আচমকা এক প্রান্ত হতে একটি অশ্ব ছুটে আসে। আত্মরক্ষার্থে ব্যস্ত দেহরক্ষীরা এ অশ্ব দেখতে পায় না। অশ্ব বিদ্যুৎগতিতে দেহরক্ষীদের বৃত্ত কাটতে কাটতে আগে বেরিয়ে যায়। তিন দেহরক্ষী মাটিতে লুটিয়ে ছটফট করতে থাকে। তাদের একজন অশ্বের পদতলে পিষ্ট হয় আর বাকী দু’জন আগন্তুক অশ্বারেহীর তলোয়ারে দ্বিখণ্ডিত হয়। ঘাতক অশ্ব কিছুদূর গিয়ে আবার পিছনে মোড় নেয় এবং পুনরায় হুরমুজের দেহরক্ষীদের লক্ষ্যে এগিয়ে আসে। দেহরক্ষীরা নিজেদের বাঁচাতে সাধ্যমত চেষ্টা করলেও আবারও তিন দেহরক্ষী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। চোখের পলকে ৬ সাথীর এভাবে নির্মম নিহত হতে দেখে তারা ভড়কে যায় এবং পালিয়ে মূল বাহিনীতে গিয়ে আশ্রয় নেয়।
এই আগন্তুক অশ্বারোহী ছিলেন হযরত কা’কা’ বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁকে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাহায্য হিসেবে পাঠিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন “যে পক্ষে কা’কার মত দূরন্ত যোদ্ধা থাকবে তারা হারবে না।”
ক্ষণিকের জন্য দর্শকের দৃষ্টি হযরত কা’কা’ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর চোখ ধাঁধানো দৃশ্যের দিকে নিবদ্ধ হলেও আবার সবার দৃষ্টি হুরমুজ ও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে ফিরে যায়। সকলের চোখে মুখে রাজ্যের বিস্ময় নেমে আসে। যে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর প্রাণ যায় যায় করছিল তিনিই এখন চেঁপে বসা পাপীষ্ঠ হুরমুজের বুকে, আর হুরমুজ নিযর নিস্তব্ধ দেহে চিৎ হয়ে মাটিতে পড়েছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খঞ্জর এক সময় হুরমুজের বুক থেকে বেরিয়ে আসে। খঞ্জর থেকে রক্ত টপ টপ করে পড়ছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুরমুজের আহবানে মল্লযুদ্ধে লিপ্ত হতে গেলে হযরত কা’কা বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘটনা গভীরভাবে নিরীক্ষণ করতে থাকেন। হুরমুজের দেহরক্ষীদের বৃত্তাকারে এগিয়ে আসতে দেখে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবনের ব্যাপারে তাঁর মনে সন্দেহ ঘনীভূত হয়। তিনি এগিয়ে যান এবং বাস্তবে যখন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবন সংকটাপন্ন এবং তিনি নিজেকে বাঁচাতে প্রানান্ত প্রয়াসরত, তখন তিনি কারো নির্দেশ কিংবা অনুমান ছাড়াই ঘোড়া ছুটিয়ে দেন এবং দেহরক্ষীদের উপর আক্রমণ করে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জীবনরক্ষা করেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুরমুজের লাশের উপর থেকে উঠে দাঁড়ান। এখন এক লক্ষ দেরহাম মূল্যের টুপি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে। এবং তার রক্তে রঞ্জিত খঞ্জর উঁচু করে তুলে ধরে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর বাহিনীকে মূল যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। তার পূর্বের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী মুসলিম বাহিনীর দুই অংশ দুই দিক থেকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ডান ও বাম দিক থেকে তারা ইরানী বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আক্রমণ করে। ইরানীরা হুরমুজের মত সেনাপতির মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়লেও স্বীয় ঐতিহ্যজাত বীরত্বের কারণে তারা অস্ত্র ত্যাগ করেনা। তাদের সংখ্যাও মুসলমানদের তুলনায় অনেক বেশী ছিল। যুদ্ধ সামগ্রী অস্ত্র, অশ্বের কোন কমতি তাদের ছিল না। মুসলমানদের মোকাবিলায় তারা দারুণ রুখে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি এমন হয়ে ওঠে যে, ইরানীদের পরাজিত করা সম্ভব নয়; আর হলেও তা হবে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে। ইরানী সৈন্যরা পাঁচজন, সাতজন দশজন করে এক এক শিকলে বাঁধা ছিল। তারা চতুর্মুখী আক্রমণ প্রতিহত করে যাচ্ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের ক্লান্ত করে তোলার জন্য অশ্বারোহীদের ব্যবহার করেন। অশ্বারোহীরা তাদের পদাতিক তীব্রগতির আক্রমণ শুরু করে যে, তাদের প্রাণ বাঁচাতে ডানে বামে ছুটোছুটি করতে হয়। পদাতিক বাহিনীকেও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এমনিভাবে লড়িয়ে যান। ইরানী পদাতিকরা দিশেহারা হয়ে পলায়নের সহজ পথ খুঁজতে থাকে। এর বিপরীতে মুসলমানরা হাল্কা অস্ত্র সজ্জিত হওয়ায় দ্রুততার সাথে স্থান পরিবর্তন করে যেভাবে ইচ্ছা লড়াই করছিল।
কিছুক্ষণ পর ইরানীদের মাঝে ক্লান্তি আর অবসাদের ছাঁপ সুস্পষ্ট প্রতিভাত হতে থাকে। ঐতিহ্যগত ধারা হিসেবে তারা নিজেদেরকে যে শিকলে আবদ্ধ করেছিল পরে তা তাদের পায়ের বেড়িতে পরিণত হয়। ভারী অস্ত্রের বোঝাই তাদের জীবনের জন্য অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। ইরানীদের শৃঙ্খলা ও সুসংঘবদ্ধতায় ফাটল সৃষ্টি হতে থাকে। তাদের মধ্যম বাহিনীর কমাণ্ড হুরমুজের মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। পার্শ্ব বাহিনীদ্বয়ের কমান্ডার কুববায এবং আনুশযান পরাজয় নিশ্চিত অনুধাবন করে সৈন্যদের পিছু হটার নির্দেশ দেয়। পিছু হটা কেবল তাদের পক্ষেই সম্ভব ছিল যারা শিকলে বাঁধা ছিল না। এদের অধিকাংশই ছিল অশ্বারোহী। কুববায এবং অনুশাযান নিজ নিজ পার্শ্ব বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিরাপদে পিছে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারলেও মধ্যম বাহিনী শৃঙ্খলিত থাকায় তাদের হাজার হাজার সৈন্য মুসলমানদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। শৃঙ্খলিত সৈন্যদের উপর এটা ছিল এক ধরনের পাইকারী হত্যা, যা সূর্য অস্ত মিত হওয়ার পরেও চলতে থাকে। রাত বেশ গাঢ় হলে হত্যাযজ্ঞের ধারা বন্ধ হয়।
