কার বুকের পাটা আছে আমাদের মোকাবিলা করার।” দু’ অশ্বারোহীর একজনের হুঙ্কার ভেসে আসে–“আমরা সেনাপতি হত্যার প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”
“আমি একাই তোদের দু’জনার জন্য যথেষ্ট”– হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বলেন এবং ঘোড়া ছুটিয়ে দেন।
আচমকা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পশ্চাৎ হতে দুটি ঘোড়া এসে তাঁর ডান-বাম দিক দিয়ে দ্রুত সামনে বেরিয়ে যায়। এক অশ্বারোহীর এই আহ্বান হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কানে এসে পৌঁছে “পিছে থাকুন জনাব খালিদ। এ দু’ সালার আমাদের বাহু বল একবার প্রদর্শন করেছে।”
“এবার আমরা তাদের পালাবার সুযোগ দিব না” অপর অশ্বারোহীর উক্তি বাতাস বয়ে এনে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর কানে পৌঁছে দেয়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ছুটন্ত দু’ অশ্বারোহীকে চিনতে চেষ্টা করেন। তারা ছিল তাঁরই ডান এবং বাম বাহিনীর কমান্ডার হযরত আছেম বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আদী ইবনে হাতেম রাযিয়াল্লাহু আনহু। তাদের পরনে সাধারণ পোশাক ছিল। কিন্তু তাদের প্রতিপক্ষের সারা দেহ লৌহাবরণে আচ্ছাদিত ছিল। মুসলমানদের ভরশা ছিল আল্লাহর উপর। আর ইরানীদের আস্থা ছিল লৌহাবরণের উপর। তাদের জানা ছিল না যে, তরবারির আঘাত লৌহ ইস্পাত নয়; একমাত্র আকীদা বিশ্বাস এবং চেতনা প্রতিহত করতে পারে।
উভয় পক্ষের অভিজ্ঞ সেনাপতিরা এখন মল্লযুদ্ধের ময়দানে। সবাই তরবারি চালনায় সমান দক্ষ এবং প্রসিদ্ধ। তলোয়ারে তলোয়ারে তীব্র সংঘর্ষ চলে। প্রতিটি সংঘর্ষের পরেই তীব্র আলোর ঝলকানি ও স্ফুলিঙ্গ ওঠে। মুসলমানদের তলোয়ার ইরানীদের লোহার প্রাচীর ভেদ করতে অপারগ ছিল। ফলে তারা সতর্ক হয়ে আক্রমণ করত যেন তরবারি তাদের কোন ক্ষতি করতে না পারে। হযরত আছেম এবং হযরত আদী রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আশায় থাকেন যে, শত্রুর কোন দুর্বল এবং অরক্ষিত স্থান প্রকাশ পেলে হযরত মা’কালের মত তাঁরা সেখানে আক্রমণ করবেন। পরিশেষে তারা পালাক্রমে শত্রুর নিকটে এগিয়ে গিয়ে তাদেরকে উপর দিক হতে আক্রমণের সুযোগ করে দেন। অগ্নিপূজক উভয় সালার ঐ ভুলই করে যা ইতোপূর্বে কারেন করেছিল। তারা আক্রমণ করতে তরবারি উঁচু করলে মুসলিম সালারদের তরবারি সোজা তাদের বগলে ঢুকে যায় এবং তাদের উঁচু করা তরবারি উপর থেকে মাটিতে ছিটকে পড়ে। প্রতিপক্ষের উপর তা পতিত হয় না।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যখন দেখেন যে, ইরানীদের সর্বাধিনায়ক নিহত এবং দুই পার্শ্ব বাহিনীর ঐ সালারদ্বয়ও নিহত যাদের দায়িত্ব ছিল পুরো ফৌজকে সুশৃঙ্খলভাবে লড়ানো তখন তিনি তাঁর বাহিনীকে একযোগে ইরানীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন।
পূর্ব পরাজয়ের গভীর ক্ষত এবং তার মারাত্মক প্রভাব তখনো ইরানীদের অন্ত রে গেঁথে ছিল। সেই সাথে এবার চোখের সামনে তাদের সর্বোচ্চ তিন নেতাকে এভাবে চরম ও নির্মমভাবে নিহত হতে দেখে তাদের পূর্বভীতি কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। দেখতে দেখতে সমস্ত সৈন্যদের মাঝে উদ্বেগ ও ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। ভাঙ্গা হৃদয় হলেও মুসলমানদের এগিয়ে আসতে দেখে তারাও দাঁড়িয়ে যায়। তাদের এক বাড়তি শক্তি এই ছিল যে, পশ্চাতে দরিয়া থাকায় তারা পিছন দিক থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিল। আরেকটি লাভ এই ছিল যে, দরিয়ায় অসংখ্য নৌযান নোঙ্গর করা ছিল। এগুলো চড়েই তারা এপার এসেছিল। বিপর্যয়কর অবস্থা দেখা দিলে এই নৌযানে চড়ে তারা নিরাপদ এলাকায় চলে যেতে পারবে বলে ভেবে রাখে। তাদের বিন্দুমাত্র এই ধারণাও ছিল না যে, মুসলমানরা পিছন দিকে থেকেও আসতে পারে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আক্রমণের ভঙ্গি এক যোগে চড়াও হওয়া কিংবা এলোপাতাড়ি ঝাঁপিয়ে পড়া ছিল না। তিনি পুরো বাহিনীকে প্রথম চোঁটেই ব্যবহার করেন না। তিনি মধ্যম বাহিনীকে পালাক্রমে সামনে পাঠান এবং তাদেরকে এই কৌশল শিখিয়ে দেন যে, শত্রুদের বেশী ভেতরে যাবে না; বরং তাদেরকে টোপ দিয়ে সাথে আনার চেষ্টা করবে।
এর সাথে সাথে তিনি দু’পার্শ্ব বাহিনীকে এমনভাবে ছড়িয়ে দেন যেন তারা গিয়ে শত্রুপক্ষের পার্শ্ব বাহিনীতে আঘাত হানতে পারে। আক্রমণের ভীড়ে শত্রুবাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং দুই জাদরেল সালারের লাশ ঘোড়ার পদতলে পিষ্ট হতে থাকে। এটা ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের অহমিকা-গর্ব, যা মুসলমানদের ঘোড়ার পায়ের নীচে নিষ্পেষিত হতে থাকে। এমনি পরিস্থিতিতে শত্রুদের উদ্যমে ভাটা পড়তে পারে, উদ্দীপনা সৃষ্টি হতে পারে না। মুসলমানদের নারাধ্বনি এবং হুঙ্কার তাদের রীতিমত দিশেহারা করে তুলছিল।
“যরথুস্ত্রের অনুসারীরা। আল্লাহকে মেনে নাও।”
আমরা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আশেকান ভক্তকুল।”
“আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার” নারাধ্বনিতে রণাঙ্গন কাঁপছিল। মুসান্না বিন হারেছার সৈন্যদের প্রেরণা ও আবেগ ছিল আরো তুঙ্গে। তাদের হুঙ্কার ছিল কিছুটা ভিন্ন কণ্ঠের।
“তোমাদের এককালের গোলামদের বাহুবল দেখ।”
“আজ কড়ায় গণ্ডায় এতদিনে ঝরানো রক্তের প্রতিশোধ নিব।”
“ডেকে আন উরদূশেরকে।”
“যরথুস্ত্রকে ডাক, কোথায় সে?”
মুসলমানদের একদিকে তীব্র আক্রমণ অপরদিকে হৃদয় কাঁপানো এমনি গর্জন তর্জনে তাদের অবশিষ্ট শক্তিও নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে। হাতিয়ারের বোঝাও তাদের ক্লান্ত করে ফেলেছিল। তারা হাড়ে-হাড়ে ক্লান্তি অনুভব করে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লড়াই করতে করতেই অনুধাবন করতে থাকেন যে, ইরানীরা ক্রমে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। তারা যে ধারায় আক্রমণ প্রথম থেকে প্রতিহত করছিল, এখন তাদের মাঝে সেই গতি আর নেই। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের এই দুর্বলতা লুফে নেন। দ্রুত এক দূত ডেকে পার্শ্ব বাহিনীর কমান্ডার হযরত আছেম ও হযরত আদী বরাবর এই নির্দেশ দিয়ে পাঠান যে নিজ নিজ বাহিনীকে আরো বাইরে এনে তারপর একযোগে শত্রুর পার্শ্ব বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়।
