হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দেখতে পান যে, ইরানীদের পশ্চাতে দরিয়া আছে। কিন্তু আন্দারযগার তার সৈন্যদেরকে দরিয়া হতে কমপক্ষে এক মাইল দূরে এনে রেখেছে। ইরানীদের পূর্ববর্তী সেনাপতিরা পশ্চাতে দরিয়া খুব নিকটে রেখেছিল, যাতে পশ্চাৎ দিক সংরক্ষিত থাকে। কিন্তু আন্দারযগার এত সতর্কতা অবলম্বন করেনি। তার বিশ্বাস ছিল, মুষ্টিমেয় মুসলমানরা তাদের পশ্চাদভাগে আসার দুঃসাহস করবে না।
“যরথুস্ত্রের ভক্তবৃন্দ!” আন্দারযগার তার সৈন্যদের উদ্দেশে বলে “আমাদের সাথীরা যাদের হাতে পরাজিত হয়েছে সে সকল মুসলমান এই। তাদেরকে চোখ খুলে দেখ। তাদের হাতে পরাজিত হওয়ার চেয়ে পানিতে ডুবে মরে যাওয়াই কি ভাল নয়? এদেরকে কি সৈন্য বলা যায়? আমার দৃষ্টিতে তারা ডাকাত এবং লুটেরা গ্রুপ বৈ নয়। তাদের একজনকেও জীবিত রাখবে না।”
এ দিন এভাবেই গত হয়ে যায়। সেনাপতিরা পরস্পরের ফৌজ দেখতে এবং নিজের বাহিনী বিন্যস্ত করার মাঝেই ব্যস্ত থাকে। পরের দিন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় বাহিনীকে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। ইরানী সৈন্যরা প্রাচীরবৎ দাঁড়িয়ে ছিল। মুসলমানদের হামলা যথেষ্ট তীব্র এবং উপর্যুপরি ছিল কিন্তু শত্রুদের সংখ্যা এত বেশী ছিল যে, মুসলমানদের পিছে সরে আসতে হয়। এ সময় শত্রুপক্ষ আক্রমণের শিকার প্রথম সারির সৈন্যদের পিছে সরিয়ে আনে। এবং তেজোদ্যম সৈন্য দ্বারা ঐ খালি স্থান পূরণ করে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকটি আক্রমণের জন্য কয়েক প্লাটুন সৈন্যকে সামনে পাঠান। রক্তক্ষয়ী তুমুল সংঘর্ষ হয়। তারপরেও মুসলমানদের পিছু সরে আসতে হয়। অগ্নিপূজকরা একে তো সংখ্যায় বেশী ছিল, তারপরে আবার তারা বর্মাচ্ছাদিতও ছিল। আক্রমণকারী মুসলমানদের মনে হতে থাকে, তারা কোন প্রাচীরের সাথে ধাক্কা খেয়ে পিছনে সরে এসেছে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু সময় ধরে এ হামলা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু মুজাহিদরা ক্লান্তি অনুভব করতে থাকে। অসংখ্য মুজাহিদ আহত হয়ে যুদ্ধের অযোগ্য হয়ে যায়। মুজাহিদরা যাতে হতাশ না হয়ে পড়ে তার জন্য নিজেই সিপাহীদের সাথে সাথে আক্রমণে যেতে থাকেন। এতে সৈন্য প্রেরণ চাঙ্গা থাকলেও দৈহিক দিক দিয়ে তারা অবসন্ন হয়ে পড়ে। ইরানীরা তাদের এ নাজুকতা দেখে হেঁসে ফেটে পড়তে থাকে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নেতৃত্বাধীন এটাই ছিল সর্বপ্রথম যুদ্ধ, যাতে মুসলমানরা তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলে। প্রতিবাদ হাল্কা পর্যায়ের হলেও সৈন্যদের মাঝে হতাশভাব বিরাজ করতে থাকে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত ভুবনখ্যাত রণকুশলী এবং বীরশ্রেষ্ঠ সেনাপতির বিরুদ্ধে সৈন্যদের অসহিষ্ণুতা ও অনীহা চরম বিস্ময়কর ছিল বটে। সৈন্যদের অভিযোগ ছিল যে, আমাদের অশ্বারোহীরা কেন রণাঙ্গনে নেই। ময়দানে অশ্বারোহীদের না দেখে পদাতিক সৈন্যরা এই ধারণা করতে থাকে যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে লড়ে থাকেন এ ময়দানে তিনি তা থেকে রহস্যজনকভাবে বিরত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সিপাহীদের মত প্রতিটি হামলায় শরীক হতে থাকেন। কিন্তু তারপরেও তাঁর সৈন্যরা কিসের যেন কমতি অনুভব করতে থাকে। শত্রু সৈন্যদের জনস্রোত দেখে মুসলমানদের প্রেরণা দ্রুত ক্ষয় হয়ে যেতে থাকে। পরাজয় তাদের চোখে ভেসে ওঠে। ভাটা পড়তে থাকে তাদের শক্তিতে। বাহুবল হয়ে আসে শ্লথ।
ইরানীরা এ পর্যন্ত একটি আক্রমণও করে না, আন্দারযগার মুসলমানদের আক্রমণের সুযোগ দিয়ে দিয়ে তাদের ক্লান্ত করতে চায়। অতঃপর ক্লান্ত সৈন্যদের উপর আঘাত হেনে দ্রুত জয় করাই ছিল তার পরিকল্পনা। মুসলমানরা বাস্তবিক অর্থেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট সৈন্যদের এই নাজুক অবস্থা ধরা পড়ে। তিনি হামলার ধারাবাহিকতা বন্ধ রাখেন। তিনি মনে মনে নতুন কৌশল রচনায় নিমগ্ন ছিলেন। ইত্যবসরে ইরান বাহিনী হতে দৈত্যকায় দেহবিশিষ্ট এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়। সে এসেই মুসলমানদের থেকে প্রতিপক্ষ আহ্বান করে।
ইরানীদের মাঝে এ লোকটি ‘হাজার ব্যক্তি’ নামে খ্যাত ছিল। তরবারী চালানাতেও সে বিশেষ দক্ষতা রাখত। ইরানে ‘হাজার ব্যক্তি’ নামে ঐ বীর বাহাদুরের উপাধি ছিল, যাকে কেউ পরাজিত করতে পারত না। ‘হাজার ব্যক্তি’ বলে এটা বুঝানো হত যে, এই এক ব্যক্তিই হাজার ব্যক্তির বরাবর।”
মুসলমানদের দুর্বলতার সুযোগে আন্দারযগার এই দৈত্য পাঠিয়ে তাদের সাথে কৌতুক করতে চায়। মুসলমানদের মধ্যে তার মোকাবিলা করার মত কেউ ছিল না। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামেন এবং নাঙ্গা তলোয়ার উঁচিয়ে ‘হাজার ব্যক্তি’-র সামনে গিয়ে দাড়ান। কিছুক্ষণ উভয়ের তরবারির সংঘর্ষ চলে এবং কৌশল পরিবর্তন করে করে তারা লড়তে থাকে। ‘হাজার ব্যক্তি’ উপাধিধারী এ লোকটি মাতাল মোষের মত ছিল। তার দেহে এত শক্তি ছিল যে, তার এক আঘাতেই যে কোন মানুষ দ্বিখণ্ডিত হয়ে যেত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এ দৈত্যের সাথে লড়তে এ প্রক্রিয়া অবলম্বন করেন যে, তিনি আঘাত করতেন কম; প্রতিহত করতেন বেশী। বেশী বেশী তাকে আঘাত করার সুযোগ দিতেন, যাতে সে ক্লান্ত হয়ে ওঠে। সাথে সাথে তিনি তার সামনে নিজের এ অবস্থা প্রকাশ করেন যে, তিনি ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
