মুসলমানদের জন্য পুনরায় কাজিমা যাওয়া এত কঠিন ছিল না, যত কঠিন ছিল হুরমুজ বাহিনীর জন্য। মুসলমানদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ উট ঘোড়া ছিল। সৈন্যরাও সকলে হাল্কা-পাতলা অস্ত্রধারী ছিল। তারা অতি সহজে দ্রুত চলতে পারত। পক্ষান্তরে ইরানী সৈন্যরা বর্ম এবং অস্ত্র-শস্ত্রে ঠাসা ছিল। যার ফলে দ্রুত চলা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেনা। তারপরও মাত্র একদিন পূর্বে তারা কাজিমা হতে হাফীরা এসেছিল সে সফরের ক্লান্তি কাটিয়ে না উঠতেই তাদের আবার কাজিমার উদ্দেশ্যে মার্চ করতে হয়। তাও আবার অতি দ্রুত। কেননা মুসলমানদের সেখানে পৌঁছার পূর্বেই তারা পৌঁছতে চায়। ফলে সৈন্যরা পথিমধ্যেই দারুণ হাফিয়ে ওঠে। ক্লান্তিতে ভেঙ্গে যেতে থাকে তাদের শরীর। হুরমুজের বাহিনী কাজিমায় যখন মুসলমানদের মোকাবিলায় পৌঁছে তখন তাদের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। মুসলিম সৈন্যরা মরুযুদ্ধ এবং মরুভূমিতে চলাফেরা করায় অভ্যস্ত ছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু শত্রুদের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সময় দেন না। শত্রুরা কাজিমায় পৌঁছতেই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে পুরোপুরি যুদ্ধ সাজে বিন্যস্ত করে ফেলেন। তিনি পুরো বাহিনীকে তিন অংশে বিভক্ত করে নিজে মধ্যম বাহিনীতে থাকেন। ডান এবং বাম বাহিনীর নেতৃত্বে থাকেন যথাক্রমে হযরত আছেম বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং হযরত আদী বিন হাতেম রাযিয়াল্লাহু আনহু। হযরত কা’কা’ বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সহোদর ছিলেন হযরত আলী বিন হাতেম রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি গোত্রের সর্দার ছিলেন। তিনি বড় উঁচু লম্বা এবং বলিষ্ঠ শরীরের বীর বাহাদুর ছিলেন।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সৈন্য বিন্যস্ত করতে দেখে হুরমুজও তার বাহিনীকে তিন অংশে বিভক্ত করে। মধ্যম বাহিনীতে সে নিজে থাকে। অপর দু’ অংশের নেতৃত্বে থাকে কুববাজ এবং আনুশযান নামক শাহী খান্দানের দুই ব্যক্তি। হুরমুজ ঠিকই দেখে যে, তার ফৌজ ঘামে নেয়ে যাচ্ছে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত বইছে। তাদের রেষ্টের খুব প্রয়োজন। কিন্তু মুসলমানরা যুদ্ধ প্রস্তুতিতে থাকায় বাধ্য হয়ে তাকেও সৈন্য বিন্যস্ত করতে হয়। হুরমুজ তার বাহিনীকে এমনভাবে বিন্যস্ত করে যে, কাজিমা শহর তার ফৌজের পশ্চাতে এসে যায়। তাদের সামনে ধু ধু মরুভূমি ছিল। আর আরেক দিকে ঘন ঝোঁপ-ঝাড়পূর্ণ টিলা বিশিষ্ট সারি সারি পাহাড় ছিল।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু স্বীয় বাহিনীকে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে যায় যে, পাহাড়ের সারিগুলো সব তাঁর বাহিনীর পশ্চাতে চলে যায়।
৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ। এ সময়ে প্রথমবারের মত মুসলমানরা অগ্নিপূজক ইরানীদের মোকাবিলা করে।
“খালিদ বিন ওলীদ মারা গেলে এ যুদ্ধ কোনরূপ সংঘর্ষ ছাড়াই শেষ হতে পারে” হুরমুজের এক সেনাপতি তাকে বলে। মুসলমানরা অনেক দূর থেকে এসেছে। সেনাপতির মৃত্যুর পর বেশিক্ষণ তারা আমাদের মোকাবেলায় টিকে থাকতে পারবে না।”
“সৈন্যদেরকে জিঞ্জিরে আবদ্ধ হতে বল” হুমুজ সালারকে বলে ‘আমি তাদের সেনাপতির ব্যবস্থা করছি। সর্বাগ্রে সেই নিহত হবে।” এর পর সে সালারকে পাঠিয়ে বডিগার্ড বাহিনীকে ডেকে পাঠায় এবং তাদেরকে কিছু নির্দেশনা দেয়। জিঞ্জিরে আবদ্ধ হওয়ার উদ্দেশ্য এই ছিল যে, পাঁচ পাঁচজন বা দশ দশজন করে ইরানী সৈন্যরা একটি লম্বা শিকলে নিজেদের আবদ্ধ করত। তবে প্রতি দু’জনের মাঝখানে এতটুকু দূরত্ব থাকত, যাতে সৈন্যটি ইচ্ছামত নিজেকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে লড়াই করতে পারে। শিকল বাঁধার একটি লাভ এই ছিল যে, কোন সৈন্য রণাঙ্গনে থেকে পালাতে পারত না। আরেকটি ফায়দা ছিল, শত্রুপক্ষের অশ্বারোহী তাদের উপর চড়াও হলে তারা শিকল জমিন থেকে উঁচু করে ধরত। যার ফলে ঘোড়া শিকলে বেঁধে পড়ে যেত। কিন্তু শিকল বাঁধার একটি বড় ক্ষতি এই ছিল যে, শৃঙ্খলিত সৈন্যদের কেউ নিহত বা আহত হলে বাকী সবাই বিরাট সমস্যায় পড়ত। তখন মারা যাওয়া ছাড়া আর কোন গত্যন্তর থাকত না। সহজে শত্রুপক্ষ তাদের প্রাণ হরণ করতে পারত।
ইরান সৈন্যরা এভাবে ব্যাপকভাবে নিজেদেরকে শিকলে আবদ্ধ করে নেয়ায় হুরমুজ বাহিনী বনাম হযরত খালিদ বাহিনীর মাঝে সংঘটিত এ যুদ্ধের নাম হয়ে যায় জলে সালাসীল বা ‘শিকলযুদ্ধ’।
মুসলিম বাহিনী ইরানীদেরকে এভাবে শৃঙ্খলিত হতে দেখে বিস্মিত হয়ে ওঠে। এক ব্যক্তি জোরে চিৎকার করে বলে “দেখ দেখ, ইরানীরা আমাদের জন্য নিজেদেরকে বাঁধছে।
‘বিজয় আমাদেরই হবে ইনশাআল্লাহ’ হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উচ্চকণ্ঠে বলেন– “আল্লাহ তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু যে উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে কাজিমা থেকে হাফিরা এবং আবার হাফীরা থেকে কাজিমায় আসেন তা পদে পদে বাস্তবায়িত হতে দেখেন। ভারী অস্ত্রে বোঝাই হুরমুজ বাহিনী লড়াই শুরু হওয়ার পূর্বেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে বিশ্রাম নেয়ার সুযোগ দেননা। তদুপরি ইরানীরা নিজেদেরকে শিকলে আবদ্ধ করে নেয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইতোমধ্যেই সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি শত্রুর বিরুদ্ধে কি চাল চালবেন এবং ইরানীদের কিভাবে লড়াবেন।
