“হ্যাঁ, হচ্ছে” কমান্ডার বলে “তোমরা সে ফৌজে শামিল হতে এসেছ?”
“ইহুদী হয়ে এটা কিভাবে বলা যায় যে, আমরা ঐ ফৌজে শামিল হব না?” একজন বলে “কাজিমা থেকে সামান্য দূরে অবস্থিত এক বসতির আরব আমরা। মুসলমানদের ভয়ে আমরা এদিকে পালিয়ে এসেছি। আর সামনে যাব না।
আপনাদের সাথে থাকব।… আমরা যে কথা বলতে এসেছি তা এই যে, মুসলমানদের সংখ্যা মূলত অনেক বেশী। কিন্তু তারা সামনে খুব সামান্যই আনে। মূলত এ কারণেই আপনাদের ফৌজ তাদের হাতে পরাজিত হয়।
“মাটিতে ছক একে তাকে বুঝাও” দিতীয় ব্যক্তি তার সাথীকে বলে। এরপর কমান্ডারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানায় “সাধারণ ব্রেনের মানুষ আমাদের মনে করবেন না। আমরা ভালভাবে বুঝিয়ে দিতে পারি যে মুসলমানদের যুদ্ধের কৌশল কি? তারা বর্তমানে কোথায়? কোথায় নিয়ে যুদ্ধ করলে আপনারা তাদের পরাজিত করতে পারবেন। আমরা যা যা বলব, আপনাদের সেনাপতিকে গিয়ে তা জানাবেন।”
একটা মশাল এনে মাটিতে গেঁঢ়ে দেয়া হয়। আগন্তুকদ্বয় মাটিতে বসে ছক আঁকতে শুরু করে। তারা সমর পরিভাষায় এমন নক্সা পেশ করে যে, কমান্ডার খুবই প্রভাবিত হয়।
“মাদায়েনের সৈন্য কোন্ রুট হয়ে আসছে জানালে আমাদের পক্ষে ভাল ও দিক নির্দেশনামূলক পরামর্শ দেয়া সম্ভব হত” তাদের একজন বলে “সাথে সাথে কিছু বিপদ সম্পর্কেও সতর্ক করতে পারতাম।”
“দুই ফৌজ মুসলমানদের নিশ্চিহ্ণ করতে আসছে” কমান্ডার বলে “মুসলমানরা তাদের সামনে টিকতে পারবে না।”
তবে শর্ত হলো, উভয় বাহিনীকে ভিন্ন ভিন্ন পথে আসতে হবে” এক অপরিচিত ইহুদী বলে।
“হ্যাঁ, তারা ভিন্ন পথেই আসছে” কমান্ডার বলে “আমাদের নামকরা এবং অসাধারণ বীর আন্দারযগারের নেতৃত্বে একটি ফৌজ মাদায়েন থেকে আসছে। এমনি আরেক শ্রেষ্ঠ বাহাদুর বাহমানের নেতৃতে ইরানীদের আরেকটি ফৌজ আসছে। উভয় বাহিনী ওলযা নামক স্থানে এসে মিলিত হবে। তাদের সাথে যোগ দিবে বকর বিন ওয়ায়েলের পুরো গোত্র। ছোট ছোট কিছু গোত্রও তাদের জনশক্তি দিতে চেয়েছে।”
‘তবে আপনাদের সালারের জন্য নতুন কোন যুদ্ধ চাল চালার প্রয়োজন নেই” দ্বিতীয় ব্যক্তি বলে “আপনাদের সৈন্য তো প্লাবনের মত। যার স্রোতে মুসলমানরা তৃণের ন্যায় ভেসে যাবে।… আপনি কি আমাদের দু’জনকেই আপনার সাথে রাখবেন? আমরা আপনার মাঝে অসাধারণ বিচক্ষণতা প্রদর্শন করছি। সেনাপতি না হলেও সহসেনাপতি হওয়ার যোগ্য অবশ্যই আপনি।”
“তোমরা আমার সাথে থাকতে পার” কমান্ডার বলে।
“তাহলে আমরা ঘোড়া নিয়ে আসি” দু’জনের একজন বলে “কাল প্রত্যুষে আমরা ঠিক এখানে আপনার সাথে এসে যোগ দিব।”
“ভোরে আমরা রওনা দেব” কমান্ডার বলে “লড়ার উপযোগী লোকদেরকে একস্থানে সমবেত করা হচ্ছে। তোমরা তাদের সাথে এস। আমাকে পেয়ে যাবে।”
আগন্তুকদ্বয় বসতি ছেড়ে বেরিয়ে আসে। তারা বসতির অদূরে এক বৃক্ষের সাথে ঘোড়া বেঁধে রেখে পায়ে হেঁটে বসতিতে গিয়েছিল। বসতি হতে বেরিয়েই তারা ছুট দেয় এবং দৌড়ে ঘোড়ায় চেপে বসে।
“সকাল নাগাদ আমরা পৌঁছতে পারব বিন আছেফ?” একজন অপরজনের কাছে জিজ্ঞাসা করে।
“খোদার কসম! আমাদের পৌঁছতেই হবে। চাই উড়ে গিয়ে হোক না কেন” বিন আছেফ বলে “এই সংবাদ সময়মত হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে না পারলে আমাদের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। আমাদের ঘোড়া ক্লান্ত নয়। আল্লাহর নাম স্মরণ কর এবং ঘোড়া ছুটিয়ে দাও।”
উভয় ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়। ঘোড়া উড়ে উড়ে চলতে থাকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ছাউনী অভিমুখে। উড়ন্ত ঘোড়ায় বসে দু’অশ্বারোহী সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে আলোচনা করতে থাকে।
“আশ’আর!” বিন আছেফ উচ্চ আওয়াজে তার সাথীকে বলে “এটা তো রীতিমত তুফান। অগ্নিপূজকদের এবার পরাজিত করা সহজ হবে না। শুধু বকর বিন ওয়ায়েলের সংখ্যা দেখছ? কয়েক হাজার হবে।”
“আমি সালার হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বড় পেরেশান দেখেছিলাম” আশ’আর বলে।
“তুমি তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ বোঝনি আশ’আর?” বিন আছেফ বলে “আমরা শক্তিশালী দুশমনের উদরে ঢুকে গেছি।”
“আল্লাহ আমাদের সহায়” আশ’আর বলে “অগ্নিপূজকরা ঐ ভূখণ্ড রক্ষায় লড়ছে, যাতে তারা তাদের সাম্রাজ্য বলে মনে করে। আর আমরা ঐ আল্লাহর রাহে লড়ছি, সমগ্র ভূপৃষ্ঠ যার মালিকানাধীন।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্যভুক্ত এলাকা অধিকার করার পর স্থানীয় শত্রু ও ইরানীদের সম্পর্কে সতর্ক হতে যে গোয়েন্দা দল গঠন করেছিলেন এই দু’ব্যক্তি সেই দলের বিচক্ষণ ও দক্ষ সদস্য ছিল। শত্রু পরিবেষ্টিত অচেনা অজানা দেশে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে গোয়েন্দা বাহিনীর বিকল্প ছিলনা। গোয়েন্দারা যেমনি দুর্ধর্ষ তেমনি সাহসী হত। শত্রুর পেটের মধ্যে ঢুকে তার নাড়ীর খবর বের করে আনতে তাদের জুড়ি ছিল না। শত্রুর তৎপরতা মনিটরিং করতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শক্তিশালী গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে তোলে চতুর্দিকে গোয়েন্দাজাল বিছিয়ে রেখেছিলেন। গোয়েন্দারা ছিল তাঁর চোখ, কান। নিজের ছাউনীতে বসেই তিনি এ চোখ, কানের মাধ্যমে শত্রুর অবস্থা ও গতিবিধি সম্পর্কে যথা সময়ে অবহিত হতেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ফযরের নামায সবেমাত্র শেষ করেছেন। নামায থেকে অবসর হতেই দু’টি ঘোড়া তাঁর তাঁবুর কাছে এসে থামে। ঘোড়ার আরোহীদ্বয় এক প্রকার লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে অবতরণ করে। অশ্বারোহীদের দেখে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজেই তাদের দিকে এগিয়ে যান।
