“আমার কেল্লা থেকে কিছু পেলেন কি?” যুবতী জিজ্ঞাসা করে। “না”, মুআন্না জবাবে বলে–“সন্দেহ নিরসন করা আমার জন্য জরুরী ছিল। আর এখন একথা জিজ্ঞাসা করা উচিত মনে করছি যে, আমার কোন সৈন্য এখানকার কোন পুরুষ কিংবা নারী অথবা আমি আপনার কোন কষ্ট দেইনি তো?”
“না”, যুবতী নেতিবাচক জবাব দেয়। অতঃপর একটু চিন্তা করে বলে “কিন্তু আপনি চলে গেলে আমার খুব কষ্ট হবে।”
“আপনি ইরানীদের পক্ষ হতে ভয়ের আশংকা করছেন?” মুআন্না জানতে চায় “নাকি আপনার অন্তর মুসলমানদের ভয়ে ভীত?”
“এ দু‘টোর কোনটিই নয়” যুবতী জবাবে বলে “একাকীত্বের ভয় আমার। আপনি চলে গেলে আমি বড় একা হয়ে যাব। অথচ এ ব্যাধিটা আপনার আসার পূর্বে ছিল না।”
মুআন্না যুবতীর প্রতি প্রশ্নঝরা দৃষ্টিতে তাকায়। তার চোখ তাকে অনেক কিছু বলে দেয়। তিনি চোখ ফিরিয়ে নেন।
“আপনি দায়িত্ব পালনে এতই বিভোর যে, আপনার এ খেয়াল পর্যন্ত নেই যে, আপনি একজন যুবকও বটে”–যুবতী বলে–“বিজয়ী সর্বপ্রথম আমার মত নারীকে খেলনা বানায়। আমি আপনার মত পুরুষ জীবনে দেখিনি। এখন দেখে মন চাচ্ছে যে, সারা জীবন ধরে শুধু দেখতেই থাকি… আমাকে আপনার পছন্দ হয় না?”
মুআন্না গভীর দৃষ্টিতে তাকে দেখেন। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার, পুনরায় পা থেকে মাথা পর্যন্ত। এ সময় তার ভেতর থেকে একটি আওয়াজ আসে খোদার কসম! আমি কেল্লা বিজয়ীদেরকে এক নারীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং চাহনীতে পরাভূত হতে দেখেছি।”
“আপনি হুশে আছেন তো?”–যুবতী বলে–“নাকি বেহুশ হয়ে গেলেন। কোন কথা বলছেন না।”
“সম্ভবত প্রয়োজনের তুলনায় অধিক হুশে আছি’ মুআন্না বলেন “তোমাকে আমার ভাল লাগে কি লাগে না সেটা পরের কথা। এখন তোমার কেল্লা আমার খুব প্রিয়।”
“আমার এই উপহার কবুল করবেন না?” যুবতী জিজ্ঞাসা করে– “শক্তি খরচ করে কেল্লা দখল করে নেয়ার চেয়ে ভালবাসার বিনিময়ে এই কেল্লা আমার থেকে নিলে ভাল হয় না?” “ভালবাসা!” মুআন্না অস্ফুট কণ্ঠে বলেন, মুহূর্তে গা ঝাড়া দেয়ার মত মাথা উঁচু করে বলেন “ভালবাসার সময় নেই। আমি তোমাকে বিবাহ করে নিতে পারি। তুমি রাজি হলে প্রথমে কেল্লার সকল বাসিন্দাসহ ইসলাম গ্রহণ কর।”
“আমি কবুল করলাম”–যুবতি বলে–“আমি সে ধর্মের জন্য জীবন দিতেও রাজি, আপনি যে ধর্মের অনুসারী।”
আল্লামা তবারী এবং ইবনে রুসতা দুই ঐতিহাসিক কিছুটা বিস্তারিতভাবে এই ভদ্র মহিলার কাহিনী বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কেউ তার নাম উল্লেখ করেননি।
॥ নয় ॥
পারস্য সম্রাট উরদূশের রাগে ফেটে পড়ছিল। হুরমুজের প্রতি ছিল তার যত সব রাগ। হুরমুজ সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছিল। কিন্তু সাহায্য প্রেরণের পর অনেকদিন গত হলেও রণাঙ্গনের অবস্থা সম্বন্ধে তাকে কিছুই জানানো হয় না। সে দরবারে বসলে মনে হত মানুষ নয়; বরং রাগ কুণ্ড পাকিয়ে বসে আছে। মহলের কোথাও থাকলে তার অবস্থা এই দাঁড়াত যে, বসতে বসতে হঠাৎ উঠে দাঁড়াত এবং দ্রুত সারা মহল পায়চারি করে ফিরত। পথে কেউ সামনে পড়লে বিনা কারণে তার উপর রাগ ঝাড়ত। একদিন সে উদাস মনে শাহী বাগিচায় পায়চারি করছিল। হঠাৎ তাকে জানানো হয় যে, কারেনের দূত এসেছে। সে দ্রুত এসেছে। সে দূতকে ডেকে পাঠাবার পরিবর্তে নিজেই এক প্রকার তার দিকে ছুটে যায়।
“কারেন ঐ মরুশিয়ালদের পিষে ফেলেছে?” উরদূশের জানতে চায়।
“মহামান্য সম্রাট।”– দূত বলে–“জীবন ভিক্ষা চাই; জনাবের এই গোলাম কোন শুভ সংবাদ বয়ে আনেনি।”
“তবে কি কারেনও সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছে?” উরদূশের কণ্ঠে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ে।
“না, মহামান্য সম্রাট” দূত বলে–“সেনাপতি হুরমুজ মুসলমানদের হাতে নিহত হয়েছে।”
“নিহত হয়েছে?” উরদূশের রাজ্যের বিস্ময় চোখে-মুখে টেনে জিজ্ঞাসা করে “কি হুরমুজও মারা যেতে পারে?… না, না, এটা ভুল সংবাদ এটা নির্জ্জলা মিথ্যা”। এরপর সে গর্জে উঠে দূতকে জিজ্ঞাসা করে “তোমাকে এ সংবাদ কে দিয়েছে?”
“সেনাপতি কারেন” দূত বলে–“আমাদের দুই কমান্ডার কুববায এবং আনুশযান পিছপা হয়ে ফিরে আসছিল। প্রাণে বেঁচে যাওয়া সৈন্যরাও একজন, দুইজন করে তাদের পিছু পিছু আসছিল। মা’কাল দরিয়ার কূলে তাদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। তারাই জানায় যে, হুরমুজ মুসলমানদেরকে মল্লযুদ্ধ লড়ার আহবান জানালে তাদের সেনাপতি খালিদ বিন ওলীদ আমাদের সেনাপতির মোকাবিলায় আসে। সেনাপতি হুরমুজ তার দেহরক্ষীদের আশে পাশেই লুকিয়ে রেখেছিলেন। তাদের দায়িত্ব ছিল মুসলমানদের সেনাপতিকে ঘেরাও করে হত্যা করা। তারা তাকে কৌশলে বৃত্তাকারে ঘিরেও নিয়েছিল। কিন্তু আচমকা এক অশ্বারোহীর উদয় হয়। তার একহাতে বর্শা আর অপর হাতে তরবারী ছিল। চোখের পলকে ঐ অশ্বারোহী হুরমুজের দেহরক্ষীদের ৬/৭ জনকে খতম করে দেয়। ঠিক এ সময় মুসলমানদের সেনাপতি হুরমুজকে কাবু করে জমিনে আছড়ে ফেলে এবং খঞ্জর দ্বারা তাকে হত্যা করে।”
উরদূশেরের মাথা নীচু হয়ে যায়। সে ধীর পদক্ষেপে মহল লক্ষ্যে এগিয়ে চলে। সে মহলে পৌঁছে এমনভাবে দেয়াল আকড়ে ধরে, যেন কোন কিছুর সাথে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে পড়া থেকে বাঁচতে দেয়ালের আশ্রয় নিয়েছে। সে নিজ কক্ষে দেয়ালে ভর দিয়ে দিয়ে পৌঁছে। একটু পর মহলে রীতিমত হুলস্থুল পড়ে যায়। শাহী ডাক্তার দৌড়ে আসে। অজ্ঞাত রোগে উরদূশের হঠাৎ আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এটা ছিল আঘাতের ফল। পারস্য সম্রাট পরাজয়ের সাথে পরিচিত ছিল না। প্রথমবারের মত তারা মার খায় রোমকদের হাতে এবং রাজ্যের কিছু অংশ তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। আর এবার তারা মার খায় এমন লোকদের হাতে উরদূশের যাদেরকে মানুষ বলেই মনে করতনা। উরদূশের জন্য এই আঘাত সাধারণ ছিল না।
