সর্বাধিনায়কের এ নির্দেশ মুহুর্তে ছাউনীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পৌঁছে যায়। প্রতিটি সৈন্য যুদ্ধ প্রেরণায় উদ্দীপ্ত ও প্রস্তুত হয়ে যায়।
ইতোমধ্যে মুসান্না ও তার সাথীদের সংগৃহীত ৮ হাজার সৈন্য হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীর সাথে এসে মিলিত হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর যে দূত হুমুজের দরবারে গিয়েছিল তিনিও এ সময় এসে পৌঁছান। হুরমুজ তার সাথে যে অপমানজনক আচরণ করেছে তা তিনি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে খুলে বলেন।
“এক লক্ষ দেরহামের টুপিই তার মাথা খারাপ করে দিয়েছে, সেখানে উপবিষ্ট হযরত মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–মানুষের মাথায় কি আছে আল্লাহ তা দেখেন না; তিনি দেখেন ঐ মাথার মধ্যে কি আছে। তার উদ্দেশ্য কি। অভিপ্রায় কি। কোন ধ্যান-ধারণা নিয়ে সে চলে।”
“এক লক্ষ্য দেরহামের টুপি?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন–“হুরমুজ সত্যই এত দামী টুপি পরে?”
“পারস্য সাম্রাজ্যের একটি নিয়ম আছে” মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন–“বংশকৌলিন্য, প্রভাব প্রতিপত্তি এবং পদমর্যাদা বিবেচনায় তাদেরকে বিভিন্ন টুপি পরিধান করানো হয়। এটা রাষ্ট্রের পক্ষ হতে দেয়া হয়। অধিক মূল্যবান টুপি তারাই পরে যাদের বংশ মর্যাদা উন্নত এবং যারা প্রজাদের নিকট ও শাহী দরবারেও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। বর্তমানে হুরমুজের টুপির মূল্যই সবচেয়ে বেশি। এক লক্ষ দেরহামের টুপি বর্তমানে আর কারো পরার অধিকার নেই।” “এই টুপি বহু মূল্যবান হীরা-পান্না খচিত। টুপির শীর্ষ পালকও বেশ দামী।” ফেরাউনও তার মাথায় খোদায়ী টুপি ধারণ করেছিল” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “কিন্তু আজ সে কোথায়? কোথায় গেল তার টুপি…কারো দামী টুপি আমাকে প্রভাবিত করবে না এবং কোন টুপি তরবারির আঘাত প্রতিহত করতে পারবে না। এর চেয়ে আমাকে বলো, অগ্নিপূজারীরা লড়াইয়ে কেমন এবং রণাঙ্গনে তারা কত দ্রুততার সাথে স্থান পরিবর্তন করে করে অসি চালাতে পারে?”
“পারস্য সিপাহীদের বর্ম এবং অস্ত্র দেখলে অন্তরে ভয় লাগে” হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে অবগত করেন, “মস্তকে জিঞ্জির বিশিষ্ট শিরস্ত্রাণ, বাহুতে বিশেষ ধাতুর খোলস, পায়ের নলার দিক মোটা চামড়া কিংবা অন্য কোন ধাতু দ্বারা সংরক্ষিত। যুদ্ধাস্ত্র অনেক। প্রতিটি সিপাহীর কাছে একটি বর্শা, একটি তরবারী, একটি ভারী লৌহগদা, একটি ধনুক এবং তীর ভর্তি একটি তূনীর থাকে। সাধারণত প্রতিটি তূনীরে ত্রিশটি তীর থাকে।”
“আর লড়াই করতে কেমন পটু?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন। “বীরত্ব এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে লড়ে তারা” মুসান্না বিন হারেছা জবাবে বলেন–“তাদের বীরত্বের কথা সর্বজনবিদিত।”
“মুসান্না!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন– “ইরান সিপাহীদের দুর্বলতার পরিমাণ তুমি অনুমান করতে পারনি? তাদের বীরত্বের পরিধি অনুধাবন করনি? … তাদের বীরত্বের পরিধি শিরস্ত্রাণ, বায়ুবন্ধ এবং হাঁটুর নীচের অংশ রক্ষার্থে ধাতু নির্মিত খোলস পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। তারা জানেনা যে, জযবা ও প্রেরণা লৌহ কেটে দু’ভাগ করে দিতে পারে। কিন্তু লোহার তরবারী এবং বর্শার ফলা প্রেরণা খণ্ডিত করতে পারেনা। বর্ম এবং ধাতু কিংবা চামড়ার খোল আত্মরক্ষার কৃত্রিম মাধ্যম। একটি খোল কেটে গেলে সিপাহী নিজেকে অরক্ষিত মনে করতে থাকে। এর পরে তার মাঝে কেবল এতটুকু সাহস থাকে যে, সে কোনভাবে আত্মরক্ষা করতে এবং রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করে। আল্লাহর সৈন্যদের বর্ম হলো তার চেতনা এবং ইস্পাতদৃঢ় ঈমান। পারস্যদের আরেক দুর্বলতা তোমাদের দেখাব?” এর পর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এক দূতকে ডেকে বলেন “সালার এবং কমান্ডারদের এখনি আসতে বল।”
“এখনই কাজিমা লক্ষ্যে সৈন্য মার্চ করাও” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নির্দেশ দিয়ে বলেন–“এবং সৈন্যদের চলার গতি অত্যন্ত দ্রুত হওয়া চাই।”
হুরমুজ হাফীরায় ছাউনী ফেলে অবস্থান করছিল। সে কাজিমা থেকে স্বীয় বাহিনী এখানে এনেছিল। কেননা, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনী হাফীরা এসে গিয়েছিল। এখন সৈন্যরা আবার কাজিমা অভিমুখে রওনা হয়। উভয় ফৌজের কয়েক অশ্বারোহী পরস্পরের তাঁবুর উপর গভীর নজর রেখেছিল। হুরমুজ যখন খবর পায় যে, মুসলিম বাহিনী আবার কাজিমার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেছে। তখন হুরমুজও তার বাহিনীকে কাজিমার উদ্দেশে মার্চ করার নির্দেশ দেয়।
হুরমুজের চিন্তা ছিল উবলা এলাকা নিয়ে। এটা ইরানী সাম্রাজ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শহর ছিল। বাণিজ্যিক কেন্দ্র ছিল এটা। হিন্দুস্থানের বণিক কাফেলাদের আনাগোনা এ স্থানেই বেশী হত। বিশেষ করে সিন্ধুর পণ্যসামগ্রী এখানেই এসে পৌঁছত। এখানে ইরানী সেনাবাহিনীর হেড কোয়াটারও অবস্থিত ছিল। অত্র এলাকায় বসবাসরত মুসলমানদের দাবিয়ে রাখতে উবলায় সবসময় রিজার্ভ বাহিনী থাকত। হুরমুজ চাচ্ছিল খালিদ বাহিনী যেন কোন ভাবেই উবলায় পৌঁছতে না পারে। হুরমুজের কাছে উবলা এখন পূর্বের তুলনায় অধিক বিপদাপন্ন মনে হতে থাকে। কারণ, মুসলমানদের গতি এখন উবলার দক্ষিণে কাজিমার প্রতি ছিল।
