এর সাথে সাথে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মধ্যম বাহিনীর সংরক্ষিত দলকে শত্রুর মধ্যম বাহিনীর উপর হামলা করার নির্দেশ দেন। যারা ইতোপূর্বে উর্মিমালার মত ছন্দময় ভঙ্গিতে আক্রমণ করছিল। তাদেরকে পিছনে সরিয়ে আনেন। যেন তারা আবেগে উদ্বেলিত হয়ে দুর্বলতার এমন পর্যায়ে পৌঁছে না যায়, যা সহ্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না।
ইরানীরা মুসলিম বাহিনীর নয়া তুফান সহ্য করতে পারে না। এরই মধ্যে তাদের প্রচুর প্রাণহানি হয়েছিল। তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে থাকে। পিছনে থাকা ইরানীদেরকে মুসলমানরা দরিয়ার দিকে দৌড়ে যেতে দেখে। তারা এর কারণ উদঘাটনে মনোযোগ দিলে দরিয়ার তীরে অসংখ্য নৌযান ভিড়ানো দেখতে পায়।
“নৌযান গুঁড়িয়ে দাও”–এক মুসলমানের কণ্ঠ শোনা যায়।
“শত্রুরা পালাতে নৌযান সাথে নিয়ে এসেছে”–আরেকটি কণ্ঠস্বর ওঠে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আওয়াজ শুনে ডান ও বাম দিকের বাহিনীর প্রতি এই নির্দেশ দিয়ে দূত পাঠান যে, দ্রুত তাদেরকে শত্রুর পিছনে যেতে চেষ্টা কর এবং তাদের নৌযান ভেঙ্গে দাও। সেগুলো কব্জা কর। কব্জা করতে পারলে তা মুসলিম বাহিনীর পার হওয়ার কাজে আসবে।
এই নির্দেশ সালার এবং সালারের মুখ ঘুরে সমস্ত সৈন্যের কানে গিয়ে পৌঁছে তখন চতুর্দিকে একই আওয়াজ উঠতে থাকে যে, “নৌকার কাছে যাও।… নৌকা অকেজো করে দাও… নৌযান কব্জা কর।”
এই চতুর্মুখী আওয়াজ ইরানীদের বাহু ভেঙ্গে দেয়। প্রাণ বাঁচানোর এই একটি পন্থাই ছিল, যা মুসলমানদের চোখে পড়ে যায়। ইরানীরা এবার যুদ্ধ বন্ধ করে নদীমুখী হয়। কে কার আগে নৌযানে উঠবে এই প্রতিযোগিতা চলতে থাকে। তাদের অবস্থা ভয়ার্ত ভেড়ার পালের মত ছিল, যারা ভয় পেয়ে একে অন্যের আড়ালে লুকাতে চেষ্টা করে। ইরানী সৈন্যরা নৌযানে উঠতে ঘোড়া ছেড়ে যায়। অথচ নৌযান এত বড় ছিল যে ঘোড়াসহ তারা তাতে উঠতে পারত।
এ সময় মুসলমানদের হাতে অগ্নিপূজকদের গণহত্যা হতে থাকে। তারা নৌযানে উঠতে ভীড় করায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খায়। যারা নৌযানে উঠতে এবং নৌযান কূল থেকে দূর পানিতে নিয়ে যেতে পেরেছিল তাদের অধিকাংশই মুসলমানদের তীরের শিকার হয়। তারপরেও কিছুলোক ভাগ্যক্রমে বেঁচে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
অধিকাংশ ঐতিহাসিকের অভিমত, এই যুদ্ধে ৩০ হাজার ইরানী সৈন্য মারা যায়। আহতদের সংখ্যা কেউ উল্লেখ করেন নি। তবে অনুমান করতে বেগ পেতে হয় না যে, যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা এত পরিমাণ সেখানে আহতের সংখ্যা এর থেকে বেশী না হলেও অন্তত কম হবে না। যার অর্থ এই ছিল যে, পারস্য সম্রাট যে সমর শক্তি নিয়ে গর্ব করত তার সে গর্বের চূঁড়া সহসা ধ্বসে পড়েছিল। মুসলমানদের হাতে দাফন হয়ে গিয়েছিল তার দম্ভ। নিজেদেরকে অজেয় মনে করার ফানুস গিয়েছিল ফুটো হয়ে। বিশাল সৈন্য আর প্রচুর হাতিয়ার রসদ সবই মুসলমানদের জিহাদী প্রেরণার কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে। যে মুসলমানদের তারা বর্বর বলে উড়িয়ে দিত আজ তাদের হাতেই ইরান সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে ওঠে। মা’কাল নদীর তীর বহুদূর পর্যন্ত রক্তরাঙ্গা ছিল। রণাঙ্গনের দৃশ্য ছিল বড়ই ভয়ংকর। দৃষ্টি যতদূর যায় ততদূর শুধু লাশ আর লাশ ছিল। ইতস্তত আহতদের ছটফটও করতে দেখা যায়। আহত ঘোড়া এদিক ওদিক ছুটতে থাকে আর আহতদের পিষে মারতে থাকে। মুজাহিদরা আহত সাথী এবং শহীদ ভাইদের লাশ উদ্ধার করছিল। রণাঙ্গন ঢাকা পড়েছিল তাজা রক্তের চাদরে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পার্শ্ববর্তী একটি উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের দৃশ্য দেখছিলেন। এক দিক হতে এক অশ্বারোহী অশ্ব ছুটিয়ে আসেন। তিনি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কাছে এসে ঘোড়া থামান। তিনি ছিলেন মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু। ঘোড়া হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘোড়ার পাশে নিয়ে হযরত মুসান্না ঘোড়ার উপর থেকেই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে আলিঙ্গনাবদ্ধ হন।
“জনাব খালিদ!” হযরত মুসান্না আবেগঝরা কণ্ঠে বলেন “আজ আমি মজলুম মুসলমানের রক্তের প্রতিশোধ নিয়েছি।”
“প্রতিশোধের এখানেই শেষ নয় ইবনে হারেছা!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বাভাবিকতার চেয়ে একটু গম্ভীর কণ্ঠে বলেন “কেবল তো শুরু; আমাদের আসল বিপদ এরপরে আসবে। তুমি তাদের নৌকার সংখ্যা দেখনি? দেখনি তাদের নৌকা কত বিরাট এবং কত মজবুত? তাদের যুদ্ধাস্ত্র এবং রসদেরও কোন কমতি নেই। অথচ আমরা স্বদেশ ছেড়ে কত দূরে। এখন আমাকে তাদের থেকেই হাতিয়ার এবং রসদ ছিনিয়ে নিয়ে আমাদের প্রয়োজন মিটাতে হবে। এটা এত সহজ কাজ নয় ইবনে হারেছা? আর আমার পক্ষে এটাও সম্ভব নয় যে, তাদের এতসব প্রাচুর্য এবং আমাদের অপ্রতুলতা দেখে ঘাবড়ে ফিরে যাব।”
“আমরা কখনো ফিরে যাব না ইবনে ওলীদ।” হযরত মুসান্না অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলেন–“কিসরার শিশমহলে এক একটি ইট আমরা খুলে নিব। আমরা তাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিব যে, তাদের মিথ্যা খোদার রাজত্ব বেশিদিন চলতে পারে না। সত্যের নির্মম কশাঘাতে মিথ্যার পতন অনিবার্য”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতিদের ডেকে পাঠান। তিনি এর পূর্বে গনীমতের মাল জমা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। “আমাদের কঠিন সময় শুরু হয়েছে”– হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উপস্থিত সেনাপতিদের উদ্দেশে বলেন–“আমরা বর্তমান শত্রুর ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে। এখানকার প্রতিটি বৃক্ষ, প্রতিটি পাথর এবং মাটির প্রতিটি অংশ পর্যন্ত আমাদের শত্রু। এখানকার লোকেরা আমাদের জন্য অপরিচিত। তাদের অন্তরে পারস্য সাম্রাজ্যের নীতি প্রবল। তারা উরদুশেরকে ফেরআউন মনে করে। তাদের এ কথা বিশ্বাস করাতে বড়ই বেগ পেতে হবে যে, এমন শক্তিও আছে যা পারস্য সাম্রাজ্যের ভিত ভেঙ্গে দিয়েছে।…
