এই দু’হাজার মুজাহিদকে কোনরূপ ওয়াজ কিংবা উত্তেজিত করার প্রয়োজন ছিল না। তারা প্রথম থেকেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে ছিল। তাদের অধিকাংশই এমন ছিল যে, তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নেতৃত্বে বিভিন্ন যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের পর তাদের মধ্যে এই ভাবধারা কাজ করে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্রাত্মা এখনও তাদের নেতৃত্ব দিয়ে চলছে।
রাসূল প্রেমে দিওয়ানা এই সৈন্যরা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অনুমতিক্রমে এক নয়া কৌশল অবলম্বন করে। তারা ঘোড়ায় চেপে ইয়ামামার আশে-পাশের অঞ্চলে বেরিয়ে পড়ে এবং বসতিতে গিয়ে গিয়ে অশ্বারোহণের বিভিন্ন কৌশলী মহড়ার প্রদর্শন করে ফেরে। ছুটন্ত ঘোড়া হতে নামা এবং খানিক পর আবার তার পিঠে সওয়ার হওয়া, ধাবমান ঘোড়ার পিঠে বসেই নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে তীর নিক্ষেপ, বর্শা নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা, ছুটন্ত ঘোড়ায় থেকে অস্ত্রচালনা মহড়ার অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল। এভাবে মানুষদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তারা যুবক শ্রেণীকে ফৌজে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করত এবং জিহাদের ফযিলত ও লাভ সম্পর্কে তাদের জানাত।
সাথে সাথে তারা তাদেরকে এ ব্যাপারেও সতর্ক করত যে, যদি তারা মুসলিম ফৌজে ভর্তি না হয় তবে ইরানীরা এসে তাদের গোলামে পরিণত করবে। তাদের থেকে অক্লান্ত পরিশ্রম নিবে কিন্তু বিনিময়ে দেবেনা কিছুই। উপরন্তু তাদের বোন, কন্যা এবং স্ত্রীদেরকে ভোগের সামগ্রিতে পরিণত করবে। এই অঞ্চলের লোকদের তিন শাসনামলের তিক্ত অভিজ্ঞতা ছিল। তারা ইরানীদের শাসনামল দেখেছিল। ভণ্ড নবীর ভেল্কিবাজিও তাদের সামনে ছিল। বর্তমানে তারা মুসলমানদের শাসনাধীন। মুসলমানরা অত্র এলাকা করায়ত্ত করে তাদের গোলাম বানায়নি। জনগণ গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করে যে, মুসলমানদের চাল-চলন, আচরণ ও শাসন রাজা-বাদশাহ কিংবা দুনিয়ার অন্যান্য শাসকদের মত নয়। ক্ষমতাধর হয়েও তারা সাধারণ জীবন-যাপন করে। সকলের সাথে মিলেমিশে থাকে। সবার কথা শুনে এবং সবার সাথে কথা বলে। তাদের নারী জাতির ইজ্জত-সম্ভ্রম সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল।
ইয়ামামার জনতার মাঝে কিছু লোক এমনও ছিল যারা ইতোপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিল কিন্তু মুসাইলামা ভেল্কিবাজি দেখিয়ে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে ফেলেছিল। ফলে ভণ্ড নবীর খপ্পরে পড়ে তারা ইসলাম থেকে সরে গিয়েছিল। মুসলমানদের হাতে মুসাইলামার নবুওয়াতের ভণ্ডামী উন্মোচিত হতে তারা দেখেছিল। মুসাইলামার বিশাল সমরশক্তি স্বল্প সংখ্যক মুসলমানের বীরত্বের সামনে চূর্ণ-বিচূর্ণ হওয়ার দৃশ্য তাদের সামনে ছিল। মুসাইলামার পরাজয় তাদের অন্তর্চক্ষু খুলে দিয়েছিল। তাদের অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস জমেছিল যে, যারা সংখ্যায় স্বল্প হয়েও এত বিশাল বাহিনীকে পরাজিত করতে পারে তারা নিশ্চয়ই সত্যপন্থী এবং সঠিক আদর্শবাদী হবে। তারা আরো বিশ্বাস করে যে, যে অদৃশ্য শক্তি সত্যকে মিথ্যার উপর এবং হককে বাতিলের উপর বিজয়ী করে তা একমাত্র ইসলামেই নিহিত। ফলে তারা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর ফৌজে নাম লিখাতে থাকে। এটা মুজাহিদদের মেহনত আর চেষ্টার ফসল ছিল।
***
ইয়ামামায় হঠাৎ শোরগোল পড়ে যায়। কিছু লোক উর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে বসতি এলাকার বাইরে চলে যায়। মহিলারা নিজ নিজ ঘরের ছাদে গিয়ে আশ্রয় নেয়। দূরের খোলা আকাশে ধুলোর মেঘমালা উড়ছিল। জমিন হতে উৎক্ষিপ্ত ধুলো ক্রমশ ঊর্ধ্বপানে উঠছিল এবং অতি দ্রুত ইয়ামামার দিকে অগ্রসর হচ্ছিল।
“ধূলিঝড় আসছে।”
“সৈন্য তারা… কোন সেনাবাহিনী আসছে”
“সাবধান!…হুসিয়ার!!…প্রস্তুত হও।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য কেল্লা সদৃশ একটি ভবনে ওঠেন। গভীর নিরীক্ষণের পর তিনি নিশ্চিত হন যে, এটা কোন মরুঝড় নয়; বরং সশস্ত্র সেনাফৌজ। মুরতাদ শ্রেণী ছাড়া অন্য কারও সৈন্য হতে পারে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর আফসুস হতে থাকে যে, তিনি কেন তার সৈন্যদের ঘরে ফিরে যাবার ইখতিয়ার দিলেন। উড়ন্ত ধূলিমেঘ স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, এক বিশাল বাহিনীই ইয়ামামা পানে ধেয়ে আসছে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর অধীনে মাত্র দুই হাজার সৈন্য কিংবা সর্বোচ্চ ঐ সৈন্যরা ছিল যারা সবেমাত্র ফৌজে যোগ দিয়েছে। তাদের উপর আস্থা রাখার মত এখনও তারা হয়ে উঠেছিল না। তাদের ব্যাপারে আশঙ্কা ছিল যে, অবস্থা প্রতিকূল দেখলে তারা শত্রুপক্ষের সাথে হাত মিলাতে পারে কিংবা নিজেরাই শক্ত হয়ে পশ্চাৎ হতে আক্রমণ করতে পারে।
“মুজাহিদগণ!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু কেল্লাসদৃশ ভবনের ছাদ হতে উচ্চস্বরে বলেন–“চুড়ান্ত পরীক্ষার সময় দ্বারপ্রান্তে। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ তোমাদের সহায় নেই।” এটুকু বলেই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নীরব হয়ে যান। কারণ ইতিমধ্যে তার কানে আগত বাহিনী হতে সমরসঙ্গীত ও ঢোলের আওয়াজ ভেসে আসে।
আক্রমণকারীরা কখনো যুদ্ধ-সঙ্গীত বাজাতে বাজাতে আসে না। সঙ্গীতের সুর ক্রমে উচ্চকিত হতে থাকে। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু দূরে দৃষ্টি ছুঁড়ে দেন। ধুলোও ততক্ষণে নিকটে এসে গিয়েছিল। ধুলোর চাদর ভেদ করে উট ঘোড়া দেখা যেতে থাকে। ধুলোর পর্দার অন্তরাল হতে আগত বাহিনী ‘নারায়ে তাকবীর’ দিচ্ছিল।
