“আমার বিরুদ্ধে তোমাদের কারো কোন অভিযোগ থাকলে নির্দ্বিধায় বলতে পার” আন্দারযগার বলে “আমি সে অভিযোগ দূর করব।”
“কোন ভূমিকা না টেনে আমাদের ডেকে পাঠানোর উদ্দেশ্য সরাসরি বললে ভাল হয়না?” এক বৃদ্ধ বলে “আমরা আপনাদের প্রজা। আমাদের অভিযোগ থাকলেও তা মুখে আনব না।”
“আমাদের কোন অভিযোগ নেই” আরেকজন বলে “আপনার যা বলার বলতে পারেন।”
“মুসলমানরা ক্রমেই এগিয়ে আসছে” আন্দারযগার বলে “পারস্য বাহিনী তাদেরকে ফোরাত নদীতে ডুবিয়ে মারবে। কিন্তু আমরা তোমাদের প্রয়োজন অনুভব করছি। তোমাদের নওজোয়ানদের আমাদের খুব প্রয়োজন।
“পারস্য বাহিনীই যখন মুসলমানদেরকে ফোরাতে ডুবাতে সক্ষম তখন আমাদের নওজোয়ানদের আবার প্রয়োজন পড়ল কেন? প্রতিনিধি দলের এক বয়োবৃদ্ধ নেতা তীক্ষ্ণ প্রশ্ন করে “আমরা শুনতে পেরেছি, ইরান সৈন্যদের চার সালার ইতোমধ্যে মারা গেছে। এমতাবস্থায় আমাদেরকে জিজ্ঞাসার কি প্রয়োজন? আমরা আপনাদের প্রজা। নির্দেশ দিন। আমরা অবাধ্যতা প্রদর্শনের সাহস রাখি না।”
“আমি কাউকে নির্দেশ বলে ময়দানে নিতে চাইনা” আন্দারযগার বলে “আমি তোমাদেরকে তোমাদের মাজহাবী নামেই শামিল করতে চাই। পৃথিবীর কোন ভূখণ্ডের জন্য নয় নিজের ধর্ম এবং চেতনা রক্ষার জন্য আমি লড়াই করব। মুসলমানরা একের পর এক যুদ্ধ জয়ের কারণ হলো তারা নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসের চেতনা নিয়ে লড়ে। তারা যে এলাকা জয় করে সেখানকার লোকদের ইসলাম কবুল করতে বলে। ইসলাম কবুল না করলে তাদের থেকে ট্যাক্স উসুল করে।…
এটা কি সত্য নয় যে, তোমাদের মাঝে এমন লোকও আছে যারা ইসলাম কবুল করবে না বলেই স্বীয় ঘর-বাড়ী ছেড়ে এসেছিল? তোমরা কি চাও যে, মুসলমানরা আসুক এবং তোমাদের উপসনালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যাক? মুসলমানরা তোমাদের কন্যাদের বাঁদী বানিয়ে সাথে নিয়ে গেলে তোমরা সহ্য করতে পারবে?… একটু চিন্তা করলে বুঝতে পারবে যে, তোমাদেরকে আমাদের নয়, বরং আমাদেরকেই তোমাদের বেশী প্রয়োজন। আমি তোমাদেরকে একটি ফৌজ দিচ্ছি। তাদেরকে আরো শক্তিশালী কর এবং স্বীয় মাজহাবকে এক ভিত্তিহীন ধর্ম থেকে বাঁচাও।”
আন্দারযগার ইহুদীদেরকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমনভাবে উত্তেজিত করে তোলে যে, তারা তৎক্ষণাৎ এলাকায় ফিরে যায় এবং ইহুদী গোত্রের প্রতিটি বসতিতে গিয়ে এই ঘোষণা করে যে, মুসলমানদের বিরাট বাহিনী হত্যা-লুটতরাজ চালাতে চালাতে আসছে। তাদের হাত থেকে তারাই কেবল রেহাই পায় যারা তাদের ধর্ম গ্রহণ করে। তারা ফিরে যাবার সময় যুবতী ও তরুণী নারীদের সাথে নিয়ে যাবে।
“নিজ নিজ কন্যা লুকিয়ে ফেল।”
“ধন-সম্পদ মাটিবক্ষে চাপা দাও।”
স্ত্রী-পরিজনদের নিয়ে জঙ্গলে চলে যাও।”
“যুবকরা হাতিয়ার, ঘোড়া এবং উট নিয়ে আমাদের সাথে এস।”
“সম্রাটের সৈন্যরা আমাদের সাথে আছে।”
“ঈসা-মসীহের শপথ! আমরা ইজ্জত রক্ষায় জীবন বাজি রাখব।”
“তবুও ধর্ম বিশ্বাস ছাড়ব না।”
দিকে দিকে একটি আওয়াজ ওঠে, আহ্বান ভেসে আসে, যা ঘুর্ণিঝড়ের মত পাহাড়-পর্বত আর জ্বিন ইনসানকে ব্যাপৃত করে ছুটে আসে। কেউ কাউকে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ হয় না যে, এসব কি হচ্ছে? মুসলমানরা সত্যই আসছে কি? কোন দিক থেকে আসছে? উৎসাহ-উদ্দীপনা ছিল। ইহুদী মায়েরা যুবক পুত্রকে বিদায় জানাতে থাকে। স্ত্রী স্বামীকে বোন ভাইকে আল বিদা জানায়। কিছু সময়ের মধ্যে একটি ফৌজ তৈরি হয়ে যায়। ফৌজের সংখ্যা সময়ের তালে তালে বাড়তে থাকে। কিসরার ফৌজের কমান্ডার প্রমুখ এসে গিয়েছিল। তারা স্বেচ্ছাসেবকদের এক স্থানে সমবেত করছিল। মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়তে ইরানী বাহিনীর সাথে যোগ দিতে তাদের সংগ্রহ করা হয়।
৪.১১ সৈন্য সমাবেশ
॥ এগার ॥
এক বসতিতে এই সৈন্য সমাবেশ চলে। সূর্য অনেকপূর্বেই ছুটি নিয়ে বিশ্রামে গিয়েছিল। বসতিতে অসংখ্য মশালধারী হৈ চৈ সৃষ্টি করে পায়চারি করছিল। বসতিটি দিনের মত জাগ্রত এবং তৎপর ছিল। এরই মধ্যে দুই অপরিচিত লোক এসে বসতিতে ঢুকে পড়ে এবং মানুষের ভীড়ে নিজেদের হারিয়ে ফেলে।
“একটি আহ্বান শুনে আমরা এসেছি” আগন্তুকদ্বয়ের একজন বলে “আমরা আয়-রোজগারের উদ্দেশ্যে অনেক দূর থেকে এসেছি। এভাবে যেতে যেতে হয়ত এক সময় মাদায়েন গিয়ে পৌঁছব। তা এসব কি হচ্ছে?”
“তোমরা কারা?” কেউ জানতে চায়– “কোন ধর্মের অনুসারী?” উপরে নিজ নিজ শাহাদাত আঙ্গুল পর পর উভয় কাঁধে রাখে অতঃপর নিজ নিজ বুকে আঙ্গুল উপর নীচ করে ক্রুশ চিহ্ন বানায় এবং উভয়ে একসাথে বলে ওঠে যে, তারা ইহুদী।
“তবে তোমরা ময়দানে গিয়ে কি করবে?” এক বৃদ্ধ তাদের বলে “তোমরা বেশ হৃষ্ট-পুষ্ট। শরীরে বেশ শক্তি আছে। তোমরা নিজেদেরকে কুমারী মারইয়ামের ইজ্জত রক্ষার্থে উৎসর্গ হওয়ার যোগ্য মনে কর না? তোমাদের কাছে পেটের মায়াই কি বড় হয়ে গেল?”
“না, কখনো নয়। তাদের একজন বলে আমাদেরকে সব ভেঙ্গে বল এবং তোমাদের মাঝে যিনি সবচেয়ে বিচক্ষণ ও জ্ঞানী তার সাথে আমাদের সাক্ষাৎ করিয়ে দাও। আমরা তাকে কিছু বলতে চাই।
সেখানে ইরানী ফৌজের সাবেক এক কমান্ডার ছিল। আগন্তুকদ্বয়কে তার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।
“শুনলাম তোমরা নাকি কিছু বলতে চাও” কমান্ডার বলে। “জী, হ্যাঁ!” একজন বলে “আমরা গন্তব্যের রাস্তা ছেড়ে এদিকে এসেছি। “শুনলাম, মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি ফৌজ তৈরি হচ্ছে।”
