“ওলীদের পুত্র। ক্রুদ্ধ স্বরে হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন–“লড়াই সম্বন্ধে একটু জ্ঞান থাকলে গিরিপথের এই সংকীর্ণ রাস্তা অবলোকন কর। পথের ক্রম-উর্ধ্বতার কথাও ভাব। এমন নাজুক স্থানে কি তোমার বাহিনী আমাদের হাত থেকে জীবন নিয়ে ফিরে যেতে পারবে?”
যুদ্ধের ব্যাপারে খালিদ ছিলেন খুবই অভিজ্ঞ। তিনি হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর কথায় সংকীর্ণ গিরিপথটি আরেকবার তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। অশ্বকে ইচ্ছামত ঘুরিয়ে যুদ্ধ করার জন্য জায়গাটি মোটেও উপযুক্ত ছিল না। বরং অত্যন্ত বিপদসংকুল ছিল। বিচক্ষণতার বিচারে অবস্থা অনুকূলে না থাকায় তিনি অশ্ব ঘুরিয়ে সৈন্যদের নিয়ে নিচে চলে আসেন।
যুদ্ধ শেষ। কুরাইশরা এই দৃষ্টিকোণ থেকে নিজেদের প্রাধান্য দাবি করতে পারে যে, তারা মুসলমানদের প্রচুর ক্ষতি করেছে। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয়ের তারা দাবি করতে পারে না। কারণ এক প্রকার অমীমাংসিতভাবেই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।
“না, সেদিন আমাদেরই পরাজয় হয়।” খালিদের মনের ভিতর থেকেই একটি আওয়াজ ওঠে– “মুসলমানরা মাত্র ৭০০ আর আমরা ছিলাম ৩,০০০। তাদের মাত্র দু’টি ঘোড়া আর আমাদের ঘোড়া ছিল ২০০। মুহাম্মাদকে হত্যা করতে পারলে তবেই আমাদের চুড়ান্ত বিজয় হত।
খালিদ নিজের মধ্যে এক প্রকার কম্পন অনুভব করে। তার এমন অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি দাঁতে দাঁত ঘষতে থাকেন। যুদ্ধের শেষ দৃশ্যগুলো তার কল্পনায় একটা একটা করে পাখা মেলে তার চোখের সম্মুখে উড়তে থাকে। তিনি এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে মাথা ঝাঁকি দেন। কিন্তু স্মৃতিগুলো মাছির ন্যায় তাঁর মাথায় ভন ভন করে ঘুরতে থাকে। তিনি এ ভেবেও মনে মনে লজ্জা অনুভব করেন যে, একজন যোদ্ধার জন্য এমনটি শোভা পায়না। অতীতের স্মৃতি যোদ্ধাকে কখনো তাড়িয়ে ফেরে না।
হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সতর্কের ভিত্তিতে গিরিপথ থেকে ফেরার সময় খালিদের চোখ দ্রুত একবার রণক্ষেত্রে ঘুরে আসে। বিক্ষিপ্ত আর ছিন্ন ভিন্ন লাশে তার চোখ দু’টি ভরে উঠে। এদের মধ্যে অচেতন সৈন্যের সংখ্যাও কম ছিল না। কি লাশের সৎকার ও আহতদের উদ্ধার করার কোন উদ্যোগ কোন পক্ষ থেকেই লক্ষ্য করা যায়নি। হঠাৎ তার দৃষ্টি আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দার প্রতি আটকে যায়। খঞ্জর হাতে সে দ্রুতবেগে রণাঙ্গনে ঘুরছিল। তার ইশারায় অন্যান্য কুরাইশ নারীরাও তার পিছু পিছু দৌড়ে আসে। হিন্দা দীর্ঘকায় এবং বলিষ্ঠ বীরের ন্যায় মহিলা ছিল। সে প্রত্যেকটি লাশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। কোন লাশ নিম্নমুখী হয়ে পড়ে থাকলে সে পদাঘাতে লাশের মুখ সোজা করে চিনতে চেষ্টা করছিল। সে তার সঙ্গী মহিলাদের জানায় যে, আমি হামযার লাশ তালাশ করছি।
হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর লাশ এক সময় সে দেখতে পায়। লাশ শনাক্ত করা মাত্রই সে তাঁর উপর হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ে। এলোপাথাড়ি কুপিয়ে টুকরো টুকরো করে। কয়েকটি অঙ্গ কেটে দূরে নিক্ষেপ করে। কাছে দাঁড়ানো মহিলাদের দিকে একবার চোখ বুলায়।
“দাঁড়িয়ে কি দেখছ?” হিন্দা উন্মাদের মত মহিলাদের বলে–“দেখলে তো আমার পিতা, চাচা এবং পুত্র হত্যাকারী লাশের অবস্থা কি করে ছাড়লাম। তোমরাও যাও, মুসলমানদের প্রত্যেকটি লাশের অবস্থা অনুরূপ কর এবং সকলের নাক, কান কেটে নিয়ে এস।”
মহিলারা মুসলমানদের লাশ কাটতে গেলে হিন্দা খঞ্জর দিয়ে হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পেট ফেঁড়ে ফেলে। সে ভিতরে হাত ঢুকিয়ে কি যেন তালাশ করে।
হাত বের করে নিয়ে আসলে হাতে ছিল হযরত হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কলিজা। সে খঞ্জর দ্বারা কলিজা কেটে টুকরো টুকরো করে। এতেও তার হিংসা নিবৃত্ত হল না। এক টুকরা কলিজা মুখে দিয়ে হিংস্র জন্তুর ন্যায় চিবাতে থাকে। এই টুকরাটি গিলতে সে আপ্রাণ চেষ্টা করে কিন্তু পারেনি। বাধ্য হয়ে তা উদগিরন করে দেয়। এভাবে সে তার দীর্ঘ দিনের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে।
খালিদ এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে যান। তিনি দেখতে পান অল্প দূরেই আবু সুফিয়ান দাঁড়িয়ে আছে। হিন্দার এই পশুসুলভ আচরণে তাকে দারুণ পীড়া দিচ্ছিল। খালিদ একজন বীর যোদ্ধা। সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হওয়াই ছিল তার নেশা ও পেশা। শত্রুর লাশের সাথে এমন অমানবিক আচরণ করা তার কেবল অপ্রিয়ই ছিল না, বরং তিনি এ আচরণকে সম্পূর্ণ ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখেন।
আবু সুফিয়ানকে দেখেই খালিদ ঘোড়া ছুটিয়ে সোজা তার সামনে এসে দণ্ডায়মান হন।
“আবু সুফিয়ান!” খালিদ ক্রোধ এবং তাচ্ছিল্য মিশ্রিত ভঙ্গিতে বলেন– “তোমার স্ত্রী এবং অন্যান্য মহিলাদের এই হিংস্র আচরণ তুমি কি সমর্থন কর?”
আবু সুফিয়ান খালিদের প্রতি এমন দৃষ্টিতে তাকায়, যার মধ্যে বুঝা যাচ্ছিল সে সম্পূর্ণ অসহায় এবং তার এই দৃষ্টিই বলে দেয় যে, লাশের সাথে তার স্ত্রীর এই আচরণ আদৌ তার পছন্দ নয়।
“চুপ রইলে কেন আবু সুফিয়ান? কথা বলো।” আবু সুফিয়ানের মনোভাব সম্পর্কে স্পষ্ট হতে খালিদ ঝাঁঝালো স্বরে জানতে চান।
“খালিদ! হিন্দার চরিত্র তোমার অজানা নয়।” আবু সুফিয়ান থমথমে আওয়াজে বলে– “ওর অবস্থা এখন উন্মাদ থেকে খারাপ। আমি কিংবা তুমি তাকে নিবৃত্ত করতে গেলে সে আমাদের পেট ফেঁড়ে ফেলবে।”
