॥ সাত ॥
এক বিরাট শক্তিশালী শত্রুকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দুনিয়ার সামনে মুসলমানরা এই নজির স্থাপন করে যে, সংখ্যাধিক্য এবং উন্নত হাতিয়ার হলেই যুদ্ধজয় করা যায় না। জযবা এবং প্রেরণাসিক্ত লড়াই করেই যুদ্ধ জিতে নিতে হয়। পরের দিন গনীমতের মাল জমা করা হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পুরো মাল পাচ ভাগে বিভক্ত করেন। চার ভাগ সৈন্যদের মাঝে বণ্টন করে দেন আর একভাগ বাইতুল মালে জমা দেয়ার জন্য মদীনায় খলীফা আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এর বরাবর পাঠিয়ে দেন। হুরমুজের এক লক্ষ্য দেরহাম মূল্যের টুপিও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলিফার নিকট পাঠিয়ে দেন। খলীফা এই টুপি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ফেরৎ পাঠান। কারণ, মল্লযুদ্ধে হত্যাকারী নিহত ব্যক্তির সমস্ত মাল-সম্পদের প্রাপক হয়ে থাকে। ফলে মল্লযুদ্ধে হুরমুজকে হত্যা করায় তার এ টুপির মালিক হয়ে যান হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু।
“দেখ দেখ বাইরে বেরিয়ে এসে দেখ এটা আবার কি!”
মদিনার অলি গলিতে এমনি ধরনের আওয়াজ ক্রমশই উচ্চারিত হতে থাকে। মানুষ পাল্লা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে শুরু করে কে কার আগে যাবে এই প্রতিযোগিতা শুরু হয়।
“এটা কোন প্রাণী হবে” জনতার বুক চিরে এক আওয়াজ।
“না… খোদার কসম, এমন প্রাণী কখনো আমরা দেখিনি” প্রথম আওয়াজ প্রত্যাখ্যান করে দ্বিতীয় আওয়াজ।
“এটা কোন প্রাণী নয়… আল্লাহর বিস্ময়কর এক সৃষ্টি” কিছুটা বিজ্ঞতা ভাব মিশ্রিত তৃতীয় আওয়াজ আসে।
ঘরের মহিলা ও শিশুরাও ছুটে আসে। সবার চোখে প্রশ্ন, চেহরায় বিস্ময়ের ছাঁপ। ছোটরা এক নজরে দেখেই ভয়ে মায়ের আঁচল কিংবা পিতার পিছনে গিয়ে লুকায়। যারা আল্লাহর এই আজব প্রাণী ধরে রেখেছিলেন তারা জনতার উৎসুক হাবভাব দেখে মুচকি হাসছিলেন। আজব প্রাণীর পিঠে যারা বসা ছিল তাদের মুখেও হাসি শোভা পাচ্ছিল।
“এটা কি?” জনতা জানতে চায় “এটাকে কি বলে?
“একে হাতি বলে” হাতির সাথে সাথে গমনকারী এক ব্যক্তি উচ্চ আওয়াজে বলে–“এটা একটা যুদ্ধ প্রাণী। ইরানীদের থেকে এটা আমরা ছিনিয়ে নিয়েছি।”
শিকলযুদ্ধে ইরানী বাহিনী পশ্চাদপসারণ করলে এ হাতিটি মুসলমানদের হস্ত গত হয়। প্রায় সকল ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু গনীমতের মালের যে এক পঞ্চমাংশ খলীফা বরাবর পাঠিয়েছিলেন তার মধ্যে একটি হাতিও ছিল। মদীনাবাসী ইতোপূর্বে হাতি দেখেনি। হাতিটি মদীনার শহর নগরসহ প্রতিটি অলি-গলিতে প্রদর্শনী করে ফিরান হয়। সবাইকে প্রাণীটি বিস্মিত করে। অনেকে ভীতও হয়ে পড়ে। তারা একে প্রাণী নয়; আল্লাহর বিস্ময়কর সৃষ্টি বলত। হাতির সাথে তার ইরানী মাহুতও ছিল।
হাতিটি মদীনায় কয়েকদিন রাখা হয়। বসে বসে খাওয়া ছাড়া তার অন্য কোন কাজ ছিল না। হাতি থেকে কাজ নেয়ার পদ্ধতিও মদীনাবাসীদের জানা ছিল না। আর জানলেও মাত্র একটি হাতি দিয়ে আর কিইবা করা যায়। আমীরুল মু’মিনীন মাহুত সহ হাতিটি আযাদ করে দেন। কোন ইতিহাসে এ তথ্য উল্লিখিত হয়নি যে, হাতিটি মদীনা হতে কোথায় চলে যায়।
দজলা এবং ফোরাত আজও প্রবহমান। এক হাজার তিনশ বায়ান্ন বছর পূর্বেও প্রবাহমান ছিল। তবে সেদিনের প্রবাহ আর আজকের প্রবাহের মাঝে ব্যবধান আকাশপাতাল। সাড়ে তেরশ বছর পূর্বে দজলা এবং ফোরাতের লহরে ইসলামের বীর মুজাহিদদের প্রেরণা এবং জযবার কলতান উঠত। এ সকল দরিয়ার পানিতে শহীদদের তাজা খুন মিশ্রিত ছিল। রেসালাত চেরাগের প্রেমিকগণ দজলা এবং ফোরাতের উপকূল বেয়ে ইসলামকে শুধু সম্মুখপানে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। এদিকে যরথুস্ত্রের আগুনের শিখা লাফিয়ে লাফিয়ে মুসলমানদের গতিরোধ করতে থাকে। কিন্তু মুসলমানরা দুর্বার গতিতে সকল বাধা পেরিয়ে শুধু এগিয়েই চলতে থাকে।
মুসলমানদের জন্য সামনে এগিয়ে চলা সহজ ছিল না। তারা ইরান সাম্রাজ্যের লেজে পাড়া দিয়েছিল। মুসলমানদের সংখ্যা কম এবং তেজোদ্যম হ্রাস পেতে থাকে। অপরদিকে শত্রুদের সমর শক্তি ছিল রীতিমত উদ্বেগজনক পরিমাণ। পরিস্থিতি কখনো এমন দাঁড়াত যে, মনে হত ইরানীদের বিশাল সমরশক্তি মুসলমানদের মুষ্টিমেয় সৈন্যদেরকে তাদের বিশাল পেটে টেনে নিচ্ছে।
পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল মাদায়েন। সম্রাট উরদূশের সিংহাসনে উপবিষ্ট। গর্বে মাথা স্বাভাবিকতার চেয়েও কয়েক ইঞ্চি উঁচু ছিল তার। সিংহাসনের ডানে-বামে ভবন মোহিনী শাহী পাখা আলতো দোলাচ্ছিল। সম্রাট সিংহাসন থেকে উঠছিল ইতোমধ্যে তাকে জানানো হয় যে, উবলা রণাঙ্গন থেকে দূত এসেছে।
“এখনি নিয়ে এস” উরদূশের বাদশাহী ভঙ্গিতে বলে– “সে এ ছাড়া আর কিইবা খবর নিয়ে আসবে যে, হুরমুজ মুসলমানদের কচুকাটা কেটেছে।… আরবের ঐ বর্বর ও বুদ্দুরা আর কতটুকুই বা শক্তি রাখে যারা খেজুর এবং যব ছাড়া আর কোন খাদ্য বস্তু চোখেই দেখেনি।” দূত দরবারে প্রবেশ করলে তার চেহারা এবং ভঙ্গিই বলে দেয় যে, সে কোন শুভ সংবাদ আনেনি। দূত ভেতরে ঢুকেই এক বাহু সোজা উপরে তুলে ধরে এবং নতশির হয়ে ঝুঁকে পড়ে।
“সোজা হয়ে দাঁড়াও” উরদূশের বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলে “শুভ সংবাদ শুনতে এতক্ষণ অপেক্ষা করতে পারি না। …মুসলমানদের নারীদেরও কি বন্দী করা হয়েছে?…জবাব দাও… তুমি এভাবে নীরব কেন?” “ইরানের সিংহাসন অমর হোক”, দূত রাজদরবারের শিষ্টাচার হিসেবে বলে–“সম্রাট উরদূশেরের সাম্রাজ্য…।”
