“তোমরা কারা এবং এখানে কোন্ উদ্দেশ্যেই বা এসেছ?” যুবতী বড় জোর গলায় মুআন্নার কাছে জানতে চায়”।
“আমরা মুসলমান!” মুআন্না তার চেয়ে উচ্চ আওয়াজে জবাব দেন রণাঙ্গন থেকে পলায়নপর ইরানী সৈন্যদের পশ্চাদ্ধাবনে আমরা এসেছি।
তুমি এ কেল্লায় তাদের আশ্রয় দিয়ে থাকলে তাদেরকে আমাদের হাতে তুলে দাও। আমরা নিয়েই চলে যাব।”
“এটা আমার কেল্লা”– যুবতী বলে– “পলায়নপর সৈন্যদের আশ্রয় স্থল নয়। এখানে কোন ইরান সৈন্য নেই।”
“ভদ্র মহিলা” মুআন্না বলে–“আপনার সম্মান রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। আমরা মুসলমান। কোন মহিলার মর্যাদা ক্ষুন্ন করা আমাদের নিকটে হারাম। চাই তিনি কেল্লার মালিকও হন না কেন। যদি আপনি ইরানের সমর শক্তির ভয়ে সৈন্যদেরকে আমাদের হাতে তুলে দিতে ইতস্তত করেন তাহলে মনে রাখবেন, আমরা ইরান বাহিনীর শক্তি চূর্ণ বিচূর্ণ করে শোচনীয়ভাবে তাদের পরাস্ত করেছি। আপনাদের সাথে কঠোর ব্যবহার করতে চাই না। আমরা ঐ ফৌজের অগ্রবর্তী বাহিনী, যারা পিছে আসছে।”
“আমি মুসলমানদের কি ক্ষতি করেছি?” যুবতী বলে–“আমার কেল্লা আপনাদের যাওয়ার পথে অন্তরায় হতে পারে না।”
“আপনার কেল্লা নিরাপদ থাকবে”–মুআন্না বলে– “কিন্তু শর্ত হল, কেল্লার দ্বার খুলে দিন। আমরা ভেতরে ঢুকে তল্লাশি চালাব মাত্র। আপনাদের কোন ব্যক্তি কিংবা বস্তুতে আমার সৈন্যরা হাত লাগাবে না, আমরা নিশ্চিত হয়েই চলে যাব। এই শর্ত পূরণ না করলে আপনাদের লাশ এই কেল্লার আশে পাশে পচে গলে পড়ে থাকবে।”
“কেল্লার দরজা খুলে দাও”– যুবতীর শাসকসুলভ নির্দেশ শোনা গেল। এই আওয়াজের সাথে সাথে কেল্লার ফটক খুলে যায়। মুআন্না তার সৈন্যদের ইশারা দিলে তিনশ থেকে চারশ সৈন্য ঘোড়া ছুটিয়ে দেয়।
মুআন্না তাদেরকে শুধু এতটুকু বলে যে, কেবল তল্লাশি হবে। কোন ব্যক্তি কিংবা বস্তু স্পর্শ করা যাবে না। মুআন্নার ঘোড়া কেল্লার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ে। অধীনস্থ সকল অশ্বারোহীও তার পিছুপিছু আসতে থাকে। মুআন্না এক স্থানে থেমে কেল্লার চতুর্দিকে দৃষ্টি ঘুরায়। সর্বত্র তীরন্দাজ বাহিনী পজিশন নিয়ে ছিল। নীচে কোথাও কোন সৈন্য তার চোখে পড়েনা। মুআন্নার সৈন্যরা কেল্লার অভ্যন্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
“আপনি সত্যই বলেছিলেন”–যুবতী মুআন্নাকে বলে–“আমি ইরানীদের ভয় করি। এ কেল্লায় যে শক্তিশালী সৈন্যই আসবে আমি তাদের দয়ার ভিখারী হব।… মুসলমানদের এই প্রথমবারের মত আমি দেখছি।”
“আপনি তাদের কথা জীবনভর মনে রাখবেন”–মুআন্না বলে– “খোদার কসম! আপনি সারা জীবন তাদের অপেক্ষায় পার করবেন।… মুসলমানদের প্রতি নির্দেশ আছে, নিষ্প্রাণ কেল্লা নয়, কেল্লাবাসীদের অন্তর জয় কর। কিন্তু কেল্লাবাসীদের অন্তর যদি কেল্লার প্রাচীরের মত কঠিন হয় তখন আবার আমাদের প্রতি ভিন্ন আদেশ আছে। আমরা যখন এই নির্দেশ পালনে লিপ্ত হই তখন পারস্য শক্তিও আমাদের সামনে টিকতে পারে না। আপনি তাদের পালিয়ে যেতে দেখেন নি? তারা এখান দিয়ে যায় নি?”
“অবশ্যই গেছে”–কেল্লাদার যুবতী বলে–“ক্ষণিকের জন্য এখানে যাত্রাবিরতিও করেছিল। তারাই বলেছিল যে, আমরা মুসলমানদের তাড়া খেয়ে পালিয়ে এসেছি। আমি তখন এই ভেবে অবাক হয়ে ছিলাম যে, সে আবার কোন শক্তি, যা পারস্য বাহিনীকে পর্যন্ত পর্যুদস্ত করে ছাড়ে। আপনি যখন জানালেন যে, আপনারাই তারা, যারা ইরানীদের পরাজিত করেছে। তখন আমার হিম্মত শেষ হয়ে যায়। আমি ভীত হয়ে কেল্লার দরজা খুলে দিতে বলি। আমি আপনার সৈন্যদের থেকে ভাল আচরণের প্রত্যাশা রাখতে পারছি না। আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না যে, আপনারা যা যা বলছেন তা সত্য বলছেন কিনা।!”
কেল্লাদার মহিলা কথা বলতে বলতে মুআন্নাকে নিজের মহলে নিয়ে যায়। সেটা ছিল রীতিমত আলীশান শিশমহল। তার ইঙ্গিতে দুই ভৃত্য শরাব এবং ভুনা গোশত মুআন্নার সামনে পরিবেশন করে। মুআন্না এই খাদ্য পানীয় ঠেলে দূরে সরিয়ে দেন।
“আমরা শরাব পান করিনা”–মুআন্না বলে–“আর এ খাদ্য আমি এজন্য খাব না যে, আপনি আমাকে এক শক্তিশালী বাহিনীর লোক মনে করে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তা পেশ করছেন। ফলে এটাকেও আমি অনুচিত মনে করছি।”
“তবে কি আমাকেও হারাম মনে করছেন?” এই অনিন্দ্য সুন্দরী এবং যুবতী নারী এমন আকর্ষণীয় মুচকি হাসি দেয়, যা থেকে তাকে ব্যবহারের আহ্বান ঝরে পড়ছিল।
“হ্যাঁ”, মুআন্না বলে–“নারীকে আমরা মদের মতই হারাম মনে করি। যতক্ষণ তারা স্বেচ্ছায় আমাদের সাথে প্রণয় সূত্রে আবদ্ধ না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা তাকে হারামই মনে করি।”
ইতোমধ্যে মুআন্নাকে জানানো হয় যে, তার সৈন্যরা পুরো কেল্লা তল্লাশি চালিয়ে ফিরে এসেছে। মুআন্না তাদের ফিরে আসার সংবাদ পেয়েই দ্রুত উঠে পড়েন এবং দ্রুতগতিতেই কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান।
সৈন্যদের কমান্ডার মুআন্নাকে তল্লাশি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত করান। কিভাবে তল্লাশি করে, কোথাও সন্দেহজনক কিছু দেখেছে কিনা সব তাকে জানায়। সে মুআন্নাকে জানায় যে, কোথাও কোন ইরানী সৈন্যর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কেল্লাদার নারীর গোত্র তীর বর্শায় সজ্জিত ছিল। কিন্তু মুআন্নার সৈন্যদের সাথে তাদের লড়াই করার হিম্মত ছিল না। কেল্লার মালিক তাদের যুদ্ধ করার অনুমতিও দিয়েছিল না। এ কেল্লাটি কব্জা করা কিংবা নিজেদের আনুগত্যে নিয়ে নেয়া খুবই প্রয়োজন ছিল। কেননা, ইরানীদের যে কোন সময় এই কেল্লাটি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সম্ভাবনা ছিল। মুআন্না এদিক ওদিক-তাকায়। কেল্লাদার নারী তার নজরে পড়ে না। মুআন্না অন্দরে প্রবেশ করে।
