অতর্কিত হামলা। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিকটবর্তী পাহাড়ের উদ্দেশে কিছু দূর অগ্রসর হতেই ইকরামা তার উপর অশ্বারোহী ইউনিট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ইকরামার আক্রমণের সংবাদ জনৈক পদাতিক সৈন্য জানতে পেরে সেও হামলা শুরু করে। এতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ কারো বেঁচে থাকার আশা সম্পূর্ণ তিরোহিত হয়ে যায়। ত্রিশজন পুরুষ আর দুজন মহিলা সর্বমোট বত্রিশজন জানবাজ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হেফাজতের জন্য তার চারপাশে মানব প্রাচীররূপে দণ্ডায়মান হয়ে যান।
অনেক পিছনের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে খালিদের স্মরণ হয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শারীরিক শক্তির বিচারেও অনন্য ছিলেন। তার জ্বলন্ত প্রমাণ, আরবের নামকরা মুষ্টিযোদ্ধা রুকানাকে তিনি তিন তিনবার উর্ধ্বে তুলে আছাড় দিয়েছিলেন। যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে তার শক্তি প্রদর্শনের আরেকবার সুযোগ হয়ে যায়। মানববর্মের ঐ প্রাচীর যা নিবেদিত প্রাণ সাহাবায়ে কেরাম তার চারপাশে লৌহ প্রাচীরবৎ স্থাপন করেছিল তা তিনি নিজেই ভেঙ্গে ফেলেন। তার হাতে তখন শোভা পাচ্ছিল ধনুক। তুমীর তীরে ভরা ছিল। এ সময় খালিদ মুসলমানদের বড় অংশটির সাথে লড়াইয়ে রত ছিলেন। তাকে যখন পরবর্তীতে জানানো হয় যে, ত্রিশজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা যোদ্ধা নিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরাইশ অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীর সাথে মরণপণ যুদ্ধ করছেন, তখন তার মুখ হতে আবার এ কথা বেরিয়ে আসে যে, এটা দৈহিক শক্তি হতে পারে না; অদৃশ্য কোন শক্তি হবে। এ সময় থেকে একটি প্রশ্ন তাকে খুব তাড়া করে ফেরে– দৃঢ় বিশ্বাস কি কখনো শক্তির রূপ ধারণ করতে পারে? তার গোত্রের কারো থেকে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার সুযোগ ছিল না। কেননা এ প্রসঙ্গ তুলতেই তার প্রতি এ অপবাদ দেয়া হত যে, সে মুহাম্মাদের জাদুর শিকার। মুহাম্মাদ তাঁকে জাদু করে দেয়া এ ধরনের অযৌক্তিক প্রশ্ন তারই প্রতিক্রিয়া মাত্র।
আজ মদীনাতে যাবার সময় সেই প্রশ্নটি আবার তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। উহুদ পর্বতের সারি ক্রমে তার সম্মুখে বৃদ্ধি পেতে থাকে। চার বছরের পেছনের স্মৃতি তাকে আবার এ পাহাড়ের পাদদেশে নিয়ে যায় যেখানে তার নিজের নাম গুঞ্জরিত হচ্ছিল–“আবু সুলাইমান। আবু সুলাইমান!”
তিনি কল্পনায় অনুধাবন করতে চেষ্টা করছিলেন যে, মাত্র ত্রিশজন পুরুষ আর দুইজন মহিলা কি করে বিপুল সংখ্যক অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্যের মোকাবিলা করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বৃত্ত ভেঙ্গে নিজ হাতে তীর নিক্ষেপ করেন। সাহাবায়ে কেরাম দৌড়ে গিয়ে আবার তাঁকে বৃত্তের মাঝে নিয়ে নিতেন। এক সমর ঐতিহাসিকের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, তাঁকে ঘিরে রাখা বৃত্ত তিনি বারবার ভেঙ্গে যেদিক হতে দুশমন অগ্রসর হত সেদিকে তীর ছুরতেন। তাঁর দৈহিক শক্তি সাধারণ মানুষ থেকে কয়েক গুণ বেশি ছিল। তিনি ধনুক এত জোরে টানতেন যে, তীরের ফলা শরীরের এপাশ দিয়ে প্রবেশ করে ওপাশ দিয়ে বের হয়ে যেত। সেদিন তিনি অনেক তীর ছুড়েন। এত তীর ছুড়েন যে, এক সময় একটি তীর নিক্ষেপ করার সময় ধনুকই ভেঙ্গে যায়। তখন তিনি তুনীরের বাকী তীর হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে দিয়ে দেন। সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিশানা এড়ানো কারো পক্ষে সম্ভব ছিল না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেও তার নিশানার কথা স্বীকার করতেন।
এদিকে আবু সুফিয়ান এবং খালিদের হাতে মুসলমানরা শহীদ হতে থাকে আর মুসলমানরা জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত মোকাবিলা করে যায়। আর এদিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্য উৎসর্গপ্রাণ ত্রিশজন পুরুষ আর দুইজন মহিলা এমন বেপরোয়া হামলা প্রতিহামলা চালায়, যেন তাদের দেহ নয়; আত্মা বিরামহীন লড়ে চলেছে। প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক তাবারী লিখেন যে, প্রতিজন মুসলমান একই সাথে চার-পাঁচজন কুরাইশের মোকাবিলা করেন। সে লড়াইয়ের চিত্র এতই ভয়ঙ্কর ছিল যে, হয়তবা সাহাবী তাদের পিছু হটতে বাধ্য করতেন না হলে তিনি একাকী আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়ে লুটিয়ে পড়তেন।
♣♣♣
কুরাইশরা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি নিবেদিত প্রাণ সাহাবায়ে কেরামের অসাধারণ বীরত্বের সামনে টিকতে না পেরে একটু পিছু হঁটে তীরের আর পাথরের অবিরাম বর্ষণ শুরু করে। অতি উৎসাহী কিছু অশ্বারোহী দ্রুত অশ্ব ছুটিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে হামলা করতে চাইলে সাহাবায়ে কেরামের নিক্ষিপ্ত তীর তাদেরকে ফিরে যেতে বাধ্য করে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কুরাইশরা সম্মুখ যুদ্ধ বাদ দিয়ে দূর থেকে মুষলধারায় তীর এবং পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে।
ইকরামা খালিদকে এক ফাঁকে জানিয়ে দেয় যে, আবু দাজানা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিঠ শত্রুদের দিকে। তিনি একই সাথে দু’দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছিলেন। প্রথমত হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে তীর যোগান দিচ্ছিলেন। আর সা’দ রাযিয়াল্লাহু আনহু ক্ষিপ্রতার সাথে সে তীর ছুড়ছিলেন। দ্বিতীয়ত হযরত আবু দাজানা রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তীর থেকে রক্ষা করতেও চেষ্টা করছিলেন। তীর এবং পাথর বৃষ্টির কারণে হযরত আবু দাজানা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর করুণ অবস্থা কারো নজরে পড়ে না। এক সময় তিনি লুটিয়ে পড়লে দেখা যায় যে, তার পিঠ অসংখ্য তীরের আঘাতে চালনীর মত হয়ে গেছে।
