উভয় বাহিনীর মাঝে সামান্য দূরত্ব থাকতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাহিনীকে থামতে বলেন। মুসান্না বিন হারেছা তাঁর বাহিনীসহ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর পিছনে ছিলেন। ডান এবং বাম বাহিনীতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিয়োগ করা দুই সালার হযরত আছেম ইবনে আমর এবং হযরত আদী ইবনে হাতেম ছিলেন। তৎকালীন সময়ের যুদ্ধরীতি অনুযায়ী ইরান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক কারেন সামনে এগিয়ে আসে এবং মল্লযুদ্ধ লড়তে মুসলমানদের আহ্বান করে।
“মদীনার কোন উষ্ট্রারোহী আমার মোকাবিলা করার হিম্মত রাখে?” সে উভয় বাহিনীর মধ্যখানে এসে হুঙ্কার ছেড়ে বলে–“আমার সামনে আসার আগে একটু চিন্তা করে নিও যে, আমি ইরান সম্রাটের সেনাপতি।”
“তোর মোকাবিলায় আমি আসছি”–হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়া সামনে এনে হুঙ্কার দিয়ে বলেন–“কারেন… আয় এবং তোদের সেনাপতি হুরমুজের কতলের প্রতিশোধ নে। আমিই তার হত্যাকারী।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তখনও কারেন থেকে কিছুটা দূরে ছিলেন। ইতোমধ্যে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পশ্চাৎ হতে একটি ঘোড়া তীব্র গতিতে বেরিয়ে আসে এবং তার পাশ দিয়ে চলে যায়।
“পিছনে থাকুন জনাব খালিদ!” বাতাসে ভেসে আসে অশ্বারোহীর আওয়াজ “অগ্নিপূজক এই সালার আমার শিকার।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উড়ন্ত ঘোড়ার দিকে চেয়ে থাকেন। অশ্বারোহী ছিল মা’কাল বিন আয়শা নামক এক মুসলমান। বীরত্বে এবং তরবারি চালনায় তার বড়ই দক্ষতা এবং নাম-ডাক ছিল। এটা নিয়ম বহির্ভূত ছিল যে, কোন সিপাহী বা অশ্বারোহী নিজের সেনাপতির উপর মর্যাদা লাভ করতে চেষ্টা করবে। কিন্তু এ সময়টা এমনই নাজুক ছিল যে, ভৃত্য-মনিব এবং ধনী-গরীব সবাই এক হয়ে গিয়েছিল। প্রতিটি সিপাহী এবং অশ্বারোহী জিহাদের লক্ষ্য বুঝত। যে প্রেরণা সাধারণ সিপাহীদের মধ্যে ছিল তা একজন সালারের মাঝেও ছিল। মা’কাল ইবনে আয়শা এটা সহ্য করতে পারেনা যে, তার সালার এক অগ্নিপূজকের হাতে আহত কিংবা নিহত হবেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর প্রতিটি সৈন্যের জযবা অনুধাবন করতেন। তিনি থেমে যান। তিনি ঐ সৈন্যের জযবা আহত করতে চাননা।
মা’কালের ঘোড়ায় বিদ্যুৎগতি ছিল। ঘোড়া ইরান দলপতি কারেনকে ছেড়ে যায়। মা’কাল আগে গিয়ে ঘোড়া পিছন দিকে ফিরান এবং কারেনকে আহ্বান জানান। কারেন প্রথম থেকেই হাতে তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত ছিল। তার মাথায় জিঞ্জির বিশিষ্ট শিরস্ত্রাণ এবং শরীরের উপরাংশ বর্মাচ্ছাদিত ছিল। তার পায়ে মোটা চামড়ার আবরণ জড়ানো ছিল। তার চেহারায় প্রতিশোধের নিদর্শনের পরিবর্তে অহংকার ঠিকরে পড়ছিল। যেন তার এ নিশ্চিত বিশ্বাস ছিল যে, শরীরস্থ লোহা এবং চামড়ার এই পোশাক তাকে মুসলমানদের তলোয়ার থেকে অবশ্যই রক্ষা করবে।
কারেন ঘোড়ার বাগে হাল্কা ঝাঁকি দেয়। উভয়ের ঘোড়া পরস্পরকে ঘিরে এক দু’ বার চক্কর দিয়ে মুখোমুখী এসে দাঁড়ায়।
“আয় আগুন পূজারী।” মা’কাল অতি উচ্চ আওয়াজে বলে “আমি এক সাধারণ সিপাহী মাত্র, সালার নই।”
কারেনের চেহারায় অহমিকার চিহ্ন আরো গভীরভাবে ফুটে ওঠে। এক ঘোড়া আরেক ঘোড়ার দিকে এগিয়ে যায়। দু’জনেরই তলোয়ার উঁচু হয়। প্রথম আঘাত উভয়েরই তলোয়ারে তলোয়ারে হয় এবং দু’জনই পিছনে সরে যায়। দ্বিতীয়বারের মত তারা আবার মুখোমুখী হয়। বাতাসে তলোয়ারের আরেকবার সংঘর্ষ হয়। এরপরে ঘোড়া থেকে থেকে পিছনে এবং ঘুরে ঘুরে একে অপরের দিকে আসে। উভয় উভয়ের প্রতি আক্রমণ করতে থাকে। শেষবার কারেন তলোয়ার উঁচু করলে মা’কাল তার আক্রমণ ঠেকানোর পরিবর্তে তার বগল বর্ম থেকে খালি দেখে তলোয়ার বর্শার মত করে তার বগলে এত জোরে মারে যে, তলোয়ার কারেনের শরীরের অনেক ভেতরে চলে যায়। কারেনের এই হাতেই তলোয়ার থাকায় তলোয়ার তার হাত থেকে দূরে ছিটকে পড়ে। কারেন ঘোড়ার এক দিকে কাত হয়ে যায়। ঝুঁকে যাওয়ার দরুণ কারেনের গর্দান মা’কাল দেখে ফেলে। শিরস্ত্রাণের ঝুলন্ত জিঞ্জির তখন গলা থেকে সরে গিয়েছিল। মা’কাল মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করে না। দেহের সমস্ত শক্তি হাতে জমা করে তার গর্দান লক্ষ্যে এমন ভীম আঘাত করে যে, গর্ব আর অহমিকাপূর্ণ গর্দান কেটে আলাদা হয়ে যায়। মুসলিম শিবির থেকে ধন্যবাদ, প্রশংসা এবং আল্লাহু আকবার নারার গগন বিদারী বজ্রধ্বনি উঠতে থাকে।
কারেনের ধড়শূন্য কর্তিত মস্তক জমিনে পড়ে ছিল। তার জিঞ্জিরবিশিষ্ট শিরস্ত্রাণের নীচে রাষ্ট্রীয় মর্যাদাসূচক এক লক্ষ্য দেরহাম মূল্যের টুপি ছিল। এমন দামী টুপি হুরমুজের মাথায়ও ছিল। কারেনের মুণ্ডুশূন্য দেহ ঘোড়ার পিঠ থেকে হেলে পড়ে। কিন্তু তার এক পা ঘোড়ার পাদানিতে আটকে যায়। মা’কাল কারেনের ঘোড়ায় মৃদু আঘাত করে। ঘোড়া আঘাত খেয়ে দৌড়াতে শুরু করে এবং কারেনের লাশ জমিনে টেনে হিঁচড়ে ফিরতে থাকে। ঘোড়া ছিল নিয়ন্ত্রণহীন। ইরান সিপাহসালারের এমন নির্মম মৃত্যু ও পরিণতি দেখে ইরান শিবিরে মৃত্যুর নীরবতা ছেয়ে যায়।
অগ্নিপুজারীদের কাতার ডিঙ্গিয়ে দু’টি ঘোড়া সামনে আসে। একটিতে চেপে ছিল ইরান সালার কুববায আর অপর ঘোড়ায় বসা ছিল সেনাপতি আনুশযান।
