মুসলমানদের পক্ষে এলাকা ছেড়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ যরথুস্ত্রের সেনারা মুসলিম বসতিগুলোর উপর কড়া নজর রাখত। তাদের বিশ্বাস ছিল, বিভিন্ন চৌকিতে গেরিলা হামলার পশ্চাতে অবশ্যই মুসলমানদের হাত আছে। এখন সেই সাথে আবার যোগ হয় হেড কোয়ার্টার থেকে আগত নতুন নির্দেশ। এই নির্দেশদাতা ছিল ইরাক প্রদেশের শাসনকর্তা হুরমুজ।
হুরমুজের এই নয়া নির্দেশের পশ্চাতে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দূত ছিল অন্যতম কারণ। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হুরমুজের উদ্দেশে এক পত্র লিখে দূত মারফত পাঠিয়ে দেন। দূত যথাসময়ে পত্র নিয়ে পৌঁছে। দূত এখন ইরান সাম্রাজ্যের এক প্রাদেশিক শাসনকর্তার দরবারে। হুরমুজকে যখন জানানো হয় যে, মদীনার সেনাপতি হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দূত এসেছে; সে আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী, তখন হুরমুজের চেহারায় ঘৃণা ও তুচ্ছতার ছাঁপ ফুটে ওঠে।
“কোন মুসলমানের চেহারা আমি দেখতে চাই না” হুরমুজ বলে–“কিন্তু আমি জানতে চাই তার আসার উদ্দেশ্য কী?
“যরথুস্ত্রের কসম!” এক মন্ত্রী দাড়িয়ে হুরমুজকে বলে–“খালিদের দূত নিশ্চয় এমন কোন পয়গাম নিয়ে এসেছে, যা তার মৃত্যুর পয়গাম হিসেবেই বিবেচিত হবে।”
“তাকে ভিতরে নিয়ে এসো”– হুরমুজ বলে।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দূত দুই সশস্ত্র দেহরক্ষীর সাথে অত্যন্ত দ্রুতবেগে হুরমুজের দরবারে প্রবেশ করে এবং সোজা হুরমুজের দিকে এগিয়ে যায়। দুই বর্শাধারী এসে তার পথরোধ করে দাঁড়ায়। কিন্তু দূত তাদের এড়িয়ে হুরমুজের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
“আসসালামু আলাইকুম!” দূত বলে–“অগ্নি পূজারী হুরমুজকে মদীনার সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওলীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সালাম। আমি তাঁর এক পত্র নিয়ে এসেছি” “আমরা ঐ সেনাপতির সালাম গ্রহণ করব না যার দূতের মাঝে আমাদের প্রভাব প্রতিপত্তি অনুধাবনের যোগ্যতা পর্যন্ত নেই” হুরমুজ তাচ্ছিল্যভরে বলে”– মদীনায় কি সব জংলী আর গোঁয়ার বসবাস করে? তোমাকে আসার সময় কেউ বলে দেয়নি যে তুমি এক শাহী দরবারে যাচ্ছ? দরবারের ভদ্রতা ও রীতি-নীতি তোমাকে শিক্ষা দেয়া হয়নি?”
“মুসলমান একমাত্র আল্লাহর দরবারের শিষ্টাচার সম্বন্ধে অবহিত হয়।” দূত অসীম সাহসে মাথা আরেকটু উঁচু করে বলে “ইসলামের দৃষ্টিতে তার কোনই মর্যাদা নেই যে মানুষের মাঝে দরবারের প্রভাব সৃষ্টি করতে চায়। আমি আপনার দরবারী (আমত্য) নই। আমি ঐ সেনাপতির দূত যাকে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আল্লাহর তরবারী আখ্যা দিয়েছেন’।
“হুরমুজের সামনে ঐ তরবারি ভোঁতা হয়ে যাবে” হুরমুজ খোদাদ্রোহীর ভঙ্গিতে বলে এবং হাত বাড়িয়ে দিয়ে নির্দেশের সুরে বলে “দাও, দেখি তোমাদের আল্লাহর তরবারি কি লিখে পাঠিয়েছে?”
দূত তার বাড়িয়ে দেয়া হাতে পত্র উঠিয়ে দিলে হুরমুজ এমনভাবে পড়তে থাকে যেন তামাশা বশত সে হাতে একটি কাগজ নিয়েছে। পত্র পড়ে সে পত্রটি মুঠোর মধ্যে এমনভাবে দলা মোচড় করে, যেন এটা একটি ময়লা আবর্জনা যাকে সে এখনি ছুড়ে ফেলবে।
“পোকা মাকড় কি এই স্বপ্নে বিভোর যে, সে একপাহাড়ী ভূমির সাথে টক্কর লাগাতে পারবে?” হুরমুজ বলে–“মদীনাবাসীদের কেউ জানায়নি যে, হিরাক্লিয়াসের মত মানুষও ঐ পাহাড়ে মাথা ঠুকে কেবল নিজের মাথাই ক্ষত বিক্ষত করেছে? আমাদের সৈন্যদের এক ঝলক তোমাদের দেখিয়ে দিব, যাতে তোমরা সেনাপতি এবং বৃদ্ধ খলীফাকে গিয়ে বলতে পার যে, তারা যেন ইরাকের সীমান্ত এলাকার প্রতি চোখ তুলে তাকাবারও সাহস না করে।”
“সেনাপতি আমাকে শুধু এ নির্দেশ দিয়েছেন যে, আমি আপনার বরাবর পত্র হস্তান্তর করে তার জবাব নিয়ে আসব” দূত বলে “আমি আপনার কোন কথার জবাব দিতে পারি না। কারণ, আমাকে এ ব্যাপারে কোন নির্দেশ দেয়া হয় নি।” “তোমাদের মত দূতের সাথে আমরা এ আচরণ করি যে, তাকে বন্দীশালায় নিক্ষেপ করি”, হুরমুজ বলে–“আমাদের মনে দয়ার উদ্রেক হলে তাকে কয়েদখানার নির্যাতন থেকে বাঁচাতে জল্লাদের হাতে তুলে দিই।”
“আমার প্রাণ আমার আল্লাহর হাতে” দূত পূর্বের চেয়েও অধিক সাহসিকতার সাথে বলে “আপনি মুসলমান হলে জানতেন একজন অতিথির সাথে কেমন ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু একজন নাস্তিক এবং অগ্নিপূজারির থেকে এর বেশী আশা করা যায় না। আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিন। কিন্তু মনে রাখবেন, মুসলমানরা আমার এবং আমার নিরাপত্তা কর্মীদের রক্তের প্রতিটি ফোটার প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়বে।”
হুরমুজ সহসা সোজা হয়ে বসে। রাগে তার চোখ লাল হয়ে যায়। রাগের এই চিহ্ন তার মুখাবয়ব ছেঁপে যায়। মনে হয় এখনই সে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর এই দূতকে কাঁচা চিবিয়ে খাবে।
“আমার দরবার থেকে তাকে বের করে দাও” হুরমুজ গর্জে ওঠে বলে। বর্শা ধারী চার পাঁচ সভাষদ দ্রুত সামনে অগ্রসর হয়। দূতের দুই মুহাফিজও চোখের পলকে তলোয়ার কোষমুক্ত করে। ইতোপূর্বে তারা দূতের পশ্চাতে দাঁড়িয়ে ছিল। এখন তারা দূতের দুই পাশে এমনভাবে পজিশন নিয়ে দাঁড়ায় যে, তাদের পিঠ দূতের দিকে ছিল। “হুরমুজ!” দূত গম্ভীর কণ্ঠে বলে–“বীর ময়দানে যুদ্ধ করে। শক্তির দাপট নিজ দরবারে দেখাবেন না। আমার সেনাপতির কাঙ্ক্ষিত জবাব আমি পেয়ে গেছি। আমাদের কোন প্রস্তাব আপনি গ্রহণ করেননি। এটাই কি আপনার জবাব?”
