॥ আট ॥
কিছুদূর যাওয়ার পর একটি কেল্লা সামনে এসে পড়ায় হযরত মুসান্নাকে তাঁর বাহিনী একত্রিত করতে হয়। ‘নারীদূর্গ’ নামে কেল্লাটি প্রসিদ্ধ ছিল। কেল্লাটি জনৈক মহিলার হওয়ায় তার নাম হয়ে যায় নারীদূর্গ। ইরানীরা এই কেল্লায় আশ্রয় নিতে পারে। এই ধারণাকে সামনে রেখে হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু কেল্লাটি অবরোধ করেন। কেল্লা হতে প্রতিরোধের হাবভাব দেখা যায়। দু’দিন অবরোধের পর হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মনে পড়ে যে, তিনি যে উদ্দেশ্যে এসেছেন তা চাপা পড়ে গেছে। হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ভাই মুআন্না তার সাথেই ছিল।
“মুআন্না!”–মুসান্না বিন হারেছা তাকে বলে “তুমি কি বিষয়টি উপলব্ধি করেছ যে, আমি ইরানীদের পশ্চাদ্ধাবনে এসেছিলাম কিন্তু এই কেল্লাটি আমার পথ আগলে ধরেছে?”
“ভাই মুসান্না!” মুআন্না বলে–“আমি সবকিছুই দেখছি। আর আমি এটাও অনুভব করছি যে, আমার উপর আপনি আস্থা রাখতে পারছেন না। যদি আস্থা রাখতেন তাহলে বলতেন, কেল্লাটি তুমি অবরোধ করে রাখ, আমি ইরানীদের পিছু ধাওয়া করছি।”
“হ্যাঁ মুআন্না!” হযরত মুসান্না বলেন–“তোমার উপর সত্যই আমার আস্থা নেই। এই কেল্লাটি এক যুবতি নারীর। আর তুমিও একজন যুবক পুরুষ। খোদার কসম! আমি এক কেল্লা দখলদারীদেরকে এক নারীর মায়াবী দৃষ্টিতে পরাভূত হতে দেখেছি।
‘প্রিয় ভাই!” মুআন্না বলে–“আমার উপর আস্থা রাখুন এবং সামনে অগ্রসর হোন। আমাকে সামান্য কিছু সৈন্য দিয়ে যান এরপর দেখবেন, কে কার কাছে পরাভূত হয়।… কেল্লা না আমি… আপনি এখানে আটকে থাকলে ইরানীরা অনেক দূর এগিয়ে যাবে।”
“আমার মাথা সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযোগী থাকলে আমি বলব, আমি ভিন্ন কিছু চিন্তায় এদিকে এসেছি”– মুসান্না বিন হারেছা বলে–“আমি আল্লাহর অফুরন্ত শুকরিয়া আদায় করছি; তিনি ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই এবং হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ বড় দয়া করে হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত সেনাপতি আমাদের দান করেছেন। মদীনার খেলাফত হতে তাঁর প্রতি যে নির্দেশ ছিল তা তিনি অক্ষরে অক্ষরে পালন করে দেখিয়েছেন। কিন্তু তিনি এতেই আশ্বস্ত নন, তৃপ্ত নন। তিনি পারস্য হতে সম্রাটগিরি সমূলে উৎখাত করতে চান। তিনি মাদায়েনের এক একটি ইট খুলে নিতে বদ্ধপরিকর।”
“ইচ্ছা ভিন্ন জিনিস প্রিয় ভাই!” মুআন্না বলে–“ইচ্ছা করা সহজ কিন্তু তা পূরণ করা বড়ই কঠিন। আপনি দেখেছেন নিশ্চিয় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তীরগতিতে সামনে অগ্রসর হচ্ছেন। কিন্তু তীর অনেক সময় লক্ষ্যভ্রষ্টও হয়। … প্রিয় ভাই! সামান্য বাধা ঐ তীরকে ব্যর্থ করে দিতে পারে।”
“তবে কি তুমি বলতে চাও, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য ঐ স্থানেই থেকে যাওয়া উচিত যেখানে তিনি ইরানীদের পরাজিত করেছেন?” মুসান্না বলে–“খোদার কসম! তুমি একটি কথা ভুলে গেছ। আর তা হল, ইরান সম্রাটের স্বীয় রাজত্বের চিন্তা আছে। আর আমাদের আছে আল্লাহর অসন্তুষ্টির ভয়। উরদূশের নিজ সিংহাসন রক্ষা করতে চায় কিন্তু আমরা দোজাহানে সর্দার হযরত রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মান-মর্যাদা রক্ষার খাতিরে লড়ছি… বোঝার চেষ্টা কর স্নেহের ভাই।
আমাদের লড়াই সাধারণ রাজা বাদশাহদের লড়াই নয়; এটা আকীদা-বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনা রক্ষার লড়াই। আমাদের প্রতি আল্লাহপাকের এ নির্দেশ রয়েছে যে, যেন আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আহ্বান দুনিয়ার কোণায় কোণায় পৌঁছে দিই। আমাদের শয্যা হবে এই বালু এবং বালিশ হবে পাথর। আমরা সিংহাসন চাইনা।”
“ধন্যবাদ, প্রিয় ভাই।” মুআন্না বলে–“আমি বুঝে গেছি।” না’, মুসান্না বলেন– “তুমি পুরো ব্যাপারটা এখনো বোঝনি। তুমি ভুলে গেছ, আমাদেরকে ঐ সকল মুসলমানদের রক্তের প্রতিটি ফোটার প্রতিশোধ নিতে হবে, যারা ইরানীদের তোপের মুখে ছিল এবং ইরানীরা যাদের উপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালিয়েছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পারস্যের এই নির্মম আচরণ কখনো ক্ষমা করবেন না।… আমি তোমাকে বলছিলাম, আমি মূলত পলায়নপর ইরানীদের পিছু নিতে আসিনি। আমি ইরানীদের ঐ ফৌজের অন্বেষণে এসেছি, যারা হুরমুজ বাহিনীর পরাজিত সৈন্যদের সাহায্যার্থে এসেছে। আমি তাদেরকে পথিমধ্যেই প্রতিরোধ করব।”
“তাহলে আর কথা বাড়াবেন না”–মুআন্না বলে “আমার অধীনে কিছু সৈন্য রেখে বাকী সৈন্য নিয়ে আপনি চলে যান।… তবে মনে রাখবেন, সাহায্যকারী দল যদি সত্যই আসে, তবে তাদের সংখ্যা ও শক্তি পূর্বের তুলনায় অধিক হবে। সামনা-সামনি সংঘর্ষে লিপ্ত হবেন না। প্রাণ প্রিয় ভাই। আল্লাহ আপনার সহায় হোন।” কোন ঐতিহাসিকের কলম ঐ সঠিক সংখ্যা লেখে নাই যা হযরত মুসান্না তাঁর ভাই মুআন্নাকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে তাদের বক্তব্য হতে এতটুকু অনুমান করা যায়, ঐ সৈন্যসংখ্যা ৩০০-এর কম এবং ৪০০-এর বেশী ছিল না। মুআন্না এই সৈন্য দ্বারাই কেল্লা অবরোধ করে রাখেন এবং কেল্লার ফটকের এত কাছে চলে যান, যেখান থেকে অতি সহজে তিনি তীরের শিকার হতে পারতেন। ফটকের উপরে পাহারা কক্ষ ছিল। সেখান থেকে এক অনিন্দ্য সুন্দর রমনীর অভ্যুদয় হয়।
