ধি এ সময় বিজয় এবং প্রতিশোধ স্পৃহায় আচ্ছন্ন ছিল।
হিন্দা ভাবাবেগে ওয়াহশীকে ডাক দেয় দাড়াও ইবনে হারব।” সে নিকটে এলে হিন্দা বলে– “আমি তোমাকে এ কথা দিয়েছিলাম যে, আমার অন্তর শান্ত করতে পারলে আমার যাবতীয় অলঙ্কার তোমাকে দিয়ে দিব। কিন্তু তুমি এর চেয়েও বেশি পুরস্কারের যোগ্য।” অতঃপর হিন্দা কুরাইশ রমণীদের দিকে ইঙ্গিত করে বলে– তুমি জানো এদের মধ্যে দাসী কে কে? সকলেই যুবতী এবং রূপসী। এদের যাকে তোমার পছন্দ হয় নিয়ে যাও।”
ওয়াহশী চিরাচরিত অভ্যাস মত নীরবে কিছুক্ষণ হিন্দার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তবুও তার দৃষ্টি দাসীদের দিকে ফিরেনা। সে হিন্দার প্রস্তাব সমর্থন না করার ভঙ্গিতে মাথা দোলায় এবং সেখান থেকে চলে যায়।
রণাঙ্গনের এহেন বীভৎস অবস্থায়ও এক সময় হিন্দার উচ্চ সুরেলা আওয়াজ ভেসে আসে। ঐতিহাসিক ইবনে হিশামের বর্ণনামতে হিন্দা সুরেলা কণ্ঠে যে গানের আওয়াজ তুলে তার কিছু কথা ছিল এমন :
বদর প্রশ্নে এখন আমরা সমান অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছি।
এক ভয়ানক যুদ্ধের প্রতিশোধ আরেক ভয়ানক যুদ্ধের মাধ্যমে নিয়েছি।
উতবার বেদনা আমার সহ্যের বাইরে ছিল;
সে আমার পিতা ছিল।
চাচার ব্যথায় আমি মুহ্যমান, পুত্রের শোকে আমি উন্মাদ।
এখন আমার অশান্ত মন শান্ত; তপ্ত হৃদয় শীতল।
আমি আজীবন ওয়াহশীর প্রতি কৃতজ্ঞ;
আমার হাড্ডিগুলো কবরে মাটির সাথে মিশে একাকার না হওয়া অবধি।
♣♣♣
আবু সুফিয়ান তার স্ত্রীর পশু সুলভ আচরণ ও দৃশ্য সহ্য করতে পারে না। সে প্রথম দর্শনেই মুখ ফিরিয়ে অন্যত্র চলে যায়। আবু সুফিয়ান এক সময় তার দুই সাথিকে বলে, তার বিশ্বাস হচ্ছে না যে, মুহাম্মাদ এখনও বেঁচে আছে।
“খালিদ হয়তবা দূর থেকে অন্য কাউকে দেখে মনে করেছে যে, সে মুহাম্মদ।” একজন আবু সুফিয়ানকে বলে।
“আমি স্বচক্ষে দেখে আসব” এই কথা বলে আবু সুফিয়ান ঐ গিরিপথের দিকে যেতে থাকে, যার কাছ থেকে খালিদ অশ্বারোহীদের ফিরিয়ে এনেছিলেন। সে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে উঠতে উঠতে ঐ স্থানে গিয়ে দাঁড়ায়, সেখান থেকে মুসলমানদের বসে থাকার দৃশ্য দেখা যাচ্ছিল।
আবু সুফিয়ান জোর আওয়াজে বলে “মুহাম্মাদ ভক্তবৃন্দ।” –“মুহাম্মাদ জীবিত আছে?”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আওয়াজ শুনে নিকটস্থ মুসলমানদের ইশারায় চুপ থাকতে বলেন। আবু সুফিয়ান উচ্চঃস্বরে পুনরায় মুসলমানদের লক্ষ্যে প্রশ্নটি ছুঁড়ে মারে। এবারও সে কোন জবাব পেলনা।
“আবু বকর জীবিত আছে?” আবু সুফিয়ান জানতে চায়। কিন্তু তিন তিনবার এভাবে জিজ্ঞাসা করার পরও প্রতিপক্ষ থেকে কোন জবাব এলোনা।
“ওমর জীবিত আছে?” আবু সুফিয়ান তৃতীয় প্রশ্ন করে। মুসলমানগণ পূর্বের মতই নীরব রইলেন।
আবু সুফিয়ান কোন জবাব না পেয়ে ঘোড়ার দিক পরিবর্তন করে। সে নীচে অবতরণ করে দেখে, সেখানে কুরাইশদের উপচে পড়া ভীড়। সকলেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সঠিক সংবাদ জানতে ভীষণ উদগ্রীব।
“হে কুরাইশ সম্প্রদায়।” আবু সুফিয়ান উপস্থিত জনতার মাঝে উচ্চঃস্বরে ঘোষণা করে– “তোমরা নিশ্চিত হও। মুহাম্মাদ নিহত হয়েছে। আবু বকর এবং ওমরও বেঁচে নেই। এখন মুসলমানরা তোমাদের ছায়া দেখেও ভয় পাবে। আনন্দ কর। নাচ।”
আবু সুফিয়ানের এ ঘোষণা শুনে কুরাইশরা আনন্দে ফেটে পড়ে। তারা নেচে গেয়ে উল্লাস করতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করে পাহাড়ের বুক চিরে এক আওয়াজ তাদেরকে নীরব করে দেয়। তাদের আনন্দ-উল্লাস মুহূর্তেই নিরানন্দে পরিণত হয়।
গিরিশৃঙ্গ হতে হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গুরুগম্ভীর স্বর ভেসে আসে “আল্লাহর দুশমন!” “এতগুলো মিথ্যা বলো না, এভাবে নগ্ন মিথ্যাচার করো না। নাম ধরে ধরে যাদেরকে মৃত বলছ, তারা সবাই জীবিত। জাতিকে ধোঁকা দিও না। তোমার পাপের শাস্তি দেয়ার জন্য আমরা তিনজনই বেঁচে আছি।”
