“কি খবর এনেছ, তাই বল” উরদূশের গর্জে ওঠে বলে। রাজাধিরাজ! হুরমুজ সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছে” দূত বলে।
“হুরমুজ?” উরদূশের চমকে উঠে সামনে ঝুঁকে পড়ে এবং একরাশ বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাসা করে সাহায্য চেয়েছে?… সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়ছে না?
সে কি যুদ্ধে টিকে উঠতে পারছে না? … আমি তো শুনেছি, মুসলমানরা লুটেরাদের একটি গ্রুপের মত বৈ নয়। তাহলে হুরমুজের হলটা কি? যুদ্ধের পূর্বে সে সৈন্যদের শিকলাবদ্ধ করেনি?… বল, জবাব দাও।” সারা দরবারে নীরবতা নেমে আসে। যেন সেখানে কোন মানব-জন নেই;চারপাশের দেয়ালগুলো নির্বাক দাঁড়িয়ে আছে।
‘ইরান সাম্রাজ্য দুনিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাপৃত হোক”, দূত বলে–“শিকল বাঁধা হয়েছিল ঠিকই কিন্তু মুসলমানরা এমন চাল চালে যে, পরবর্তীতে ঐ শিকল তাদের পায়ের বেড়িতে পরিণত হয়।”
“মদীনাবাসীদের সংখ্যা কত?” সম্রাট জানতে চায়।
“মহারাজ! খুবই কম” দূত জবাবে বলে “আমাদের সংখ্যার কাছে তাদের সংখ্যা গণনার বাইরে ছিল কিন্তু …।”
“দূর হ সামনে থেকে” সম্রাট ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং পরে একটু শান্ত হয়ে বলে “কারেনকে ডাক।”
ইরান ফৌজের আরেক নামকরা বীর সালার কারেন বিন করয়ানুসা। শাহী দরবারে তার যথেষ্ট কদর ছিল। হুরমুজের মত তার মস্তকেও এক লক্ষ দেরহাম মূল্যের রাজকীয় টুপি শোভা পেত। সম্রাটের আজ্ঞা পেয়েই সে ছুটে আসে।
“কারেন!” উরদূশের বলে “এ কথা তোমার বিশ্বাস হয় যে, হুমুজ মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইরত অবস্থায় সাহায্য চেয়ে পাঠিয়েছে?” এরপর উরদূশের দরবারের আমত্যবর্গের প্রতি দৃষ্টি প্রদক্ষিণ করালে তারা উঠে দাঁড়ায় এবং সম্মান প্রদর্শনার্থে মাথা ঝুঁকিয়ে এক এক করে বাইরে বেরিয়ে যায়। উরদূশের একান্তে কারেনের সাথে কথা বলতে চায় “দূত মুসলমান পক্ষের হয়ে আমাদের ধোঁকা দিতে আসেনি তো?”
“মুসলমানরা এতদূর স্পর্ধা দেখাতে পারে না”– কারেন বলে– “রণাঙ্গনে সামান্য ভুলেই চিত্র পাল্টে যায়। হুরমুজ সাহায্য চেয়ে পাঠালে তার অর্থ এই দাঁড়ায় যে, তার বাস্তবেই সাহায্যের প্রয়োজন এবং তার থেকে কোন ভুল হয়ে গেছে।”
‘মুসলমানদের মধ্যে এই হিম্মত আছে যে তারা আমাদের ফৌজ পিছপা করে দেবে?” উরদূশের জিজ্ঞাসা করে।
তাদের মধ্যে শুধু হিম্মতই নয়, প্রচুর সাহসও রয়েছে”–কারেন বলে–“তারা ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লড়ে। উবলা এলাকায় আমরা মুসলমানদের এমন নীচু অবস্থায় রেখেছিলাম যে, তারা পোকা-মাকড়ের মত জীবনযাপন করত। কিন্তু তারা মারাত্মক আক্রমণ করে এবং একের পর এক গুপ্ত হামলা চালিয়ে অত্র এলাকার চৌকিগুলো লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে… আজ পর্যন্ত তারা যত যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে তার একটিতেও পরাজিত হয়নি। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হল, প্রতিটি যুদ্ধে প্রতিপক্ষের তুলনায় তাদের সৈন্যসংখ্যা কম ছিল। আর তাদের কাছে ঘোড়াও বেশি একটা ছিল না।” “তাদের যোদ্ধারাও এমনি সাধারণ পর্যায়ের হবে”– সম্রাট উরদূশের বলে–“তাদের পক্ষে আমাদের সৈন্যের মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।”
“কিন্তু তারা তো ইতোমধ্যেই মোকাবিলা করে ফেলেছে”– কারেন বলে “এবং আমাদের এত বড় অভিজ্ঞ সেনাপতি হুরমুজ সাহায্য চেয়ে আবেদন করতে বাধ্য হয়েছে।… মহামান্য সম্রাট! শত্রুকে এত ছোট ও তুচ্ছ করে দেখা ঠিক নয়। আমাদের অযথা দাম্ভিকতা দেখানো ঠিক হবে না। বাস্তব অবস্থা সামনে রেখে কথা বলতে হবে। বাস্তবতা তলিয়ে দেখতে হবে। পারস্যের দাপট রয়েছে ঠিকই কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, রোমকরা আমাদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল। এবং এখনো আমরা রোমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করতে বিব্রতবোধ করি। তাই সৃষ্ট এ নয়া পরিস্থিতি ও আমাদের বাস্তবতা দিয়ে বিচার করতে হবে। হুরমুজ আসলেই সাহায্য চেয়ে পাঠালে তার অর্থ হলো, মুসলমানরা তাকে কাবু করে ফেলেছে।”
“আমি তোমাকে এজন্যই ডেকে পাঠিয়েছি যে, তুমিই হুরমুজের সাহায্যে এগিয়ে যাবে”–উরদূশের বলে–“হুরমুজ ঘাবড়ে গিয়ে থাকলে তার সাহায্যার্থে তার চেয়ে ভাল না হোক অন্তত তার মতই এক সেনাপতি যাওয়া দরকার। তুমি এমন বাহিনী তৈরি কর, যাদের দেখলেই মুসলমানরা মদিনায় ভেগে যাবে না কি যুদ্ধ করবে” পুনঃ বিবেচনা করতে বাধ্য হয়।… জলদি কারেন! দ্রুত রওয়ানা হয়ে যাও।”
কারেন সামনে কোন কথা বাড়ায় না। বিদায়ী কুর্নিস করেই লম্বা লম্বা পা ফেলে দরবার থেকে প্রস্থান করে।
ইরানী সেনাপতি কারেন বিশাল বাহিনী নিয়ে উবলার উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়। সে এই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়েই চলে যে, মুসলমানদের নাম নিশানা মিটিয়েই তবে ফিরবেন। দজলার বাম কিনারা দিয়ে সে তার বাহিনীকে নিয়ে যায়। সৈন্যদের চলার গতি ছিল দ্রুত। সে মাজার নামক স্থানে গিয়ে সৈন্যদের দজলা পার করায় এবং দক্ষিণে মা’কাল দরিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। দরিয়া মা’কাল পাড়ি দিয়ে ওপারে পৌঁছলে হুরমুজের পরাজিত বাহিনীকে দলে দলে ফিরে আসতে দেখতে পায়। সৈন্যদের অবস্থা ছিল বড় করুণ।
“যরথুস্ত্রের গজব পড়ুক তোমাদের উপর।” কারেন প্রথম ফিরতি দলটি থামিয়ে এবং তাদের দুর্দশা দেখে বলে– “মুসলমানদের ভয়ে তোমরা পালিয়ে যাচ্ছ?”
