চিকিৎসকের বলায় দূত থামে না; সে স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে, তার কাছে কিসরার সুস্থতা গুরুত্বপূর্ণ নয়; পারস্য সাম্রাজ্য এবং যরথুস্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করাই বড় কথা। সম্রাট উরদূশেরকে দজলা এবং ফোরাতের যুদ্ধের বর্ণনা পূর্ণরূপে অবগত না করালে ক’দিন বাদেই মুসলমানরা মাদায়েনের ফটকে এসে নক করবে। দূত চিকিৎসকের আর কোন কথা শোনে না। সোজা ভেতরে চলে যায় এবং উরদূশেরকে জানায় যে, মুসলমানরা ইরানীদেরকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে। উরদূশের শায়িত ছিল; সংবাদ শুনে উঠে বসে। রাগে তার ঠোঁট এবং হাত কাঁপছিল।
“মহামান্য সম্রাট!” কমান্ডার বলে–“মদীনাবাসী জ্বিন নয়; সকলে তাদের দেখতে পায়। কিন্তু…!”
“তা কারেন কি মরে গিয়েছিল?” উরদূশের তার কথা শেষ করতে না দিয়েই ক্রোধে ফেটে পড়ে জিজ্ঞাসা করে।
“জ্বি হা!” কমান্ডার জবাব দেয়–“তিনি মল্লযুদ্ধে মারা গিয়েছিলেন। তার পক্ষে উভয় বাহিনীর সংঘর্ষ দেখা সম্ভব হয় নি।”
“আমাকে জানানো হয়েছিল যে, কুববায এবং আনুশযানও তাদের সাথে ছিল” উরদূশের এ কথা বলে তাদের সম্পর্কে জানতে চায়।
“তারাও কারেনের ভাগ্য বরণ করে”– কমান্ডার বলে–“তারা কারেন হত্যার প্রতিশোধ নিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। উভয়ই একসাথে গিয়ে মদীনার সালারদেরকে আহ্বান করে এবং তুমুল সংঘর্ষে উভয় মারা যায়।… মহামান্য সম্রাট। মহান পারস্য সাম্রাজ্যের এই অবস্থা কি চলতে পারে? না… না…যদি মহামান্য সম্রাট বেদনায় এভাবে নিজেকে রোগাক্রান্ত করে ফেলে তবে কি আমরা যরথুস্ত্রের মান-মর্যাদা মদীনার বুদ্দুদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারব?”
“তোমার পরিচয় কি?” উরদূশের জানতে চায়।
“আমি কমান্ডার মাত্র”–কমান্ডার জবাব দেয়–“আমি কারো প্রেরিত দূত নই। আমি যরথুস্ত্রের আত্ম নিবেদিত গোলাম।”
“প্রহরীকে ডাক”–উরদূশের নির্দেশ দেয়–“তুমি আমাকে নয়া প্রেরণায় উজ্জীবিত করেছ।… আমাকে বল, মুসলমানদের সৈন্য সংখ্যা কোথায় বেশী? তাদের কাছে ঘোড়া বেশী? আর কি কি আছে তাদের কাছে?
প্রহরী ভেতরে আসে এবং নির্দেশের অপেক্ষায় নতশিরে ঝুঁকে থাকে। “সেনাপতি আন্দারযগারকে ডাক” উরদূশের প্রহরীকে বলে এবং কমান্ডারের কাছে জানতে চায় “তাদের কাছে কি কি আছে এবং কি কি নেই… সব খুলে আমাকে বল।”
“আমাদের অনুপাতে তাদের কাছে কিছুই নেই” কমান্ডার জবাবে বলে, “তাদের মাঝে লড়ার প্রেরণা আছে। আমি তাদের নারা ধ্বনি শুনেছি। তারা নারার মাঝে নিজেদের প্রভু এবং রাসূলকে স্মরণ করে। আমি তাদের মাঝে অবর্ণনীয় ধর্মীয় টান দেখেছি। তারা নিজ বিশ্বাস ও চেতনায় অত্যন্ত পক্ক। আর এটাই তাদের মূলশক্তি। প্রতিটি রণাঙ্গনে তাদের সৈন্যসংখ্যা খুবই কম থাকে।”
“থাম!” উরদূশের বলে, “আন্দারযগার আসছে। এ সেনাপতির উপর আমার আস্থা আছে। তাকে জানাবে, আমাদের বাহিনীতে কোন্ কোন্ দুর্বলতা আছে যার কাছে সংখ্যায় বেশী হয়েও তাদের পালাতে হচ্ছে?”
***
“আন্দারযগার!” উরদূশের শয্যায় অর্ধমৃত অবস্থায় পড়েছিল। সে শুয়ে থেকেই তার এক নামকরা সালারকে বলছিল “তুমি এ সংবাদ শুনেছ যে, কারেনও মারা গেছে? অপর দুই সালার কুববায এবং আনুশযানও নিহত?”
আন্দারযগারের চোখ স্থির হয়ে যায়। রাজ্যের বিস্ময় তাকে ক্ষণিকের জন্য নির্বাক করে দেয়। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শুধু।
“তাকে সব খুলে বল কমান্ডার!” উরদূশের কমান্ডার বলে “এভাবে একের পর এক পরাজয়ের সংবাদ আসতে থাকলে কতক্ষণ আমার পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব হবে?”
মুসলমানরা মা’কাল দরিয়ার কূলে তাদেরকে কিভাবে পরাজিত করে তা বিস্তারিতভাবে কমান্ডার সালার আন্দারযগারকে জানায়। সে তাকে ইরানীদের পশ্চাদপসারণের দৃশ্যও খুলে খুলে বলে।
“আন্দারযগার!” উরদূশের বলে “আমি আর কোন পরাজয়ের ঝুঁকি নিতে চাই না। মুসলমানদের থেকে পরাজয়ের শুধু প্রতিশোধই নিবে না; তাদের হত্যা করে করে ফোরাতের স্রোতে ভাসিয়ে দিতে হবে। আর এটা কেবল তখনই সম্ভব হতে পারে যদি তুমি বেশীর থেকে বেশী সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হতে পার। অত্র এলাকা তোমার চেনা আছে। তুমিই ভাল বুঝবে, মুসলমানদের ফাঁদে ফেলে কোথায় লড়ানো দরকার।
“তারা মরুভূমির অধিবাসী” আন্দারযগার বলে “এবং তারা মরুভূমিতেই লড়াই করতে অভ্যস্ত। আমি তাদেরকে উর্বর এবং সবুজ-শ্যামলিমা স্থানে আসার সুযোগ দিব অতঃপর তাদের উপর হামলা করব। আমার দৃষ্টিতে ওলযা উপযুক্ত স্থান।” এরপর সে কমান্ডারকে জিজ্ঞাসা করে তাদের অশ্বারোহীরা কেমন?”
“অশ্বারোহীরাই তাদের মূল শক্তি” কমান্ডার বলে “তাদের অশ্বারোহীরা বড়ই দ্রুতগতির এবং সতর্ক। ছুটন্ত ঘোড়া হতে নিক্ষিপ্ত বর্শা টার্গেট মিস করে না। চোখের পলকে তারা এই হামলা করে। তারা স্থির হয়ে লড়ে না। আক্রমণের সূচনা ঘটিয়ে এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে।”
“এটাই সূক্ষ্ম বিজয়, যা আমাদের সালার বুঝে উঠতে পারেন নি।” আন্দারযগার নিজের উরুতে হাত মেরে বলে ‘মুসলমানরা মুখোমুখী লড়তেই পারে না। আমরা তাদের থেকে কয়েকগুণ বেশী সৈন্য নিয়ে যাব। আমি তাদেরকে আমার সৈন্যদের আওতার মধ্যে নিয়ে সামনা-সামনি লড়তে তাদেরকে বাধ্য করব। জীবন বাঁচাতে তখন তাদের এমনটি করতেই হবে। তারা এবার বুঝবে যুদ্ধ কারে কয়।”
