“আন্দারযগার!” উরদূশের বলে “এখানে বসে পরিকল্পনা তৈরি করা সহজ কিন্তু তা বাস্তবে পরিণত করা বড়ই কঠিন। এই কমান্ডার একটি তথ্য দিয়েছে; এ ব্যাপারে চিন্তা করে দেখ। সে বলেছে মুসলমানরা নিজ নিজ ধর্ম ও বিশ্বাসে অত্যন্ত বলীয়ান। তারা আল্লাহ এবং রাসূলের নাম নিয়ে লড়াই করে। আমাদের সৈন্যদের মাঝে কি এই ধর্মীয় চেতনাবোধ আছে?… ঐ পরিমাণ নেই, যা মুসলমানদের মধ্যে আছে।… এবং এ দিকটাও খেয়াল কর আন্দারযগার। মুসলমানরা স্বদেশ ছেড়ে বহু দূরে এখন। এটা তাদের আরেক দুর্বলতা। এখানকার লোকেরা তাদের বিরোধী হবে।”
“না রাজাধিরাজ!” কমান্ডার বলে “পারস্যের যে এলাকা মুসলমানরা দখল করে নিয়েছে, সেখানকার লোকেরা তাদের মেনে নিয়েছে। তাদের আচার-ব্যবহার এত অমায়িক যে, তাদেরকে তারা আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছে। তারা তাদের উপরই কেবল হাত উঠায়, যাদের আচরণ সন্দেহপূর্ণ হয়।”
“এখানকার আরব ইহুদীরা তাদের সমর্থন করতে পারে না। আন্দারযগার বলে “আমার অন্তরে তাদের প্রতি যে মহব্বত রয়েছে সে সম্পর্কে তারা ভালভাবে অবগত। আমি তাদেরকে আমার ফৌজে শামিল করে নেব। এখানকার মুসলমানদের উপর আমার আস্থা নেই। তারা চিরদিন অবাধ্য এবং বিদ্রোহী। তাদের উপর আমাদের কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে। মদীনাবাসীদের সাথে তাদের যাবতীয় সেতুবন্ধন।”
“এ সকল মুসলমানের সাথে পূর্বের তুলনায় অধিক খারাপ আচরণ করে” উরদূশের বলে “তাদেরকে মাথা উঁচু করার সুযোগ দিবে না।”
“আমরা তাদেরকে পশুর পর্যায়ে রেখেছি” আন্দারযগার বলে “তাদের ক্ষুধার্ত রেখেছি, তাদের ক্ষেতের ফসল আমরা সংগ্রহ করে নিয়ে আসি। জীবন ধারনের জন্য সামান্য কিছু দিয়ে আসি মাত্র। তারপরেও তারা ইসলাম থেকে হাত গুটিয়ে নেয় না। ক্ষুধায় তিলে তিলে মরতে রাজি তবে ইসলাম ছাড়তে প্রস্তুত নয়।”
“এটাই তাদের আত্মিক শক্তি” কমান্ডার বলে– “নতুবা এক ব্যক্তি কখনো দশজনের মোকাবিলা করতে পারে না। কাপড়ের বস্ত্র পরিহিত বর্মাচ্ছাদিতকে হত্যা করতে পারে না। মুসলমানরা এটা বাস্তবে পরিণত করে দেখিয়েছে।”
“আমি এই শক্তি মাটির সাথে পিষে ফেলব” উরদূশের উচ্চ আওয়াজে বলে আন্দারযগার! এক্ষুণি ঐ মুসলমানদের কিছু বলো না, যারা আমাদের প্রজা হয়ে সেখানে আছে। তাদের এই প্রতারণার জালে আটকে রাখ যে, আমরা তোমাদের গুরুত্ব দিই; তোমাদের সাহায্য চাই। যারা আমাদের রাজত্বে পা রাখার সাহস দেখিয়েছে আগে তাদের শায়েস্তা কর। পরে ঐ নরপশুদের কচুকাটা কাটব যারা আমাদের আশ্রয়ে থেকে সাপের মত প্রতিপালিত হচ্ছে। তাদের বিষদাঁত আমরা এক একটা করে তুলে ফেলব। বড় নির্মমভাবে তাদের হত্যা করব।”
কিছু সময়ের ব্যবধানে ঐ দিনই উরদূশের মন্ত্রী, আন্দারযগার এবং তার অধীনস্থ সালারদের ডেকে পাঠায়। তারা উপস্থিত হলে সে বলে “যেখানে হামলা আমাদের করার ছিল অর্থাৎ মদীনা আক্রমণ করে সেখানেই ইসলাম ধুলিস্যাৎ করা উচিত ছিল, সেখানে হামলার সূচনা তারাই করে এবং আমাদের সৈন্যরা তাদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।”
“মাত্র দু’ রণাঙ্গনেই আমাদের চার জাদরেল সালার মারা গেছে” উরদূশের বলে “এই চার সালারকে আমার সমরশক্তির স্তম্ভ মনে করতাম। কিন্তু তাদের মারা যাওয়ার দরুণ কিসরার শক্তি মরে যায় নি। সবাই কান খুলে শোন, যে সেনাপতি বা সহসেনাপতি পরাজিত হয়ে ফিরে আসবে তাকে আমি জল্লাদের হাতে তুলে দিব। এর চেয়ে এটাই ভাল যে, সে নিজেই নিজেকে হত্যা করবে। কিংবা অন্য কোথাও চলে যাবে। ইরানের সীমায় যেন না থাকে।….
“আন্দারযগার। মাদায়েন এবং তার আশ-পাশ থেকে যত সৈন্য চাও নিয়ে যাও। সেনাপতি বাহমানকে আমি খবর পাঠিয়েছি যে, সে যেন সমস্ত ফৌজ নিয়ে ফোরাতের উপকূলবর্তী ওলযা নামক স্থানে এসে পৌঁছে। তুমি তার থেকেও দ্রুত ওলযায় যাও। সেখানে ছাউনী ফেলে বাহমানের অপেক্ষা করবে। সে এলেই উভয় বাহিনী মুসলমানদের ঘিরে নিতে চেষ্টা করবে। তাদের একজন সৈন্য এবং কোন পশু যেন জীবিত না থাকে। তাদের সংখ্যা তোমাদের তুলনায় কিছুই নয়। আমি কোন বন্দী মুসলমান দেখতে চাইনা। তাদের লাশ দেখতে চাই। আমাকে তাদের লাশ উপহার দিবে। আমি তাদের ঐ লাশ দেখতে আসব, যা মৃত উট ও ঘোড়ার মাঝে একাকার হয়ে থাকবে। হয় জয় নয়ত মৃত্যু এই দুয়ের উপর যরথুস্ত্রের নামে তোমাদের শপথ করতে হবে। …
“আন্দারযগার উভয় বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবে। … আন্দারযগার! তোমার মাথায় কোন সংশয় এবং ধোঁকার অস্তিত্ব না থাকা চাই। মনে রেখ মুসলমানরা যদি আরো এগিয়ে আসার সুযোগ পায় এবং আমাদের আরো একবার পরাজিত করতে পারে তবে রোমকরাও আমাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে এগিয়ে আসবে।”
“মহামান্য সম্রাট! পরাজয় শব্দ আর আপনার কান স্পর্শ করবে না” সর্বাধিনায়ক আন্দারযগার বলে “ইহুদী শক্তিকেও দলে ভিড়িয়ে নেয়ার অনুমতি আমায় দিন। তাদের যোগদানে ফৌজ বেশ স্ফীত হবে বলে আশা করি।”
“তুমি যা ভাল বোঝ কর” উরদূশের বলে “কিন্তু আমি সময় নষ্ট করার অনুমতি দিব না। ইহুদীদের প্রতি তোমার আস্থা থাকলে তাদেরও সঙ্গে নিতে পার।”
ইরাকের একটি অঞ্চলে ইহুদীদের একটি বড় গোত্র বকর বিন ওয়ায়েল বসবাসরত। এরা মূলত আরবের অধিবাসী। ইসলামের সম্প্রসারণ কালে যে সকল ইহুদী ইসলাম কবুল করতে অস্বীকৃতি জানায় তারা এক এক করে এসে এখানে আবাস গড়ে তোলে। তাদের মধ্যে এমন লোকও ছিল, যারা কোন সময় ইরানীদের বিরুদ্ধে লড়তে এসে যুদ্ধবন্ধী হয়েছিল। ইরানীরা তাদেরকে আযাদ করে এই এলাকায় বাস করতে দেয়। এখানকার কিছু লোক মুসলমানও ছিল। মুসান্না বিন হারেছার মত তুখোড় নেতা তারা লাভ করেছিল। ফলে তার মাধ্যমে তারা পাক্কা মুসলমান হতে পেরেছিল। মুসলমানদের উপর ইরানীরা সীমাহীন জুলুম করলেও ইহুদীদের সাথে আচরণ কিছুটা ভিন্নতর ছিল। ঐতিহাসিকদের অভিমত, সেনাপতি আন্দারযগার হুরমুজের মত জালিম ছিল না। মুসলমানদের উপর সে জুলুম না করলেও তাদের ভাল চোখে দেখত না। ইহুদীদের সাথে তার ছিল দহরম-মহরম। এ পর্যায়ে সে ইহুদীদের সাহায্যের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। সে বকর বিন ওয়ায়েলের সর্বোচ্চ নেতাদের ডেকে পাঠায়। তারা খবর পেয়েই ছুটে আসে।
