রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বাঁচাতে সেদিন কয়েকজন সাহাবী নিজের জীবন দিয়ে দেন। সাহাবায়ে কেরামের দুর্বার প্রতিরোধ ক্ষমতা ও রণমূর্তি দর্শনে ইকরামার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর উপর এমন ভীতি নেমে আসে যে, তারা পিছু হঁটে যায়। দীর্ঘ যুদ্ধে কুরাইশরা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। এই সুযোগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের অবস্থা জানতে চেষ্টা করেন। চতুর্দিকে চোখ বুলিয়ে শুধু রক্ত আর রক্তই তিনি দেখতে পান। আহতদের উদ্ধার করে চিকিৎসার কোন পরিবেশই ছিল না। কোরাইশরা আরেকবার আক্রমণের সুযোগ খুঁজছিল।
“কুরাইশদের আরেক ব্যক্তির ইন্তেজার করছি আমি।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে বলেন।
“হে আল্লাহর রাসূল! কে সে?” জনৈক সাহাবী নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করেন– “সে কি আমাদেরকে সাহায্য করতে আসছে?”
“না।” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বলেন – “সে আমাকে কতল করতে আসবে। এতক্ষণ তার চলে আসার দরকার ছিল।”
“উবাই ইবনে খল্ফ” রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাপীষ্ঠের নাম বলে দেন।
উবাই ইবনে খল্ফ ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কট্টর বিরোধী। সে ছিল মদীনার অধিবাসী। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নবুওয়াতের কথা জানতে পেরে সে একদিন তাঁর কাছে আসে এবং নানা ভাবে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তিনি অতি ধৈর্য ও সহনশীলতার সাথে তা সহ্য করে বিনয়ের সাথে তাকে ইসলামের প্রতি আহবান জানান।
“তুমি কি আমাকে এতই দুর্বল মনে কর যে, তুমি বললেই তোমার ভিত্তিহীন মতবাদ মেনে নেব।” উবাই ইবনে খল্ফ ধৃষ্টতামূলক ভঙ্গিতে বলছিল– “আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে রাখ মুহাম্মাদ! একদিন আমার ঘোড়াটি দেখে নিও। আমি তাকে যত্ন করে লালন-পালন করছি। কুরাইশদের সাথে আবার কখনো তোমার লড়াই হলে সেদিন আমি এই ঘোড়ায় চড়ে লড়াই করে ফিরব। দেবতাদের নামে কসম করে বলছি, তোমাকে স্বহস্তে সেদিন কতল করব।”
“উবাই!” আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুচকি হেসে তাকে জবাবে বলেছিলেন– “জীবন-মৃত্যু সে সত্তার হাতে, যিনি আমাকে নবুওয়াত দান করেছেন এবং পথহারা লোকদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার দায়িত্ব আমার কাঁধে অর্পণ করেছেন। এমন কথা বলো না যা আমার আল্লাহ ব্যতীত কেউ পূরণ করতে পারে না। এমনও তো হতে পারে যে, তুমি আমাকে হত্যা করতে এসে নিজেই নিহত হবে।
উবাই ইবনে খল্ফ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই কথা অতি হালকাভাবে উড়িয়ে দেয় এবং বিদ্রূপের হাসি হেসে চলে যায়।
উবাই ইবনে খল্ফের সেই কথা যুদ্ধের এই শেষ পর্যায়ে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে পড়ে যায়। তিনি সাহাবায়ে কেরামের নিকট তার নাম নিতেই দূর থেকে এক অশ্বের পদধ্বনি শোনা যায়। সকলের দৃষ্টি আওয়াজের উৎসের দিকে নিবদ্ধ হয়।
“আমার প্রিয় সাথিগণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে লক্ষ্য করে বলেন– “আমার মন বলছে আগন্তক এ অশ্বারোহী সেই হবে। যদি সে উবাই হয় তাহলে তাকে বাধা দিবে না। তাকে আমার কাছাকাছি আসতে সুযোগ করে দিও।”
ঐতিহাসিক ওয়াকিদী এবং ইবনে হিশাম লেখেন আসলেও সে অশ্বারোহী সেই ইবনে খল্ফই ছিল। সে হুঙ্কার ছেড়ে বলছে– “প্রস্তুত হও মুহাম্মাদ। উবাই এসে গেছে।”
“দেখ আমি ঐ ঘোড়ায় চড়ে এসেছি, যা তোমাকে একদিন দেখিয়েছিলাম।”
“হে আল্লাহর রাসূল। তিন-চারজন সাহাবী সম্মুখে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলেন– “অনুমতি দিন, আপনার পর্যন্ত পৌঁছার আগেই তাকে শেষ করে দিই।”
“না।” জবাবে তিনি বলেন –“তাকে আসতে দাও। আমার কাছাকাছি আসুক… পথ খালি করে দাও।”
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাথায় জিঞ্জির বিশিষ্ট শিরস্ত্রাণ শোভা পাচ্ছিল। জিঞ্জিরগুলো মাথার নড়াচড়ায় তাঁর মুখমণ্ডলের সামনে এবং আগে পিছে ঝুলছিল। হাতে ছিল বর্শা, তরবারি ছিল কোষবদ্ধ। উবাইয়ের ঘোড়া চলে আসে একেবারে নিকটে।
“সামনে আয় উবাই।” গর্জে উঠে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন– “আমি ছাড়া কেউ তোর গায়ে হাত দেবে না।”
উবাই কাছে এসে ঘোড়া থামিয়ে বিদ্রূপাত্মক অট্টহাসি মারে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, তার বিশ্বাস ছিল যে, সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবশ্যই হত্যা করবে। তার তরবারিও কোষবদ্ধ ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকটে চলে আসেন। সে বড় শক্তিশালী ঘোড়ায় আসীন আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মাটিতে দণ্ডায়মান। সে তরবারি কোষমুক্ত করছিল কিন্তু কোষমুক্ত হওয়ার আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্মুখে অগ্রসর হয়ে তীব্র গতিতে তার প্রতি বর্শা নিক্ষেপ করেন। একদিকে ঝুঁকে সে আঘাত এড়াতে চাইলেও আঘাত তাকে এড়ায়নি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিক্ষিপ্ত বর্শার ফলা তার ডান স্কন্ধের গলার পাশের হাড্ডির নীচে গিয়ে বিদ্ধ হয়। এতেই সে ঘোড়ার উপর থেকে দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ে এবং তার পাঁজরের হাড্ডি ভেঙ্গে যায়।
