“সেনাপতি হুরমুজ নিহত” ফিরতিদের মধ্য হতে এক সৈন্য বলে–“দু’পার্শ্ব বাহিনীর কমান্ডার কুববায এবং আনুশযানও রণাঙ্গন ছেড়ে এসেছে। তারা হয়তবা পিছনেই আসছে।”
কারেন হুরমুজের মৃত্যুর সংবাদ শুনে থ মেরে যায়। এটুকু জিজ্ঞাসা করার হিম্মতও তার হয় না যে, সে কিভাবে মারা গেল? কারেনের মাথা হেট হয়ে গিয়েছিল। একটু পর যখন সে মাথা উঠায় তখন জনস্রোতের মত ইরানীদের ফিরে আসতে দেখে। নতুন বাহিনী দেখে পলায়নপর সৈন্যরা সেখানে জমা হতে থাকে। এ সময়ে হুরমুজের দু’ কমান্ডার কুববায এবং আনুশযানও এসে পৌঁছে। তাদেরকে দূর হতে আসতে দেখেই কারেন অশ্বের বাগে ঝাঁকি দেয়। ঘোড়া চলতে শুরু করে। পরাজিত দু’ কমান্ডারের কাছে গিয়ে সে ঘোড়া থামায়।
“হুরমুজের নিহত হওয়ার সংবাদ আমি ইতোমধ্যেই পেয়েছি”– কারেন বলে–
“কিন্তু তাই বলে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে, তোমরা দু’জন রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে এসেছ। বর্বর এবং বুদ্দু ঐ আরবদের কাছে তোমরা পরাজিত হয়েছ? আমি এর বেশি বলতে চাইনে যে, তোমরা কাপুরুষ এবং ফৌজে যে পদে তোমরা আছ সে পদের যোগ্য তোমরা নও।… তোমরা মুসলমানদের ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ণ করতে চাও না?”
“কেন চাইব না?” কুববায বলে– “কৌশল হিসেবে আমরা পিছু হটে আসিনি, হুরমুজের আস্ফালনই আমাদের এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। আমরা স্বীকার করি যে, ইসলামী সৈন্যদের মাঝে বহুত নামী দামী ও বীর বাহাদুর সেনাপতি আছে। কিন্তু তাই বলে তারা আমাদের এভাবে পশ্চাদপসারণের যোগ্য ছিল না।”
“কারেন!” আনুশযান বলে–“আমাদের ফৌজি নেতৃত্বে এটাই বড় দুর্বলতা, যা আপনার থেকেও প্রকাশ পেয়েছে। আপনি আরবের মুসলমানদেরকে গোয়ার এবং মূর্খ বলেছেন। হুরমুজও এমন বলত। কিন্তু আমরা রণাঙ্গনে তাদেরকে এর বিপরীত পেয়েছি।”
“তোমরা তাদের মাঝে এমন কোন গুণ দেখেছ, যা আমাদের মাঝে নেই”–কারেন জিজ্ঞাসা করে।
“তার চেয়ে জিজ্ঞাসা করুন, আমাদের মাঝে কোন ত্রুটি রয়েছে, যা তাদের মধ্যে নেই”–আনুশযান বলে–“আমরা দশজন, বারজন সৈন্যকে এক শিকলে বাঁধি যেন তারা দৃঢ়তার সাথে যুদ্ধ করে। ভাগতে না পারে। এভাবে শিকলবদ্ধ হওয়ায় সামনাসামনি যুদ্ধ করতে হয়। মুসলমানরা আমাদেরকে শিকল বদ্ধ হতে দেখে ডানে-বামে আক্রমণের কৌশল অবলম্বন করে। আমাদের সৈন্যরা এদিক ওদিক ঘুরে লড়াই করতে অপারগ ছিল। বস্তুত, এ কারণেই সংখ্যায় কয়েকগুণ বেশী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সৈন্যরা পরাজয় বরণ করে।”
“আমাদের কথা বলার সময় নেই”–কুববায বলে–“মুসলমানরা আমাদের পশ্চাদ্ধাবনে আসছে।”
সত্যই তাদের পশ্চাদ্ধাবনে হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু দুই হাজার সৈন্য নিয়ে এসেছিলেন। হযরত মুসান্না বিন হারেছা ইসলামের ঐ প্রেমিকের নাম, যিনি ইরানীদের বিরুদ্ধে গেরিলা হামলা চালিয়ে ইরানীদের ঘুম হারাম করে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাঁরই অনুরোধক্রমে আমীরুল মু’মিনীন হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে ইরানীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে প্রেরণা দিয়েছিলেন। ইরানীদের পশ্চাদ্ধাবনে যাওয়া অসাধারণ বীরত্বমূলক পদক্ষেপ ছিল। কারণ এখানে পশ্চাদ্ধাবনের অর্থ ছিল, নিজেদের স্থান থেকে ক্রমান্বয়ে শত্রুর পেটের মধ্যে ঢুকে যাওয়া। কেননা মুসলমানরা যতই এগিয়ে যাবে চতুর্দিক হতে ঘেরার মধ্যে পড়ার ততই সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু এটা ছিল সেনাপতি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নির্দেশ এবং ইরানীদের বিরুদ্ধে হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর একরাশ ঘৃণার ফসল, যা ইরানীদের প্রতি তাঁর অন্তরে ভরপুর ছিল।
জঙ্গে সালাসিল সমাপ্ত হলে এবং ইরানীরা পিছু হটে গেলে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দেখেন যে, তার সাথে আগত সৈন্যরা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তিনি হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ডেকে পাঠান।
“ইবনে হারেছা।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–“এভাবে পালিয়ে ইরানীরা যদি জীবিত ফিরে যায় তবে কি তুমি এটাকে পূর্ণ বিজয় জ্ঞান করবে?”
“খোদার কসম, জনাব খালিদ।” হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু আবেগভরা কণ্ঠে বলেন– “আমার শুধু নির্দেশের প্রয়োজন। এরা আমার শিকার।”
“বেরিয়ে পড়”–হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন”–“দুই হাজার সৈন্য সাথে নিয়ে যাও। অধিকহারে ইরানীদের বন্দী করতে চেষ্টা করবে। যারা মোকাবিলায় অস্ত্র ধরবে তাদের হত্যা করে ফেলবে।… আমি জানি, আমার জানবায সাথীরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে কিন্তু ইরান সম্রাটকে জানিয়ে দিতে চাই যে, আমরা ভূ-পৃষ্ঠের এক প্রান্ত হতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করব।”
হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু ২ হাজার সৈন্য নিয়ে যান এবং পলায়নপর ইরানীদের পিছু নেন। ইরানীরা যখন দূর থেকে লক্ষ্য করে যে, তাদের পিছু নেয়া হচ্ছে তখন তারা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। তারা বোঝা হাল্কা করতে লৌহগদা এবং অস্ত্র ফেলে দেয়। পশ্চাদ্ধাবন করে ইরানীদের পাকড়াও করা হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ ইরানীরা দলে দলে বিক্ষিপ্ত হলেও পরবর্তীতে তারা এক একজন করে ভাগতে থাকে। তাদের পশ্চাতে পশ্চাতে মুসান্নার সাথীরাও সঙ্গীহীন হয়ে যায়।
