হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইতোমধ্যেই কাজিমা ছেড়ে গিয়েছিলেন। ঘোড়া, উট এবং সৈন্যদের আহারাদির কোন কমতি ছিল না। অত্র এলাকার মুসলমানরা সবকিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পথ কিছুটা ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছিল। তিনি উবলার কিছুদূরে এক ভগ্নপ্রাসাদের পার্শ্ব অতিক্রম করছিলেন। সামনের দিক হতে এক অশ্বারোহী দ্রুতবেগে ছুটে আসছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর দু’দেহরক্ষীকে বলেন, সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখ, এ অশ্বারোহী কে?
দেহরক্ষী ঘোড়া ছুটিয়ে দেয় এবং আগত অশ্বারোহীকে পথেই পেয়ে যায়। আগন্তুক ঘোড়া থামায় না। দেহরক্ষীদ্বয় নিজ নিজ ঘোড়া তার ঘোড়ার দু’ পাশে আনে এবং তার সাথে চলতে থাকে।
“মুসান্না বিন হারেছার পয়গাম নিয়ে এসেছে”–দূর থেকে এক মুহাফিজ বলে।
“পারস্যের এক তেজোদ্যম বাহিনী মা’কালের কিনারে ছাউনী ফেলে আছে মুসান্নার দূত হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকটে এসে থামতে থামতে বলে–
তবে আপনার এবং মুসান্নার সম্মিলিত বাহিনীর থেকে ৭/৮ গুণ বেশী হবে। ইরানীদের পলায়ন পর সৈন্যরাও তাদের সাথে আছে।
“মুসান্না এখন কোথায়?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান।
“ইরানীদের সামনে”–দূত বলে–“মুসান্না নির্দেশ দিয়েছেন, যেন কোন সৈন্য পিছু না হটে এবং আমরা ইরানীদের এটা বুঝাতে চেষ্টা করব যে, আমরা সম্মিলিত বাহিনীর অগ্রবর্তী দল মাত্র।…মুসান্না আপনাকে জলদি পৌঁছতে অনুরোধ করেছেন।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সৈন্যদের চলার গতি দ্রুততর করেন এবং ঐ দিকে চলতে থাকেন যে দিকে মুসান্না বিন হারেছা অবস্থান করছেন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সৈন্যরা মুসান্নার সৈন্যদের সাথে গিয়ে মিলিত হন। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সর্বাগ্রে শত্রুর গতিবিধি ও তাদের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেন। তিনি মুসান্নার সাথে এক উঁচু স্থানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শত্রুদের যুদ্ধ প্রস্তুতি সমাপ্তি পর্যায়ে ছিল।
“ইরানীরা আমাদেরকে সম্মুখ যুদ্ধে লড়াতে চায়”–হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসান্নাকে বলেন: “দেখছ ইবনে হারেছা?…তারা দরিয়া নিজেদের পশ্চাতে রেখেছে।”
“ইরানীরা কেবল সম্মুখ যুদ্ধই করতে পারে”–মুসান্না বলেন–“আমরা তাদের এক বন্দী থেকে জানতে পেরেছি যে, তাদের দুই সেনাপতি, যাদের বিরুদ্ধে আমরা লড়েছি জীবিত পিছু হটে আসে। একজনের নাম কুববায আর অপরজনের নাম আনুশাযান। তারা এ নয়া সালারকে বলে দেবে নিশ্চয় যে, আমাদের যুদ্ধের কৌশল ও ভেঙ্গ কেমন। এ জন্য তারা পশ্চাৎভাগকে আমাদের থেকে হেফাজত করতে পিছনে দরিয়া রেখেছে।… বেশী চিন্তা করবেননা জনাব খালিদ। আমি তাদের বিরুদ্ধে জমিন ফুঁড়েও লড়েছি।”
“আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুক ইবনে হারেছা।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–“আল্লাহ নিশ্চয় তোমার সাথে আছেন।… আমি এটাও ভেবে দেখলাম যে, দরিয়া পাড়ি দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”
“আল্লাহকে স্মরণ করুন জনাব খালিদ!” মুসান্না বলেন “আমি আশাবাদী যে, আমরা তাদের সৈন্য সারি এভাবে বিধ্বস্ত করে দিতে সক্ষম হব যে, তাদের পাশ কেটে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং পশ্চাৎ হতে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার সুযোগ আমাদের ঘটবে। আমার সৈন্যরা ঠাঁই দাঁড়িয়ে পড়ে না; ঘুরে ফিরে লড়াই করে। তাদেরকে আগে ঠেলে পাঠানোর প্রয়োজন হবে না। তাদেরকে পিছে ফিরিয়ে আনাই মূল সমস্যা হিসেবে দেখা দিতে পারে। কারণ, তারা ইরানীদের দেখলেই তেলে বেগুনে জ্বলে যায়। ইরানীদের হাতে তারা অনেক জর্জরিত হয়েছে। আপনি জানেন না, তারা কেমন দাসত্বের জিঞ্জিরে আবদ্ধ ছিল। ইরানীরা তাদেরকে মানুষ হিসেবে ন্যূনতম অধিকারটুকুও প্রদান করত না। মানবাধিকার থেকে তারা ছিল সম্পূর্ণ বঞ্চিত।”
“যরথুস্ত্র যে আগুনের পূজা করে আমরা সে আগুন নিভিয়ে দিব ইবনে হারেছা?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–“একসময় তারা নিজেরাই স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহপাক। … এস। আমি বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে চাই না। তারা যেভাবে চুপচাপ আছে তাতে প্রতীয়মান হয় যে, তারা যথেষ্ট সতর্ক এবং তাদের উপর আমাদের গভীর প্রভাব পড়েছে।… তুমি নিজ সৈন্যদের সাথে মধ্যম বাহিনীতে থাকবে।”
ঐতিহাসিকগণ লেখেন যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সম্ভাব্য কৌশল সম্পর্কে অনেক ভাবেন। কিন্তু ইরানীদের বর্তমান সেনাপতি কারেন বড়ই সেয়ান ছিল। সে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর লড়াইয়ের কৌশল সম্পর্কে জেনে গিয়েছিল। কারেন পরাজিত দু’ সালার কুববায এবং আনুশযানকে দুই পার্শ্ব বাহিনীর দায়িত্বে রেখে নিজের বাহিনীকে সামনে নিয়ে যায়। তার বাহিনীর ভাবই ছিল আলাদা। দেখলেই বুঝা যেত শাহী ফৌজ। তাদের পায়ের নীচের মাটি প্রকম্পিত হত।
এদিকে ইয়াসরিবের সাদা-মাটা বাহিনী ছিল। বাহ্যিকভাবে তাদের মাঝে কোন ভাব ছিলনা। ইরানীদের বিপরীতে মুসলমানদের হাতিয়ারও কম ছিল। পোশাকও সাদামাটা। ইরানীদের মোকাবিলায় তাদের সংখ্যা ছিল নিতান্তই কম। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় বাহিনীকে এগিয়ে যাবার নির্দেশ দিলে হাজারো পায়ের উত্থান পতন এবং ঘোড়ার ঘন্টাধ্বনির সাথে সাথে কালেমায়ে তৈয়্যেবার গুরুগম্ভীর আওয়াজ এক ভিন্ন প্রভাব সৃষ্টি করছিল। মুসলমানরা ক্লান্ত অবসন্ন, পক্ষান্তরে ইরানীরা ছিল সম্পূর্ণ তেজোদ্যম।
