“খোদার কসম, ইবনে আমর!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আনন্দবিমোহিত কণ্ঠে বলেন “তোমার মেধা শত্রুর দুর্বলতা চিহ্নিত করতে দারুণ সক্ষম।” এরপর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত সকলের চেহারায় দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে বলেন “আমি মনে করি এখানে এমন একজনও নেই যে এ কথাটি বুঝেনি। তারপরেও শত্রুর এই দিকটি এড়িয়ে যাবার নয় যে, তাদের কাছে অস্ত্র, হাতিয়ার, যুদ্ধের সাজ-সরঞ্জাম, রসদ ও সৈন্যের কমতি নেই। কেবল আন্দারযগারের ফৌজই আমাদের সংখ্যার ছয়গুণ বেশী। আমি যে কৌশল এঁটেছি তা যথাযথ এবং অবশ্যই ফলপ্রসূ হবে। তবে সহজ হবে না। যুদ্ধই সৈন্যর পেশা। তারা বুঝে এখানে আসার মতলব কি? তারপরেও তাদের বুঝাও যে, আমরা এখান থেকে ফিরে যেতে আসিনি থাকলে মাদায়েনে থাকব নতুবা আল্লাহর কাছে চলে যাব।”
আল্লামা তবারী এবং ইয়াকুত দুই ঐতিহাসিক লেখেন যে, এটা বুদ্ধি এবং বিচক্ষণতার লড়াই ছিল। সংখ্যা, সাজ-সরঞ্জাম এবং অন্যান্য অবস্থার দিকে তাকালে উভয় বাহিনীর মাঝে তুলনার কোন দিকই ছিল না। হয়ত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চেহারা ছিল বিবর্ণ। গভীর চিন্তার মাঝে তাঁর রাত অতিবাহিত হত। সেনা ছাউনীতে পায়চারি করতে করতে তিনি থেমে যেতেন এবং গভীর চিন্তায় ডুব দিতেন। মাটিতে বসে আঙ্গুলির সাহায্যে বালুর উপর নক্সা করতেও তাঁকে দেখা যায়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ এই ছিল যে, ইরানীদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই না করে ফিরে যাবেন না বলে তিনি অঙ্গীকার করেছিলেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সৈন্যদেরকে তিন ভাগে বিভক্ত করেন। পূর্বের মত এবারও ডান এবং বাম বাহিনীর নেতৃত্বে থাকেন হযরত আছেম বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আদী বিন হাতেম রাযিয়াল্লাহু আনহু। নিজের সাথে মাত্র দেড় হাজার সৈন্য রাখেন, যাদের মধ্যে পদাতিকও ছিল আবার অশ্বারোহীও ছিল। সৈন্য বিন্যস্ত শেষ হলে তিনি মার্চ করার নির্দেশ দেন। এ নির্দেশ তিনি ঠিক ঐ সময় দেন, যখন গোয়েন্দা সূত্র তাকে জানায় যে, আন্দারযগারের বাহিনী ফোরাত অতিক্রম করেছে। তিনি চলার গতি এমন রাখেন, যাতে ইরান ফৌজ ওলযায় পৌঁছেই তাদের সামনে দেখতে পায়। এটা যুদ্ধ বিচক্ষণতার বিস্ময়কর এবং অসাধারণ নৈপুণ্য ছিল।
॥ বার ॥
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পরিকল্পনাই পদে পদে বাস্তবায়িত হয়। আন্দারযগারের সৈন্যরা ওলযায় পৌঁছলে তাঁবু স্থাপনের নির্দেশ আসে চীপ কমান্ডার থেকে। কারণ, এখানেই বাহমানের বাহিনী এসে মিলিত হওয়ার কথা। সৈন্যরা দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি নিয়ে তাঁবু স্থাপন করতে থাকে। ইত্যবসরে শোরগোল ওঠে বাহমানের বাহিনী আসছে। সমস্ত সৈন্য তাদের অভ্যর্থনা জানাতে আনন্দে উচ্ছসিত হতে থাকে কিন্তু আচমকা উল্লাস থেমে যায়।
“এটা মদীনার ফৌজ” কেউ উচ্চকণ্ঠে বলে এবং এর সাথে সাথে একাধিক আওয়াজ ভেসে আসে “শত্রুরা এসে গেছে।… প্রস্তুত হও।… সাবধান!”
আন্দারযগার ঘোড়ায় চেপে সামনে এগিয়ে যায়। ভাল করে আগত বাহিনী নিরীক্ষণ করে। বাস্তবেই এটা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী ছিল। তারা যুদ্ধের বিন্যাসে থেকে অবস্থান করছিল। তাঁবু স্থাপন কিংবা ছাউনী ফেলছিল না। যার অর্থ ছিল, মুসলমানরা লড়ার জন্য প্রস্তুত।
“চীফ কমান্ডার?” এক সালার আন্দারযগারকে উদ্দেশ করে বলে আমাদের অপর বাহিনী এখনো পৌঁছেনি। মনে হচ্ছে তারা এখনো অনেক দূরে। নতুবা এই মুসলমানদেরকে এখনই পিষ্ট করে ফেলতাম। এরা সম্পূর্ণ প্রস্তুত। অথচ আমাদের সৈন্যরা ক্লান্ত।”
“তাদের সৈন্য সংখ্যা কত কম দেখছ না?” আন্দারযগার বলে “অতি কষ্টে দশ হাজারই হবে। আমি তাদেরকে পিঁপড়ার থেকে বেশী মনে করিনা। … তাদের অশ্বারোহীরা কোথায়? কোথায় আবার হবে!” এক সালার মন্তব্য করে “ময়দান সম্পূর্ণ ফাঁকা যা কিছু আছে সব স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।”
“মনে হয় আমাদের সালার এবং কমান্ডাররা এক একজনকে ছয় ছয় জন দেখত” আন্দারযগার বলে “পরাজিত হয়ে পলায়নপর সৈন্যরা মাদায়েনে গিয়ে বলেছিল যে, মুসলমানদের অশ্বারোহী বাহিনী বিরাট শক্তিধর তাদের অশ্বারোহীরা যুদ্ধে এতই দক্ষ যে, তাদেরকে কেউ ছুঁতে পর্যন্ত পারে না। অশ্বারোহী ইউনিট তো আমার চোখেই পড়ছে না।”
“আমাদেরকে ভুল তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে” সালার বলে “আমরা বাহমান আসার অপেক্ষায় বসে থাকব না। তাদের আসতে আসতেই আমরা মুসলমানদের মাটির সাথে মিশিয়ে দিব।”
ঐতিহাসিকগণ লেখেন, মুসলমানদের অশ্বারোহী দল বাস্তবিকই সেখানে ছিল। পদাতিক বাহিনীর সাথে সামান্য সংখ্যক অশ্বারোহী ছিল কিংবা হয়ত তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দেহরক্ষী ছিল। ঘোড় সওয়ার ইউনিট নেই দেখে অগ্নিপূজকদের সাহস বেড়ে যায়। আন্দারযগারের রঙিন কল্পনায় এ যুদ্ধ জয় ছিল হাতের মোয়া সম। বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিচার করলে এ ফলাফলই বের হয় যে, মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে বিশাল ইরানী বাহিনীর মোকাবিলায় এসে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ভুলই করেছিলেন।
উভয় বাহিনী এক সমতল ভূমিতে মুখোমুখী। ডানে এবং বামে দু’টি সুউচ্চ টিলা ছিল। একটি টিলা একটু সামনে বেড়ে মোড় পরিবর্তন করেছিল। তার পশ্চাতে আরেকটি টিলা ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনী যুদ্ধ বিন্যস্ততায় রেখেছিলেন। ওদিকে ইরান বাহিনীও যুদ্ধের সারিতে এসে যায়। উভয় বাহিনীর সেনাপতি পরস্পরের অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে থাকে।
