“ইসলামের কাণ্ডারীগণ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু উপর থেকে চিৎকার করে জানাল ‘আল্লাহর সাহায্য আসছে।… সামনে এগিয়ে যাও। তাদের অভ্যর্থনা জানাও। খোঁজ নাও তারা কারা।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এক প্রকার ছুটে নীচে চলে আসেন। ঘোড়ায় চেপে বসে বাতাসের বেগে বসতি এলাকা থেকে বেরিয়ে যান। ওদিকে আগন্তুক বাহিনীও বসতির কিছু দূরে এসে থেমে যায়। সেখান থেকে দুটি ঘোড়া সামনে অগ্রসর হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ততক্ষণ তাদের পর্যন্ত পৌঁছে যান এবং সামনে দু’অশ্বারোহীকে দেখে ঘোড়া হতে নেমে আসেন। অপর অশ্বারোহীয়ও নেমে আসে। তারা মুজার এবং রবীয়া গোত্রের নেতা ছিল।
“মদীনা থেকে খবর আসে আপনার সাহায্যের খুব প্রয়োজন।” –হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে চিনতে পেরে এক নেতা তাকে বলে–“আমি চার হাজার সৈন্য এনেছি। তাদের মাঝে উষ্ট্রারোহী, অশ্বারোহী এবং পদাতিকও আছে।”
“আর চার হাজার সৈন্য আমার গোত্রের আছে”–অপর নেতা জানায়।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু আনন্দের আতিশয্যে উভয়কে বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করেন এবং প্রচণ্ড খুশীতে কম্পিত কণ্ঠে বলেন “আল্লাহর কসম। তিনি কখনো আমাকে নিরাশ করেননি।”
***
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অধীনে এখন দশ হাজারের এক বিশাল বাহিনী। তিনি মুজার এবং রবীয়া গোত্রপতিকে উত্তমরূপে বুঝিয়ে দেন যে, তাদের গন্তব্য কোথায় এবং শত্রু কেমন শক্তিধর।
“আমরা আপনার সাহায্যার্থে এসেছি জনাব খালিদ!” এক নেতা বলেন “আমাদের মঞ্জিল তথায় যেখানে আপনি যেতে চান।”
মদীনা হতে আমাদের এটাও জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, “সম্মিলিত সৈন্যের আমীর আপনি”–অপর নেতা বলেন, “অতএব যেখানেই যেতে বলবেন সেখানেই আমরা যাব। শত্রু যেমনই হোক না কেন লড়ব।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরান সাম্রাজ্যের এক গভর্নর–হুরমুজের নামে একটি পত্র লেখেন। তৎকালে ইরাক ইরান সাম্রাজ্যেরই একটি প্রদেশ ছিল। তার গভর্নর বা প্রশাসক ছিল হুরমুজ। বর্তমান কালের জেলা প্রশাসকের মত অবস্থান ও ক্ষমতা ছিল তার। ইতোপূর্বেও তার সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোচনা হয়েছে। সে বড়ই জঘন্য প্রকৃতির, মিথ্যাবাদী এবং ধোঁকাবাজ ছিল। অভদ্রতার ক্ষেত্রে তার নাম প্রবাদবাক্য স্বরূপ ব্যবহৃত হত।
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তার নামে নিম্নোক্ত ভাষায় পত্র লিখেন :
আপনি ইসলাম গ্রহণ করে নিলে নিরাপদে থাকবেন। এতে সম্মত না হলে আপনার শাসনাধীন এলাকা ইসলামী রাষ্ট্রের আওতাভুক্ত করে দিন। এর প্রশাসক আপনিই থাকবেন। ইসলামী খেলাফতের রাজধানী মদীনাতে নির্ধারিত কিছু কর প্রেরণ করবেন। এর বিনিময়ে আমরা আপনার জনগণ এবং এলাকার শান্তি স্থিতিশীলতা ও প্রতিরক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিব। এটাও মানতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলে তখন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনার নিজের কাঁধেই থাকবে। আল্লাহই ভাল জানেন আপনার পরিণতি কি হবে। জয়-পরাজয় আল্লাহর হাতে; কিন্তু আমি আপনাকে এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া জরুরী মনে করছি যে, আমরা ঐ জাতি যাদের কাছে মৃত্যু ততধিক প্রিয় যেমন বেঁচে থাকা আপনাদের কাছে প্রিয় … আমি আল্লাহর পয়গাম আপনার পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পত্রটি এক দূতের হাতে দিয়ে বলেন, দু‘মুহাফিজ সাথে নিয়ে দ্রুত রওয়ানা হয়ে যাও এবং পত্রটি হুরমুজকে হস্তান্তর করে তার জবাব নিয়ে আসবে।
“তোমার প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আমি ইয়ামামায় বসে থাকবো না।” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দূতকে বলেন, “ইরাকের সীমান্তবর্তী এলাকার কোথাও আমাকে খুঁজবে। উবলা নামটি মনে রাখবে। সেখানে গেলে তুমি আমার ঠিকানা পেয়ে যাবে।”
দূত রওয়ানা হয়ে যাবার পর হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ১০ হাজার বাহিনীকেও মার্চ করার নির্দেশ দিলেন।*
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর জানা ছিলনা যে, তার জন্য আল্লাহর আরো সাহায্য অপেক্ষমাণ। আমীরুল মু’মিনীন হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু উত্তর-পূর্ব আরব এলাকায় বসবাসরত তিন গোত্রের প্রধান মাজউর বিন আদী, হুরমুলা এবং সুলামা–বরাবর পত্র প্রেরণ করেন যে, নিজ নিজ গোত্রের অধিক সংখ্যক যোদ্ধাদেরকে মুসান্না বিন হারেছার কাছে নিয়ে যাও। এ সমস্ত লোক যেন যুদ্ধ-অভিজ্ঞ এবং বীর বাহাদুর হয়। তাদেরকে এ কথাও জানিয়ে দেয়া হয় যে, হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ফৌজ নিয়ে আসছে। সেই হবে সকল বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।
উবলা সহ ইরানের শাসনাধীন অন্যান্য আরব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার চিত্র কিছুটা ভিন্নতর ছিল। প্রথমদিকে মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু অত্র এলাকার কতক আগ্রহী যুবককে ইরানী সেনাচৌকি এবং ফৌজ কাফেলায় গুপ্ত হামলা চালাবার জন্য নিজের সাথে রেখেছিলেন। কিন্তু এখন তার প্রয়োজন পড়ে ঐ এলাকা হতে একটি বাহিনী তৈরি করার। কিছু সৈন্য তিনি নিজ গোত্র বকর ইবনে ওয়ায়েল থেকে সংগ্রহ করেন। এ সকল সৈন্য হযরত আলী ইবনে হাজরনী রাযিয়াল্লাহু আনহু নামক মদীনার এক সেনাপতির কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ইরাকের সীমান্তবর্তী এলাকায় মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু আরো সৈন্য সংগ্রহ করতে ইরান সাম্রাজ্যের অন্তর্গত মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে এক গোপন বার্তায় জানান যে, যুবক শ্রেণীর মধ্য হতে যারা ইরানীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুর্গম আস্তানায় আসতে পারে তারা যেন শীঘ্রই চলে আসে।
