“বের হয়ে যাও এই দরবার থেকে”–হুরমুজ ক্রোধকম্পিত উচ্চস্বরে বলে “তোমার সেনাপতিকে বলবে, রণাঙ্গনে আমার শক্তির পরীক্ষা নিতে।”
হুরমুজের বর্শাধারী সভাষদরা হুরমুজের ইশারায় থেমে গিয়েছিল। দূতের মুহাফিজরা তলোয়ার কোষে চালান দেয়। দূত পিছন দিকে ঘুরে দাড়ায় এবং দ্রুত কদমে দরবার ছেড়ে বেরিয়ে আসে। দুই মুহাফিজ তার পিছু পিছু চলতে থাকে।
দূত চলে গেলে হুরমুজ মুষ্টিবদ্ধ হাত খোলে। সেখানে তখনও হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া পত্র ছিল। পত্রটি একটি পাতলা চামড়ায় লিখিত থাকায় হাতের মুঠো খুলতেই পত্রটি সোজা হয়ে আবার সামনে ভেসে ওঠে। হুরমুজ পত্রটি পারস্য সম্রাট উরদুশাহের বরাবর এই সংবাদ যোগ করে প্রেরণ করে যে, সে মুসলমানদের মোকাবিলার জন্য এ মুহুর্তেই সীমান্ত এলাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সীমান্তের অদুরেই সে মুসলমানদের খতম করে আসবে।
“হুরমুজের জয় হোক”–তার এক মন্ত্রী বলে, “যে শত্রু আপনি সীমান্তের বাইরে খতম করতে চান তারা পূর্ব হতেই সীমান্তের মধ্যে অবস্থানরত।” হুরমুজ প্রশ্ন বোধক দৃষ্টিতে মন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে তার কথার ব্যাখ্যা জানতে চায়। “তারা হচ্ছে আরব মুসলমান।” মন্ত্রী তার কথার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে দজলা এবং ফোরাতের মিলন মোহনায় তারা অবস্থান করে। উপকূলীয় এ এলাকাটি উবলা পর্যন্ত এগিয়ে গেছে। তারা অনেক পূর্ব হতেই ইরান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। মদীনাবাসীরা আমাদের উপর আক্রমণ করলে এ অঞ্চলের মুসলমানরা নিশ্চিতভাবে তাদের সাথে গিয়ে মিলিত হবে।”
“অভয় দিলে আমি একটি কথা পেশ করতে চাই” প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলে–“কয়েকদিন ধরে লাগাতার খবর আসছে যে, যুদ্ধসক্ষম অর্থাৎ যুবক শ্রেণীর মুসলমানরা নিজ নিজ এলাকা হতে কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমার বিশ্বাস তারা মুসান্না বিন হারেছার সাথে গিয়েই মিলিত হচ্ছে। এ থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, তারা এখন ফৌজরূপে সুসংগঠিত হচ্ছে।”
“উধাও হয়ে যাওয়ার এই ধারাবাহিকতা বন্ধ করতে আপনি কোন পদক্ষেপ নেননি?” হুরমুজ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞাসা করে।
“সেনা বহর নিয়মিত টহল দিচ্ছে এবং কড়া নজরদারী করছে” প্রতিরক্ষামন্ত্রী জবাব দেয়।
“তারপরেও মুসলমানরা উধাও হয়ে যাচ্ছে?” হুরমুজ তাচ্ছিল্য ভরা ক্রোধ কণ্ঠে বলে “সীমান্তবর্তী চৌকিতে এখনই নির্দেশ পাঠাও, যেন তারা মুসলিম বসতিতে গেরিলা হামলা চালাতে থাকে। প্রত্যেকটি বসতির সমস্ত লোককে বাইরে বের করে দেখ, কতজন অনুপস্থিত এবং কতদিন ধরে অনুপস্থিত। যে পরিবার ও ঘরের লোক অনুপস্থিত পাবে তা জ্বালিয়ে দিবে। কোন মুসলমানকে সীমান্তের দিকে যেতে দেখলে তাকে বন্দী করে হত্যা করে ফেলবে। দূর হতে তীর নিক্ষেপ করবে।”
সীমান্তের গা ঘেঁষে একটি মুসলিম বসতি ছিল। কয়েকজন ইরানী সৈন্য সেখানে গিয়ে ঘোষণা করে যে, ছোট্ট শিশু থেকে নিয়ে অশীতিপর বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই যেন বাইরে বেরিয়ে আসে। সৈন্যরা ঘরে ঘরে ঢুকে টেনে হিঁছড়ে লোকদের বাইরে বের করতে থাকে। মহিলাদের এক স্থানে আর পুরুষদেরকে আরেক স্থানে দাঁড় করানো হয়। সৈন্যদের মেজাজ ছিল রুক্ষ্ম এবং মূর্তি ছিল উগ্র। তারা কথায় কথায় বিশ্রি ভাষায় গালি দিচ্ছিল এবং ধাক্কা মেরে মেরে মানুষ এদিক ওদিক নিচ্ছিল। তারা বারবার এ কথা বলছিল যে, অত্র এলাকার যারা যারা অনুপস্থিত তাদের নাম বল এবং বাড়ী-ঘর দেখিয়ে দাও। সমস্ত জনতা নিরব নিশ্চুপ। কেউ মুখ খোলে না।
“জবাব দাও। বল কে কে নেই” ইরানী কমান্ডার রাগে গরগর করতে করতে চিল্লাতে থাকে।
কোন জবাব আসেনা। কমান্ডার এগিয়ে গিয়ে এক বৃদ্ধ লোকের ঘাড় ধরে নিজের দিকে টেনে এনে জিজ্ঞাসা করে যে, বল্ এই জনতার মাঝে কে কে অনুপস্থিত।
“আমার জানা নেই” বৃদ্ধ জবাব দেয়।
কমান্ডার খাপ থেকে তরবারী বের করে বৃদ্ধের পেটে আমূল বসিয়ে দেয় এবং ঝটকা দিয়ে তরবারী বের করে আনে। বৃদ্ধ দুই হাত পিঠে রেখে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কমান্ডার আরেকবার জনতার দিকে চায়। সহসা এক প্রান্ত হতে ৮/১০ টি ঘোড়া ছুটে আসে। প্রত্যেক আরোহীর হাতে বর্শা ছিল। তারা এত দ্রুত এসে উপস্থিত হয় যে, ইরানী বাহিনী ঠিকমত তাদের দেখতেও পায়না। অথচ এরই মধ্যে তাদের অধিকাংশের শরীর বর্শাবিদ্ধ করে অশ্বারোহীরা যে গতিতে আসে সে গতিতে বেরিয়ে যায়। ইরানীদের সংখ্যা ৪০ /৫০ জন ছিল। তাদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ৮/১০ জন মাটিতে লুটিয়ে ছট ফট করছিল।
ছুটন্ত অশ্বের খুরধ্বনি শোনা যেতে থাকে, যা ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে আবার নিকটে আসতে থাকে। এবার ফৌজের লোকেরা বর্শা এবং তলোয়ার নিয়ে প্রস্তুত হয়ে অশ্বারোহীদের পথের দিকে চেয়ে থাকে। কিন্তু আচমকা পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। বসতির লোকেরা পশ্চাৎ হতে এক যোগে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। কল্পনাতীত এ অতর্কিত আক্রমণ হতে এক মাত্র তারাই জিন্দা থাকে, যারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। অতর্কিত আক্রমণকারী আগন্তুকরা যখন আবার ফিরে জনতার কাছে আসে তখন তাদের বাধ্য হয়ে ঘোড়া থামাতে হয়। কারণ উপস্থিত জনতা ইরানীদের খতম করতে করতে তাদের সামনে এসে পড়ে।
