ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আঘাত তত ভারী ছিল না যে, উবাইয়ের মত শক্তিশালী লোক সোজা হতে পারবে না। সে ঘোড়ার অপর পার্শ্বে ভূপাতিত হয়েছিল। হয়তবা তার উপর ভীতি আপতিত হয়েছিল নতুবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আঘাতটি তার জন্য প্রত্যাশিত ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বিতীয়বার তাকে আঘাত করতে অগ্রসর হলে সে উঠে ঘোড়া সেখানে ফেলে রেখেই পালিয়ে যায়। সে চিৎকার করতে করতে যাচ্ছিল যে – মুহাম্মাদ আমাকে হত্যা করেছে…। মুহাম্মাদ আমাকে মেরে ফেলেছে।”
কুরাইশরা কয়েকজন মিলে তার আহত স্থানটি পরীক্ষা করে তাকে সান্ত্বনা দেয় যে, তাকে কেউ হত্যা করেনি। আঘাত খুবই মামুলী। কিন্তু তার মধ্যে অদৃশ্য হতে এমন এক ভীতি জেঁকে বসে যে, সকল সান্ত্বনা প্রত্যাখ্যান করে শুধু এ কথাই বলতে থাকে যে, “আমি বাঁচব না। মুহাম্মাদ একদিন বলেছিল, আমি তাঁর হাতে নিহত হব।
ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম আরো লিখেন যে, উবাই এ কথাও বলছিল যে, “মুহাম্মাদ যদি আমার উপর কেবল থুথু নিক্ষেপ করত, তবুও আমি মরে যেতাম।”
শেষ পর্যন্ত উবাইয়ের কথাই সত্যে পরিণত হল। উহুদ যুদ্ধ শেষে উবাই কুরাইশদের সাথে মক্কা রওনা হয়। পথিমধ্যে এক জায়গায় তারা যাত্রাবিরতি করলে উবাই সেখানেই মারা যায়।
♣♣♣
স্মৃতি কথা বলে। চার বছর পূর্বের ঘটনা গতকালের ঘটনার মত খালিদের স্মরণ হতে থাকে। তার ধারণা ছিল, কুরাইশরা আজ মুসলমানদের পিষেই ফেলবে। কিন্তু মুসলমানরা যেভাবে জীবন বাজি রেখে প্রতিরোধ গড়ে তোলে তাতে তিনি নিজেই কেঁপে ওঠেন। পদাতিক মুসলমানদের দেখে কুরাইশদের অশ্বগুলোও যেন ভয় পাচ্ছিল। পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে খালিদ নিজের ঘোড়ায় পদাঘাত করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যেও আবু সুফিয়ানকে তালাশ করে তার কাছে পৌঁছে যান।
“আমরা কি মুসলমানদেরকে চুড়ান্তভাবে পরাস্ত করার যোগ্যতা রাখি না?” খালিদ আবু সুফিয়ানকে বলেন– “কুরাইশ মায়েদের দুধ কি খাঁটি ছিল না যে, তারা এই কয়েকজন মুসলমানদের ভয়ে ভীত হচ্ছে?”
আবু সুফিয়ান বলে– “শোন খালিদ!” “মুসলমানদের সাথে মুহাম্মাদ যতক্ষণ থাকবে আর তারা জীবিত থাকবে, দেহের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত তারা পরাজিত হবে না।
“তবে এই দায়িত্ব কেন আমার উপর অর্পণ করছ না?” খালিদ বললেন।
আবু সুফিয়ান বলে কখনও নয়।” “তুমি তোমার সৈন্যদের কাছে ফিরে যাও। তোমার নেতৃত্ব ছাড়া তারা বিক্ষিপ্ত হয়ে যেতে পারে। মুহাম্মাদ আর তাঁর সাথিদের উপর আক্রমণ করার জন্য পদাতিক বাহিনী পাঠাচ্ছি।”
আজ মদীনার উদ্দেশে যাত্রাকালে তাঁর সেদিনের পুরাতন অনুশোচনার কথা মনে পড়ে যে, আবু সুফিয়ান তার একটি বড় আশায় গুড়েবালি দিয়েছিল। রাসূল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করাকে তিনি নিজের প্রধান কর্তব্য বলে মনে করতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হত্যা করে শীর্ষ দেবতা হুবল এবং উযযার সন্তুষ্টি লাভ করা ছিল তার ইচ্ছা। তবুও রণাঙ্গনে অধিনায়কের আদেশ শিরোধার্য মনে করে তিনি নিজ বাহিনীর নিকট চলে যান। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মাত্র কয়েকজন সাহাবী রয়েছেন। অতএব এ অবস্থায় তাঁকে হত্যা করা মোটেও কঠিন হবে না। আর তাঁকে হত্যা করতে পারলে মুসলমানরা কোন দিন উঠে দাঁড়াতে পারবে না। রণাঙ্গনের দৃশ্য তার ভালভাবেই মনে ছিল। তিনি একটি উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে রণাঙ্গনের দিকে চাইলে বহু দূর পর্যন্ত উহুদ-ভুমি রক্তের গাঢ় আস্তরণে আবৃত থাকতে দেখেন। ভূ-ভাগকে যেন কেউ লাল কার্পেট বিছিয়ে দিয়েছিল। কোথাও ঘোড়া আহত হয়ে ছটফট করছিল আবার কোথাও রক্তস্নাত আহত সৈন্য কাতরাচ্ছিল। আহতদের উদ্ধার করার মানসিকতা এ মুহুর্তে কারো ছিল না।
এক সময় তিনি দেখতে পান যে, কুরাইশ পদাতিক সৈন্যরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তারা প্রচণ্ড আক্রমণ করে সাহাবায়ে কেরামের বৃত্ত ভেঙ্গে ফেলেছে। উতবা ইবনে আবী ওয়াক্কাস, আব্দুল্লাহ ইবনে শিহাব এবং ইবনে কুময়া এ তিন নরাধম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লক্ষ্য করে পাথর বর্ষণ শুরু করে। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, এক ভাই উতবা যাঁর প্রাণনাশে লিপ্ত অপর সহোদর ভাই সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু ঠিক তারই প্রাণ রক্ষার্থে নিবেদিত। এ সময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে অবস্থানরত সাহাবায়ে কেরামগণ না থাকার মতই ছিল। হয়তোবা তাঁরা লড়তে লড়তে বিক্ষিপ্ত হয়ে দূরে সরে গিয়েছিলেন।
উতবার নিক্ষিপ্ত একটি পাথরে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিচের দন্তপাটির দু’টি দাঁত শহীদ হয়। নিচের ঠোঁটও কেটে যায়। আব্দুল্লাহর পাথরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কপালে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ইবনে কুময়া একদম নিকট থেকে স্বজোরে পাথর মারায় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিরস্ত্রাণের সাথে ঝুলন্ত জিঞ্জিরের দু’টি কড়া ভেদে গণ্ডদেশে প্রবেশ করে। এতে চেহারা মুবারকের হাড়ও মারাত্মক আক্রান্ত হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্শার সাহায্যে শত্রুকে আক্রমণ করতে খুব চেষ্টা করেন। কিন্তু শত্রু তাঁর নাগালের মধ্যে আসছে না। অসংখ্য আঘাতে জর্জরিত শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে তিনি ভূতলে লুটিয়ে পড়েন। হযরত তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রু সৈন্যের সাথে যুদ্ধরত অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লুটিয়ে পড়তে দেখে দ্রুত তার কাছে আসেন। তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আহবানে ইতোমধ্যে আরেক সাথি চলে আসেন। পাথর নিক্ষেপে আহতকারী কুরাইশ পাপিষ্ট রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্যে তরবারি উত্তোলন করতে উদ্যত হলে হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু সহোদর ভাই উতবাকে আক্রমণ করেন। উতবা ভাইয়ের ক্রোধ ও রূদ্রমূর্তি দেখে পেছনে সরে যায়।
