ইতোপূর্বে মুসলমানরা এভাবে সামনাসামনি ইরানীদের মোকাবিলা করার সাহস করেনি। কোন ইরানীকে কিছু বললে তাকে তার গোত্রসহ উচ্ছেদ ও নির্মূল করে দেয়া হত। এবার মুসলমানরা এ কারণে সাহসী হয়ে ওঠে যে, তারা জানতে পেরেছিল যে, মদীনার সৈন্য এসে গেছে, যে অশ্বারোহীরা অতর্কিত এসে আক্রমণ করেছিল তাদের কতক ছিল অত্র অঞ্চলের আর কিছু ছিল অন্য বসতির। এটা দৈবাৎ ঘটনা ছিল যে, তারা মুসান্না বিন হারেছার আস্তানার উদ্দেশে যাবার জন্য এই বসতির কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা দূর থেকে এলাকাবাসীকে ঘর ছেড়ে বাইরে দাঁড়াতে এবং সেখানে ইরানীদের উপস্থিতি দেখতে পায়। তারা চাইলে ইরানীদের চোখ এড়িয়ে চলে যেতে পারত। কিন্তু ইরানী কমান্ডার কর্তৃক বৃদ্ধের পেটে তরবারী ঢুকিয়ে দেয়ার দৃশ্য দেখে তারা পরস্পর পরামর্শ ছাড়াই ঘোড়ার মুখ ইরানীদের দিকে ফিরায়। ইরানীরা তাদের আগমনের কথা বিন্দুমাত্র টের পায় না। এটা ছিল সম্পূর্ণ আল্লাহর সাহায্য, যা তারা ঠিক সময়ে অযাচিতভাবে লাভ করে।
এ এলাকার লোকদের সৌভাগ্যবানই বলতে হয়। কেননা তারা এভাবে গায়েবী সাহায্যের ফলে এবারের মত ইরানীদের নিষ্ঠুর নির্যাতন থেকে বেঁচে যায়। কিন্তু অন্যান্য বসতির অবস্থা ছিল কেয়ামত সদৃশ। তাদের উপর নেমে এসেছিল কেয়ামতের বিভিষীকা। প্রতিটি বসতির প্রত্যেকটি ঘর চেক করা হচ্ছিল। কতজন পুরুষ অনুপস্থিত তার তদন্ত নেয়া হতে থাকে। প্রতিটি বস্তিতে তারা এ সময় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল কোন কোন ঘরে আগুন লাগিয়ে ভস্ম করে দেয়।
তিন-চার দিন ধরে এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা ও অপরাধচর্চা চলে। এর পরে বসতির দিকে খেয়াল দেয়ার সুযোগ ইরানীদের আর হয় না। হুরমুজ সসৈন্যে চলে আসে। সীমান্তে অবস্থানরত সৈন্যদেরকেও সে সাথে নিয়ে নেয় এবং সীমান্ত বর্তী এলাকা থেকে সামনে এগিয়ে যায়। তার ইচ্ছা ছিল সীমান্তের বহু দূরেই হযরত খালিদ বাহিনীর গতিরোধ করা। হুরমুজের অগ্রাভিযান দ্রুতগতির ছিল।
৪.০৬ ইয়ামামা হতে রওয়ানা
॥ ছয় ॥
৬৩৩ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের তৃতীয় সপ্তাহ ১২ হিজরীর মুহাররম মাস। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ১০ হাজার সৈন্য নিয়ে ইয়ামামা হতে রওয়ানা হন। তারও গতি ছিল দ্রুততর।
হুরমুজ সৈন্য নিয়ে সীমান্ত হতে বহুদূর কাজিমা নামক স্থানে গিয়ে পৌঁছে এবং সৈন্যদের সেখানেই তাঁবু স্থাপন করতে বলে। এ স্থানটি ইয়ামামা ও উবলার মাঝখানে ছিল। হুরমুজের জানা ছিল না যে, তার প্রতিটি অবস্থার মনিটরিং করা হচ্ছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কাজিমা হতে বহু দূরে থাকতেই ইরাকের দিক হতে দু’ উষ্ট্রারোহীকে এগিয়ে আসতে দেখেন। তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানান যে, হুরমুজ বাহিনী-কাজিমায় এসে ছাউনী ফেলেছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সেখান থেকে রাস্তা বদল করেন। সংবাদবাহক উষ্ট্রারোহীরা হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু কতৃক প্রেরিত ছিল। তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কে অনুরোধ করেন, যেন তিনি হুরমুজ বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়েই হাফীরে গিয়ে পৌঁছেন। তারা এ সুসংবাদও শুনান যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর জন্য আট হাজার সৈন্য অপেক্ষা করছে। মুসান্না বিন হারেছা, মাজউর বিন আদী, হুরমূলা এবং সুলামা প্রত্যেকেই দুই দুই হাজার যোদ্ধা সংগ্রহ করায় এ আট হাজার সৈন্যের ব্যবস্থা হয়। এভাবে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর সৈন্য সংখ্যা ১৮ হাজার গিয়ে পৌঁছে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিরাপদে হাফীরে পৌঁছতে কাজিমার বহুদূর দিয়ে এগিয়ে চলেন। হুরমুজের চর মরু এলাকায় ছড়িয়ে ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সৈন্যদেরকে দূর রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে তারা দেখতে পায়। হুরমুজ ছাউনি উঠিয়ে দ্রুত হাফীরে মার্চ করে যাবার নির্দেশ দেয়। হাফীরের চতুর্দিকে পানির কূপ বিদ্যমান ছিল। হুরমুজ সেখানে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পূর্বেই পৌঁছে গিয়ে ছাউনি তৈরি করে ফেলে। এভাবে হাফীরের সকল পানির কূপ ইরানীদের কব্জায় চলে যায়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হাফীরে পৌঁছার পূর্বেই পথিমধ্যে আবার ঐ দু’ উষ্ট্রারোহীর উদয় হয়। তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে জানায় যে, ইতোমধ্যে হাফীরের সকল পানির এলাকা হুরমুজের কব্জায় চলে গেছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু সামনে আরো এগিয়ে গিয়ে এমন এক স্থানে ছাউনি ফেলার নির্দেশ দেন যার আশে পাশের কোথাও পানির ছিটা ফোঁটা ছিল না। সৈন্যরা সেখানে ছাউনি ফেললেও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কে অবহিত করা হয় যে, সৈন্যদের মাঝে মৃদু এ গুঞ্জন উঠছে যে, এমন এক স্থানে ছাউনি ফেলা হয়েছে যার আশে পাশে কোথাও পানির নাম-গন্ধ পর্যন্ত নেই।
“আমি ভেবে চিন্তে এখানে ছাউনি ফেলেছি”– হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “সৈন্যদের জানিয়ে দাও যে, শত্রুরা পানি কব্জা করে ফেললেও তাতে পেরেশানীর কিছু নেই। আমাদের প্রথম লড়াই পানি উদ্ধারের জন্যই হবে। পানি সেই পাবে, যে জীবন বাজি রেখে লড়াই করবে। তোমরা দুশমনের কবল থেকে পানি ছিনিয়ে নিতে পারলে বুঝবে যুদ্ধ তোমরাই জিতে নিয়েছ।”
