প্রিয় বন্ধুরা এখানকার লোকদের সাথে না নিয়ে আমরা এখানে এক কদমও সামনে বাড়তে পারি না। আমরা কারো কাছে ভিক্ষার হাত পাতব না। আমরা তাদেরকে ভালবাসা দিয়ে আপন করে নিতে চেষ্টা করব। আমাদেরকে প্রকাশ্যভাবে কিংবা গোপনে ক্ষতি করতে চেষ্টা করছে এ ব্যপারে কারো উপর বিন্দুমাত্র সন্দেহ হলে আমরা তাকে বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করব। আমরা কাউকে গোলাম বানাতে আসিনি এবং তাদেরকে অন্যের গোলামী এবং ভ্রান্ত আকীদা বিশ্বাস হতে উদ্ধার করতে এসেছি। যে সকল এলাকা আমাদের অধিকারে এসেছে তার নিয়ন্ত্রণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় এখনই আমাদের মনোযোগী হতে হবে। বিজিত এলাকায় মুসলিম বসতিও আছে। নিশ্চিত তারা আমাদের সহায়তা করবে। কিন্তু বন্ধুগণ কারো উপর শুধু এ কারণে আস্থা রাখা যাবে না যে, সে মুসলমান। কারণ, গোলামী এমন খারাপ জিনিস যা মানুষের প্রবৃত্তিকেই পাল্টে দেয়। হিতাহিত জ্ঞান হ্রাস করে। এখানকার লোকদের মাঝে আস্থা সৃষ্টি করে তাদের থেকে জেনে নিতে হবে যে, তাদের মধ্যে বা এই এলাকায় ইরানীদের সমর্থক কে কে আছে। তাদের যাচাই করে স্তর নির্ধারণ করতে হবে। যার উপর সামান্য সন্দেহ হবে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে। যে সকল অমুসলিম আন্তরিকভাবে আমাদের সাহায্য করতে ইচ্ছুক তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতে হবে।… আমি কয়েকটি শ্রেণীতে জনতাকে ভাগ করতে চাই।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিজিত এলাকার লোকদের প্রতি সবচেয়ে গুরুত্ব দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, যে সকল অমুসলিম মুসলমানদের অনুগত হয়ে থাকবে তাদের থেকে ট্যাক্স উসুল করা হবে। বিনিময়ে মুসলমানরা তাদের নিরাপত্তা দিবে। তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং জান-মালের নিরাপত্তা দেয়া হবে।
এই ঘোষণার পরপরই অনেক অমুসলিম মুসলমানদের আশ্রয়ে চলে আসে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই এলাকা হতে কর, ট্যাক্স উঠাতে একটি দল গঠন করেন। এ দলের নেতৃত্বে থাকে সাবীদ বিন মুকরিন। আরেকটি অত্যাবশ্যকীয় টিম গঠিত হয় গোয়েন্দা টিম নামে। কারণ, এখন থেকে নিয়মিত এবং প্রশিক্ষিত গোয়েন্দা দলের প্রয়োজন আছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গোয়েন্দা দল গঠন করেই তাদেরকে ফোরাত নদীর ওপারে পাঠিয়ে দেন। তাদের কাজ ও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হয়।
গনীমতের যে মাল সংগ্রহ করা হয় তা জঙ্গে সালাসিলের তুলনায় অনেক বেশী ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্পূর্ণ গনীমত পাঁচ ভাগে বিভক্ত করেন। চার ভাগ সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দেন আর এক ভাগ মদীনায় পাঠিয়ে দেন।
ঐতিহাসিকরা লেখেন, এরপর থেকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এত চিন্তিত ও গম্ভীর হয়ে যান, যা ইতোপূর্বে তার জীবনে দেখা যায় নি।
॥ দশ ॥
৬৩৩ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসের প্রথম সপ্তাহ। ১২ হিজরীর সফর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ। যরথুস্ত্রের অনুসারীদের জন্য ফোরাতের সবুজ শ্যামল এলাকাটি এদিন জাহান্নামে পরিণত হয়।
সমর শক্তি, রসদ সামগ্রী উট ঘোড়া এবং হাতিয়ার নিয়ে ইরানীদের গর্বের শেষ ছিল না। তারা নিজেরদেরকে ফেরআউনের সমকক্ষ বলেও দাবী করত। আর কিসরা তো ত্রাসের প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। দজলা এবং ফোরাতের মিলন মোহনায় আল্লাহর তরবারি বলে খ্যাত হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরানীদের এক শোচনীয় পরাজয়ের স্বাদ জোর করে আস্বাদন করান। হুরমুজ, কারেন, আনুশাযান এবং কুববাযের মত নামকরা সালারদের মৃত্যুর দুয়ারে নিক্ষেপ করেছিলেন। কিন্তু তারপরেও কিসরা উরদূশের পরাজয় স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল না। তার অধীনে এখনও প্রচুর সৈন্য ছিল এবং মদীনার মুজাহিদদেরকে সে এখনো বুদ্দু এবং মরুডাকাত বলে মনে করত।
পরাজয় স্বীকার না করলেও পরাজয় এবং জাদরেল সালারদের নিহত হওয়ায় সে অন্তরে যে বিরাট আঘাত পায় তা লুকাতে পারে না। হুরমুজের মৃত্যুর সংবাদ দেয়া হলে সে বুকে হাত রেখে সামনের দিকে বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। নিজেকে সামলে নেয়ার বহু চেষ্টা সে করেছিল কিন্তু এক অজ্ঞাত রোগে সে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। রোগের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে, তাকে সিংহাসন হতে দূরশয্যায় আছড়ে ফেলে। ঐতিহাসিকগণ এই রোগের কারণ পরাজয়ের আঘাত লিখেছেন।
“পরাজয় এবং পশ্চাদপসারণ ছাড়া আমার জন্য আর কোন সংবাদ নেই কি?” সে শয্যা থেকে বসে গর্জে উঠে বলে “মদীনার মুসলমানরা কি তাহলে জিন? কারো চোখে পড়ে না, ফাঁকে আক্রমণ করে চলে যায়?”
শাহী ডাক্তার, উরদূশেরের চোখের পুত্তলীসম দুই যুবতী স্ত্রী এবং এক উজীর বিস্মিত এবং নির্বাকভাবে ঐ দূতের দিকে চেয়েছিল, যে ইরানীদের আরেকটি পরাজয় এবং পিছু হটার সংবাদ নিয়ে এসেছিল। দূত আসার সংবাদ দেয়া হলে প্রথমে ডাক্তার বাইরে এসে দূতকে জিজ্ঞাসা করে যে, সে কি সংবাদ নিয়ে এসেছে। দূত সংবাদ জানালে ডাক্তার তাকে বলেছিল, সে যেন কিসরাকে এখনই এই খারাপ সংবাদ না জানায়। কারণ, সে এ মর্মান্তিক খবর সহ্য করতে পারবে না। কিন্ত এই দূত কোন সাধারণ সিপাহী ছিল না যে, ডাক্তার যা বলবে, তাই শুনবে। সে ছিল সাবেক কমান্ডার। তার পদমর্যাদা সালার থেকে দুই স্তর কম ছিল। তাকে কোন সালার প্রেরণ করে নাই। আর তাকে প্রেরণের জন্য কোনই সালার জীবিতও ছিল না।
