আবু তালহা রাযিয়াল্লাহু আনহু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ধরে উঠান। তিনি পুরোপুরি হুঁশেই ছিলেন। এ সময় অন্যান্য মুসলমানরা আক্রমণকারীদের সরিয়ে দেয়। ঐতিহাসিকগণ লিখেন, হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই কঠিন হয়ে পড়েছিল। তার একটাই কথা “যে ভাই আমার সম্মুখে আমার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর আক্রমণ করেছে, আমি তাকে নিজ হাতে হত্যা করে তার দেহ টুকরো টুকরো করে ক্ষান্ত হবো। তিনি একাই কুরাইশদের প্রতি এগিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। বড় কষ্টে তাঁকে শান্ত করা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দিলে তিনি কখনোই শান্ত হতেন না।
♣♣♣
সম্ভবত কুরাইশরা অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তারা মুখ ঘুরিয়ে নেয়। এ সময় সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি পূর্ণ মনোযোগ দিতে সুযোগ পান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জখম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সাথে থাকা নারীগণ তাকে পানি পান করায়, ক্ষত পরিস্কার করে। শিরস্ত্রাণের জিঞ্জিরের ভাঙ্গা কড়া তার গণ্ডদেশে তখনো বিদ্ধ ছিল। প্রখ্যাত আরব সার্জনের ছেলে হযরত আবু উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু এগিয়ে এসে কড়া দু’টি খুলতে চেষ্টা করেন। কিন্তু হাত দ্বারা বের করতে ব্যর্থ হন। এরপর তিনি দাঁত দ্বারা একটি কড়া টেনে বের করে আনেন। দ্বিতীয় কড়াও এভাবে দাঁত দ্বারা টেনে উঠান। কিন্তু কড়ার সাথে তার দু’টি দাঁতও ভেঙ্গে যায়। এ কারণে মানুষ তাঁকে “আল্-আছরাম” বলে ডাকতে থাকে। আছরাম অর্থ যার সামনের দু’টি দাঁত নেই। পরবর্তীতে এ নামটি ব্যাপক প্রসিদ্ধি লাভ করে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভূমিষ্ঠকালীন নার্স হযরত উম্মে আয়মন রাযিয়াল্লাহু আনহা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দেহের দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়েছিলেন কোন তীর যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শরীরে বিদ্ধ হতে না পারে। ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেকে সামলে নেন। হঠাৎ করে একটি তীর এসে উম্মে আয়মন রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর পৃষ্ঠদেশে বিদ্ধ হয়। এর সাথে সাথে দূর থেকে এক অট্টহাসির শব্দও ভেসে আসে। সবার দৃষ্টি সেদিকে ঘুরে গেলে দেখা যায় যে, হাব্বান ইবনে আরাকা নামক এক কুরাইশ নরাধম দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে। তার হাতে ছিল ধনুক। সদ্য বিদ্ধ তীরটি সেই ছুঁড়েছিল। সে হাসতে হাসতে ফিরে যেতে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে একটি তীর দিয়ে বলেন, এ নরাধম এখান থেকে তীর নিয়েই ফিরবে। সবার মাঝে তীরন্দাজিতে সেরা ব্যক্তি হযরত সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু ধনুকে তীর সংযোজন করে হাব্বানকে লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করেন। তীর হাব্বানের গলায় গিয়ে বিদ্ধ হয়। এতে সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথের সাহাবীগণ জোরে হেসে উঠে তার যথার্থ প্রতিশোধ গ্রহণের কথা মনে করিয়ে দেন। হাব্বান রাগে-ক্ষোভে চোখ বড় বড় করে কয়েক কদম সামনে এসে লুটিয়ে পড়ে।
খালিদ মদীনার দিকে যতই এগিয়ে যেতে থাকেন, উহুদের পর্বতগুলো ততই যেন উর্ধ্বে উঠতে থাকে। এ সময় পুরাতন কিছু সঙ্গী সাথির কথা তার মনে পড়ে যায়। আকীদা-বিশ্বাসের ভিন্নতার কারণে ভাইকে ভাইয়ের দুশমনে পরিণত করেছিল। সাথে সাথে এ বিষয়টিও তার চিন্তায় ধরা পড়ে যে, কতক লোক শুধু আনসারী হওয়ার কারণেই নিজ আকীদা-বিশ্বাসকে সত্য বলে মনে করে। সত্য-মিথ্যা ও আসল-নকলের ব্যবধান করা যে কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার গভীর জ্ঞান এবং বুদ্ধিমান ব্যক্তিত্ব।
জিজ্ঞাসার আলামত নিয়ে একটি বাক্য বারবার তার সামনে এসে দাড়ায়–“মদীনায় যাচ্ছি কেন?… নিজের আকীদা-বিশ্বাসে মদীনাবাসীকে দীক্ষিত করতে না-কি তাদের আকীদা-বিশ্বাসের কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে?” ঠিক এ মুহূর্তে আবু সুফিয়ানের একটি বেসুরা কণ্ঠ তার কানে ভেসে আসে, যা এর পূর্বে আবু সুফিয়ান তাকে বলেছিল– “এ সংবাদ কি সত্য যে, তুমি মদীনায় যাচ্ছ? তোমার ধমনীতে প্রবাহিত ওলীদের লাল রক্ত কি তাহলে সাদা হয়ে গেছে?”
মরুভূমি পাড়ি দেয়ার সময় অনেক দূর পর্যন্ত এ আওয়াজ তার পেছনে ধাওয়া করে তারপর এক সময় তিনি স্বাভাবিক হয়ে ঐসব বন্ধুদের চিন্তায় মগ্ন হয়ে যান, যাদের বিরুদ্ধে তিনি অস্ত্র ব্যবহার করেন এবং যাদের রক্ত তার চোখের সামনে দিয়ে গড়িয়ে গিয়েছিল। এদের মধ্যে হযরত মুসআব ইবনে উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন অন্যতম।
রণাঙ্গনকে পিছনে ফেলে কুরাইশরা মক্কায় ফিরে যায়। কিছুদূর অগ্রসর হতে না হতেই খালিদ ঘোড়া ছুটিয়ে আবু সুফিয়ানের পথ রোধ করে দাঁড়ান। অপূর্ণতার বেদনা এবং চাপা ক্ষোভ নিয়ে আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞাসা করেন, যুদ্ধকে মাঝপথে রেখে তোমরা কোথায় যাচ্ছো? মুসলমানদের সৈন্য-বল নিঃশেষ হয়ে গেছে। চুড়ান্ত পরাজয় তাদের সুনিশ্চিত। চলো, তাদের মূলোৎপাটন করেই আমরা ফিরব। আবু সুফিয়ানের ইচ্ছা ছিল, এ যুদ্ধে একটি চূড়ান্ত ফলাফলে উপনীত হওয়া। কিন্তু সৈন্যদের অবসন্নতা দেখে সে আর ঝুকি নিল না। খালিদের প্ররোচনায় কয়েকজন অশ্বারোহী ফিরতি পথ থেকে পুনরায় উহুদ অভিমুখে ঘুরে দাঁড়ায়। খালিদ ইতোপূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থান জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু আবু সুফিয়ান তখন তাকে সেখানে যেতে না দিয়ে কতক পদাতিক সৈন্য পাঠিয়ে দেয়। ইতোমধ্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আরো কিছু সাহাবী চলে আসেন।
