কারেন বিন করয়ানুস তখনও মা’কাল দরিয়ার কিনারে ছাউনী ফেলে ছিল। সে এতদিন পর্যন্ত এখানে এ জন্য অবস্থান করতে থাকে যে, হুরমুজের বাহিনীর পলায়নপর কমান্ডার এবং সিপাহীরা তখনও আসতেছিল। কারেন তাদেরকে নিজ বাহিনীতে শামিল করছিল। হুরমুজের দুই সেনাপতি কুববায এবং আনুশযান কারেনের সাথেই ছিল। সে পরাজয়ের কঠিন প্রতিশোধ নিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিল। তাদের মন্তব্যে কারেন সামনে অগ্রসর হওয়ার ব্যাপারে সতর্ক হয়ে গিয়েছিল।
অবস্থানের দিনগুলোতে কারেনের গোয়েন্দারা তাকে মুসলমানদের গতিবিধি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে রীতিমত অবগত করতে থাকে। গোয়েন্দা তথ্য মোতাবেক সে নিশ্চিত হয়ে যায় যে, মুসলমানরা যুদ্ধজয় করেই ফিরে যাবে না, বরং সম্মুখে অগ্রসর হচ্ছে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জঙ্গে সালাসিল জয়ের পর কাজিমা, উবলা সহ ছোট ছোট এলাকাগুলোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি নিজ হাতে নিয়ে নেন। যখন তিনি সর্বপ্রথম ঐ এলাকায় পৌঁছান তখন অত্র এলাকার মুসলমানরা আনন্দে চিৎকার করে করে “হযরত খালিদ জিন্দাবাদ… ইসলাম জিন্দাবাদ … খেলাফত জিন্দাবাদ… এর স্লোগান দিতে থাকে। এলাকাটি সবুজ শ্যামল এবং বড়ই আকর্ষণীয় ছিল। মহিলারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তাঁর দেহরক্ষীদের পথে ফুল বিছিয়ে দিতে থাকে।
এই এলাকার মুসলমানরা এক লম্বা সময়ের পর ইরানীদের অত্যাচার এবং গোলামী থেকে মুক্তি পায়।
“জনাব খালিদ! আপনি আমাদের ইজ্জতের প্রতিশোধ নিবেন?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর লক্ষ্যে কয়েক নারীর কণ্ঠ ছুটে আসে।
“আমাদের যুবতী কন্যাদের রক্তের প্রতিশোধ… প্রতিশোধ … প্রতিশোধ… চাই”–এটা এক আওয়াজ এবং আবেদন ছিল। আর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এই আওয়াজে মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হতে থাকেন।
“আমরা ফিরে যেতে আসিনি”–হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের উদ্দেশে বলেন “আমরা প্রতিশোধ নিতেই এসেছি।”
মুসলমানদের একটি প্রতিনিধি দল হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে আগাম সতর্ক করে দেয় যে, তিনি যেন এ এলাকার অমুসলিমদের উপর ভরসা না রাখেন।
“এরা সবাই ইরানীদের সাহায্যকারী”– প্রতিনিধি দল হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানায়–“অগ্নিপূজকরা সর্বদা আমাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তি করেছে। আমাদের ছেলেরা ইরানীদের কোন চৌকিতে গেরিলা হামলা চালালে অগ্নিপূজকরা গোয়েন্দাগিরি করে তাদের ধরিয়ে দিত।”
“সকল ইহুদী এবং খ্রিস্টানদের গ্রেপ্তার কর”– হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ দেন “আর মুসলমানদের মধ্য হতে যারা ইসলামী বাহিনীতে যোগ দিতে ইচ্ছুক তারা চলে আসতে পারে।”
“তারা ইতিপূর্বেই মুসান্না বিন হারেছার সাথে চলে গেছে” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাব পান।
তৎক্ষণাৎ অগ্নিপূজারীসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের ধর পাকড় শুরু হয়ে যায়। তাদের মধ্য হতে কেবল তাদেরকেই যুদ্ধবন্দী করা হয় যাদের ব্যাপারে এই সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল যে, তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভূমিকা নিয়েছিল অথবা গুপ্তচরবৃত্তি করেছিল।
শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কিছু লোক কাজিমায় রেখে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সামনে এগিয়ে যান। এবার তার চলায় তেমন গতি ছিল না। কারণ, যে কোন স্থানে ইরানীদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। অত্র এলাকার কিছু লোককে গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ দিয়ে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে সম্মুখে এবং ডানে বামে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
হযরত মুসান্না দূর্বার গতিতে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। তিনি মা’কাল দরিয়া পার হতে চান কিন্তু দূর হতে ইরানীদের ছাউনী তার চোখে পড়ে। ছাউনীই বলে দেয়, তারা সংখ্যায় অনেক ছিল। হযরত মুসান্নার কাছে দেড় হাজার থেকে কিছু বেশী সৈন্য ছিল। মুষ্টিমেয় এ সৈন্য নিয়ে এক বিশাল বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া সম্ভব ছিল না।
“আমাদের এখান থেকেই পিছু হটা উচিত”–মুসান্নার এক সাথী বলে “ইরানী এ বাহিনী আমাদেরকে সহজেই তাদের ঘেরাওয়ে নিয়ে হত্যা করতে পারে।”
“একটু বুঝার চেষ্টা কর”– হযরত মুসান্না বলেন–“আমরা পিছু হটে গেলে ইরানীদের সাহস বেড়ে যাবে। আমাদের সেনাধ্যক্ষ বলেছিলেন, ইরানীদের অন্তর থেকে আমাদের ভীতি শেষ হওয়ার পূর্বেই আমরা তাদের উপর আক্রমণ করে যাব। যে ভীতি তাদের মাঝে ছড়িয়ে গেছে তা বিদ্যমান রাখতে হবে আমাদের। আমরা অগ্নিপূজক ফৌজকে এটা বুঝাতে চেষ্টা করব যে, এটা আমাদের অগ্রবর্তী বাহিনী মাত্র। অবশ্য আমরা লড়ার জন্য প্রস্তুত থাকব। যদি তাদের সাথে যুদ্ধ বেঁধেই যায় তবে ঐ প্রক্রিয়ায় লড়ব, যা এক যুগ ধরে লড়ে আসছিলাম। আর তা হলো, সামনাসামনি আক্রমন না করে হঠাৎ আক্রমন করে আবার উধাও হয়ে যাওয়া … তোমরা এভাবে লড়াই করতে পারবেতো?” এর পর মুসান্না এক অশ্বারোহীকে ডাক দেন এবং বলেন “ঘোড়া ছুটিয়ে দাও। সেনাপতি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কাজিমা বা উবলার কোন একস্থানে আছেন। তাঁকে বলবে, মা’কালের কূলে এক ইরানী বাহিনী ছাউনী ফেলে আছে। তাকে জানাবে যে, আমি ঐ বাহিনীকে আগে যেতে দিব না। সেখানে আপনার পৌঁছানো একান্ত জরুরী।”
