যুদ্ধ প্রায় শেষ। হামলার আর আশঙ্কা নেই। এই অবসরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জখমের প্রতি মনোনিবেশ করেন। নবী নন্দিনী হযরত ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহা পিতার খোঁজে চারদিকে ঘুরে ঘুরে বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এখানে এসে তিনি পিতার সন্ধান পান। নিকট দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল একটি ঝর্ণা আপন মনে। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখান থেকে পানি এনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পান করান। হযরত ফাতেমা রাযিয়াল্লাহু আনহা নিজ হাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জখম পরিষ্কার করতে থাকেন। এ সময় তিনি পিতার কষ্টে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন।
♣♣♣
খালিদের স্মরণ হয়, সেদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাহাদাতের সংবাদ তাকে আত্মিক প্রশান্তি দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী আরেকটি আওয়াজে তিনি চমকে ওঠেন। তার আত্মিক প্রশান্তি হাওয়ায় মিশে যায়। উপত্যকার এই আওয়াজের ওজন বহু দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কেউ চিৎকার করে বলছিল– “মুসলমানগণ! সুসংবাদ শোন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেঁচে এবং নিরাপদে আছেন” এই ঘোষণায় খালিদের যেমনি হাসি পায় তেমনি আফসোস হয়। মন্তব্যস্বরূপ তিনি মনে মনে বলেন, হয়ত কোন মুসলমান উন্মাদ হয়ে প্রলাপ বকছে।
প্রকৃত ঘটনা হল, মুসলমানরা যেরূপভাবে বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল, হযরত কাব বিন মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহুও ঠিক তেমনি একা একা ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ের ঐ স্থানে গিয়ে পৌঁছান, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জীবিত দেখে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। আনন্দের আতিশয্যে তিনি শ্লোগান দিতে থাকেন–“আমাদের নবী বেঁচে আছেন। তাঁর এই শ্লোগান মুসলমানদের জীবনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। মুহুর্তে তাদের হতাশা কেটে যায়। একজন, দুইজন, চারজন করে করে যারা এতক্ষণ বিক্ষিপ্ত বিষন্ন মনে ইতস্তত ফিরছিল এ আওয়াজ শুনে তারা দ্রুত আসে। হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুও এই আওয়াজ শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে পৌঁছান।
এর পূর্বে আবু সুফিয়ান রণাঙ্গনে পড়ে থাকা লাশ ওলট-পালট করে দেখে সে খুঁজছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর লাশ। অনেকক্ষণ পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করে ব্যর্থ হয়ে এবার সে যাকেই সামনে পায় তাকেই জিজ্ঞেস করে, তুমি মুহাম্মাদের লাশ দেখেছ? এক পর্যায়ে খালিদের সাথে তার দেখা হয়।
আবু সুফিয়ান সোৎসাহে জিজ্ঞেস করে “খালিদ!” “তুমি মুহাম্মাদের লাশ দেখেছ কি?”
“না।” খালিদ অল্পকথায় জবাব দিয়ে তার দিকে ঝুঁকে পাল্টা প্রশ্ন করে– মুহাম্মদ নিহত হয়েছে তুমি নিশ্চিত?
আবু সুফিয়ান জবাবে বলে “হ্যাঁ।” সে নিহত না হলে আমাদের হাত থেকে কোথায় গিয়ে বাঁচতে পারে?… কেন, এ ব্যাপারে তোমার কোন সন্দেহ আছে?
“হ্যাঁ, আবু সফিয়ান!” খালিদ জবাব দেন– “আমি ততক্ষণ সন্ধিহান থাকব যতক্ষণ না নিজের চোখে তার লাশ দেখব। মুহাম্মাদ এত সহজে নিহত হবার লোক নন।”
“তোমার কথা থেকে কেমন যেন মুহাম্মাদের জাদুর গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।” “মুহাম্মাদ কি এক সময় আমাদেরই মানুষ ছিল না?” তুমি কি তাকে চেন না? যে ব্যক্তি এত হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী সে একদিন নিহত হবেই। নিঃসন্দেহে মুহাম্মাদ নিহত হয়েছে। যাও, তার মরদেহ শনাক্ত কর। আমরা তার মস্তক কেটে মক্কায় নিয়ে যাব।”
ঠিক এই সময় পাহাড়ের বুক চিরে কা’ব বিন মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কণ্ঠ বেজে উঠে– “হে মুসলিম ভাইয়েরা। সুসংবাদ শোন, আমাদের নবী জীবিত এবং নিরাপদ।” এই আওয়াজ বজ্রধ্বনির মত প্রতিধ্বনি তোলে। পাহাড়ের গা বেয়ে উপত্যকার ভাঁজে ভাঁজে এবং রণাঙ্গনের কোনায় কোনায় এ গুরুগম্ভীর গুঞ্জন বিদ্যুৎ বেগে ছড়িয়ে পড়ে।
‘শুনেছ আবু সুফিয়ান।” খালিদ বলেন– “মুহাম্মাদ কোথায় তা আমি জানি। আমি তার উপর আক্রমণ করতে যাচ্ছি। কিন্তু এ নিশ্চয়তা দিতে পারি না যে, অবশ্যই তাকে হত্যা করে আসতে পারব।”
কিছুক্ষণ পূর্বে খালিদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ সাহাবায়ে কেরামকে পাহাড়ের মধ্যভাগে আশ্রয় নিতে দেখেন। তিনি দূর থেকে ব্যাপারটি লক্ষ্য করেন। পরাজয় মেনে নেয়া কিংবা ইচ্ছা অপূর্ণ রাখার মত লোক তিনি ছিলেন না। তিনি কয়েকজন অশ্বারোহীকে সাথে নিয়ে পাহাড়ের ঐ স্থানের দিকে যেতে থাকেন, যেখানে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যেতে দেখেছিলেন।
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম লিখেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খালিদকে অশ্বারোহী নিয়ে এই ঘাঁটিতে অপারেশন চালাতে আসতে দেখে তৎক্ষণাৎ তার মুখ থেকে এ দুআ বের হয়– “ইলাহী! এখানে পৌঁছার পূর্বেই পথিমধ্যে কোথাও তাকে থামিয়ে দিন।”
খালিদ অশ্বারোহীদের নিয়ে ঘাঁটির উদ্দেশে পাহাড়ের গা ঘেষে উপরে উঠতে থাকে। এটা মূলত একটি গিরিপথ ছিল, যা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছিল। সৈন্যদের পাশাপাশি চলা আর সম্ভব হচ্ছিল না। লাইন দিয়ে চলতে হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খালিদ বাহিনীকে আসতে দেখে নাঙ্গা তরবারি হাতে কিছুটা নিচে নেমে আসেন।
