হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সমর সফলতার একটি দিক এই ছিল যে, তিনি শত্রুপক্ষকে শারীরিকভাবে এমন শাস্তি দিতেন যে, তার প্রতিক্রিয়া অন্তরেও গভীর রেখাপাত করত। আর এ প্রভাব এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কার্যকর থাকত। এ শ্রেণীর সৈন্যদের দ্বারা আরেকটি যুদ্ধ করানো হলে পূর্বভীতির প্রভাব হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে অনেক উপকার দিত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব হতেই তারা পলায়নের জন্য প্রস্তুত থাকত। একটু চাপ সৃষ্টি হলেই তারা রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে যেত। নতুন সৈন্যরাও তাদের দেখাদেখি রণাঙ্গন ছেড়ে যেত। সৈন্যদেরকে দৈহিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদেরকে পিছু হটিয়ে দেয়ার উপর ক্ষান্ত করতেন না; বরং দূর দূরান্ত পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করে ভেড়া বকরীর মত তাড়িয়ে নিয়ে যেতেন এবং পাইকারী হারে প্রাণহানী ঘটাতেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তাঁকে এ তথ্যও সরবরাহ করে যে, বিগত রণাঙ্গনের পরাজিত সৈন্যরাও মাদায়েন থেকে আগত ফৌজে শামিল হচ্ছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর সেনাপতিদের ডেকে পাঠান এবং তাদেরকে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করেন।
“আমার প্রিয় বন্ধুগণ।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের উদ্দেশে বলেন “আমরা একমাত্র আল্লাহর উপর ভরসা করে এখানে লড়তে এসেছি। কেবল সমরদৃষ্টিতে বিবেচনা করলে নিশ্চিত আমরা ইরানী ফৌজের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার উপযুক্ত নই। স্বদেশ থেকে আমরা বহুদূরে। সেনাসাহায্যের কোন পথ আমাদের নেই। আমরা ফিরেও যেতে পারি না। আমরা ইরানী এবং কিসরাকে নয়; আগুনের উপাস্য বলে যাদের মনে করা হয় তাদের পরাস্ত করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বদ্ধ।…“আপনাদের সবার চেহারায় আমি ক্লান্তির ছাঁপ দেখছি। চোখ থেকেও ক্লান্তি ঝরে পড়ছে। কথাবার্তাতেও কেমন ক্লান্তির জড়তা ভাব। কিন্তু কা’বার প্রভুর কসম। আমাদের আত্মা ক্লান্ত নয়। এখন আমাদের এই আত্মশক্তি নিয়ে লড়তে হবে।”
“এমনটি উচ্চারণ করবেন না জনাব খালিদ!” সালার আছেম বিন আমর বলেন “অবশ্যই আমাদের চেহারা থেকে ক্লান্তি ঠিকরে পড়ছে। কিন্তু তাই বলে এটা নৈরাশ্যের নিদর্শন নয়।”
“আমাদের দৃঢ়তায় ক্লান্তি অনুপ্রবেশ করতে পারেনি ইবনে ওলীদ!” আরেক সালার হযরত আদী বিন হাতেম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “আমরা পরিমিত বিশ্রাম নিয়েছি। সৈন্যরাও ক্লান্তি ঝেড়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।”
“আল্লাহর সৈনিকরা যাতে বিশ্রাম নিতে পারে তার জন্যই আমি এখানে ছাউনী ফেলেছি” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “তোমাদের প্রত্যয়ে ভাটা না পড়লে আমার কোন কথা বলার প্রয়োজন নেই। আমি এখন ভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করতে চাই, যা বর্তমান সময়ে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।… তোমরা হয়ত লক্ষ্য করেছ যে, আমরা প্রথমবার ইরানীদের পরাজিত করলে তারা দ্বিতীয়বার আবার আমাদের সাথে যুদ্ধ করতে আসে। তাদের সাথে ঐ সমস্ত সৈন্যও ছিল যারা প্রথম যুদ্ধে পালিয়ে গিয়েছিল। এবারও আমাকে জানানো হয়েছে যে, দ্বিতীয় যুদ্ধে যারা পরাজিত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল মাদায়েন থেকে আগত সৈন্যদের সাথে পথিমধ্যে সাক্ষাৎ হওয়ায় তারাও আবার এসেছে। এখন তোমাদের বেশীর থেকে বেশী এই চেষ্টা করতে হবে, যেন অগ্নিপূজকদের একটি সৈন্যও জীবিত ফিরে যেতে না পারে। খতম করে ফেলবে নতুবা বন্দী করবে। কিসরার সৈন্যের নাম নিশানা মিটিয়ে ফেলতে আমি বদ্ধপরিকর।”
“তাদের প্রভু এমনটাই করবেন” তিন-চার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে।
“সবই আল্লাহর কুদরতের আওতাধীন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “আমরা তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য ঘর-বাড়ী ছেড়ে এতদূর এসেছি।… বর্তমানে আমাদের সামনে যে পরিস্থিতি এসে দাঁড়িয়েছে সে ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা কর। আবেগের বশবর্তী হয়ে এ ব্যাপারে কোন পদক্ষেপ নেয়া যাবে না। এই বাস্তবতা অনস্বীকার্য যে, ইরানীদের যে সৈন্য স্রোত আসছে তার মোকাবিলায় দাঁড়ানোর যোগ্যতা আমাদের নেই। কিন্তু পশ্চাদপসারণের ধারণাও মাথা থেকে মুছে ফেল। সদ্য প্রাপ্ত তথ্য মোতাবেক মাদায়েনের সৈন্যরা দজলা পার হয়ে এসেছে। আজ রাতে ফোরাত অতিক্রম করে ফেলবে। এরপর তারা ওলযায় পৌঁছবে। তাদের অপর বাহিনীও আসছে। আমাদের গোয়েন্দারা তাদের নিরীক্ষণ করছে এবং আমাকে প্রতিনিয়ত সংবাদ সরবরাহ করছে। …
মহান আল্লাহ আমাদের সাহায্য করছেন। এটা ঐ সত্তারই অপার অনুগ্রহ ও করুণা যে, বাহমান সেনাপতির নেতৃত্বে অপর যে বাহিনী আসছে তাদের গতি দ্রুত নয়। তারা অধিক বিশ্রাম নিতে নিতে আসছে। আমরা নিজেদের মুষ্টিমেয় সৈন্য নিয়ে উভয় বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারি না। আমার বিবেক সচল থাকলে আমি এটা ভাল মনে করছি যে, আন্দারযগারের নেতৃত্বে মাদায়েন থেকে যে বাহিনী আসছে তারা দ্রুত ওলযায় পৌঁছে যাবে। বাহমান তার সাথে এসে মিলিত হওয়ার পূর্বেই আমি আন্দারযগারের সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাই। এটা কি ভাল হয় না?
“এর চেয়ে উত্তম সিদ্ধান্ত আর হতে পারে না” সালার হযরত আছেম রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “মাদায়েন বাহিনীর এক দুর্বলতা আমি দেখতে পাচ্ছি। আর তা হলো, ঐ বাহিনীতে ইহুদী লোকেরাও আছে। তারা যুদ্ধ করতে সামর্থ্য হলেও নিয়মিত যুদ্ধে তারা অভ্যস্ত নয়। সুশৃঙ্খল যুদ্ধের অভিজ্ঞতাও তাদের নেই। আমি তাদেরকে সৈন্য নয়; সুসজ্জিত জনতার ভীড় বলে মনে করি। আরেকটি দুর্বলতাও আছে। সাবেক যুদ্ধের পরাজিত সৈনিকরা মাদায়েনদের সাথে যোগ দিয়েছে। আমার বিশ্বাস তারা এখনো ভীত। তারা চোখের সামনে তাদের হাজার হাজার সাথীকে তলোয়ার, তীর এবং বর্শার শিকার হতে দেখেছে। পশ্চাদপসারণে তারা থাকবে সবার আগে।”
