ঘোড়ার শরীর ছুঁড়ে ঘাম এমনভাবে ঝরছিল যেন কোন নদী হতে সদ্য উঠে এল। তাদের শ্বাস-প্রশ্বাস বড় আওয়াজে ধুক ধুক করে উঠানামা করছিল। আরোহীদের অবস্থা ঘোড়ার থেকেও খারাপ ছিল।
“আশ’আর!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “বিন আছেফ! … কি খবর এনেছ? ভেতরে চল। একটু বিশ্রাম নাও।”
“বিশ্রাম গ্রহণের সময় নেই সেনাপতি আমার!” বিন আছেফ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছু পিছু তাঁর তাঁবুতে প্রবেশ করতে করতে বলে “অগ্নিপূজকদের প্লাবন আসছে। আমরা এ তথ্য ইহুদীদের এক বসতি হতে সংগ্রহ করেছি। বকর বিন ওয়ায়েলের স্বতন্ত্র বাহিনী তৈরি হয়ে গেছে। তারা আন্দারযগার নামক এক বীর সেনাপতির নেতৃত্বে মাদায়েনের সৈন্যের সাথে আসছে। আরেকটি ফৌজ বাহমানের নেতৃত্বে অপর দিক থেকে আসছে।”
“সৈন্যরা কি আমাদের উপর ভিন্ন ভিন্ন দিক হতে আক্রমণ করবে?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান।
“না” আশ’আর জবাবে বলে “উভয় বাহিনী ওলযায় এসে একত্রিত হবে।”
“এরপর তারা প্লাবনের মত আমাদের দিকে ধেয়ে আসবে এই বলছ?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন।
“ইরানীদের কমান্ডার এমনই বলেছে” বিন আছেফ বলে। তাদের রিপোর্ট শেষ হতে না হতেই তাঁবুর বাইরে এক উট এসে থামে। উষ্ট্রারোহী উট থেকে নেমেই পূর্বাব গতি ছাড়াই তাঁবুতে ঢুকে যায়। সে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানায় যে, অমুক দিক হতে বাহমানের নেতৃত্বে ইরানীদের একটি ফৌজ আসছে। এ উষ্ট্রারোহীও এক গোয়েন্দা ছিল। সে কোন এক বেশে ঐ পথে গিয়েছিল, যে পথে বাহমানের ফৌজ আসছিল।
ঐতিহাসিকদের অভিমত, আন্দারযগার এবং বাহমানের এমন সময় মার্চ করা উচিত ছিল যাতে উভয় ফৌজ একই সময়ে কিংবা সামান্য আগে পিছে ওলজা নামক স্থানে এসে পৌঁছতে পারে। কিন্তু আন্দারযগার একটু পূর্বেই রওনা করে। এর কারণ এটা হতে পারে যে, সে কিসরা উরদূশেরের কাছে অবস্থান করছিল। উরদূশের তার মাথার উপর চেপে বসেছিল। তার পীড়াপীড়িতে সে আগে মার্চ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু বাহমান দূরে ছিল দূত মারফত সে ফৌজসহ আসার নির্দেশ পেয়েছিল। দুদিন পরে সে রওনা হয়।
আন্দারযগারের সাথে আসা সৈন্যের সংখ্যা কোন ঐতিহাসিকের বর্ণনায় পাওয়া যায় না। বাহমানের নেতৃত্বাধীন ফৌজের সংখ্যাও ইতিহাস সংরক্ষণ করেনি। তবে তাদের বর্ণনা হবে সন্দেহাতীতভাবে বুঝা যায় যে, উভয় বাহিনীর সম্মিলিত সৈন্য বাস্তবিকই প্লাবনের মত ছিল। এত বিশাল সৈন্য সমাবেশের কারণ এই ছিল যে, সম্রাট উরদূশের স্পষ্ট ভাষায় বলেছিল যে, সে আর কোন পরাজয়ের ঝুঁকি নিবে না। ফলে যত সৈন্য জমা করা সম্ভব তা করা হয়েছিল।
আন্দারযগারের নিজেরই সৈন্য ছিল বে-হিসাব। তারপরেও সে বকর বিন ওয়ায়েল গোত্রের হাজার হাজার ইহুদীকে নিজের বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। তাদের মধ্যে পদাতিকও ছিল, অশ্বারোহীও ছিল। আন্দারযগারের সৈন্যসংখ্যা পথিমধ্যে এসে এভাবেও বৃদ্ধি পায় যে, মা’কাল দরিয়ার কূলে সংঘটিত যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যে সকল ইরানী সৈন্য নৌকা করে ভাগ্যক্রমে পালিয়ে বেঁচে যেতে পেরেছিল, তারা নদীতে এদিক ওদিক ভেসে অনেক দিন পর এখন মাদায়েন যেতে থাকে। আন্দারযগার পথিমধ্যে এদের পেয়ে ছাড়ে না। সৈন্য বৃদ্ধির প্রবণতায় তাদেরও ফৌজের সাথে যুক্ত করে নেয়।
এ সমস্ত সৈন্যরা আন্দারযগারের ফৌজের সাথে যেতে চায় না। প্রাচীন পাণ্ডুলিপি প্রমাণ করে যে, পরাজিত এ সৈন্যরা বিধ্বস্ত অবস্থায় দুই দুইজন, চার-চারজন বা তার থেকেও বেশী একসাথে আসছিল। ইরানীদের এ নয়া বাহিনী দেখে অনেকে পালাতে উদ্যত হয়। মানসিক বিধ্বস্ত এবং বিকারগ্রস্ত হওয়ায় তারা দ্রুত দৌড়াতেও পারে না। তাদের ধরে ধরে আনা হয় এবং ফৌজে শামিল করে নেয়া হয়। তাদের কতক এমনও ছিল যাদের মধ্যে ভারসাম্যও ছিল না। কতক কথা বলতে পারত না। তাদের সাথে কথা বললে তারা ফ্যাল ফ্যাল নজরে শুধু চেয়ে থাকত এবং প্রতিক্রিয়াশূন্য চেহারা নিয়ে মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকত। কেউ কেউ কথা বলার পরিবর্তে চিৎকার করে উঠত এবং ছুটে দৌড় দিত। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সৈন্যদের হাতে চরম মার খাওয়ায় তাদের মাঝে এমন প্রভাব পড়েছিল যে, তারা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিল এবং ব্রেনে চাপ পড়ায় অনেকের মতিভ্রমও ঘটে।
“সমস্ত ফৌজে ভীতি এবং উদ্বেগ সৃষ্টির পূর্বেই তাদের দূরে কোথাও নিয়ে শেষ করে দাও” অচল শ্রেণীর সৈন্যদের ব্যাপারে আন্দারযগার এই কঠিন সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেয়।
তার সিদ্ধান্ত যথাসময়ে বাস্তবায়িত হয়। যে প্রাণে বাঁচার জন্য তারা শতবিধ বিপদ এড়িয়ে আসে। আন্দারযগারের এক নিষ্ঠুর নির্দেশে সে প্রাণ চিরদিনের জন্য স্তিমিত হয়ে যায়।
মাদায়েনের সৈন্যরা তেজোদ্যম ছিল। মুসলমানদের বাহুর বিজলি তখন তারা দেখে নাই। কিন্তু মা’কাল দরিয়ার কূলে পরাজিত সৈন্যদের ধরে যখন ফৌজে আনা হয় তখন তাদের অবস্থা দেখে ভীতির একটি হাল্কা শিহরণ ও মৃদু বার্তা পুরো ফৌজের শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যায়। পরাজিত সৈন্যরা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে এবং নিজেদেরকে ভর্ৎসনার ঊর্ধ্বে প্রমাণ করতে মুসলমানদের সমরশক্তি ও আক্রমণের তীব্রতার এমন এমন কথা উল্লেখ করে, যা সৈন্যদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়, ভীতি সৃষ্টি করে। মুসলমানদেরকে তারা সৈন্যদের কাছে অদৃশ্য শক্তির আধার এবং জ্বিন দানব বলে প্রকাশ করে।
