আমীরুল মু’মিনীন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাহায্যে তৎক্ষণাৎ এক ব্যক্তি প্রেরণ করলেও এটাই সাহায্যের শেষ ছিল না। তিনি মুজার এবং রবীয়া নামক পার্শ্ববর্তী দু’গোত্রের উদ্দেশে এ মর্মে পত্র প্রেরণ করেন যে, তারা যেন হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে অধিকহারে সৈন্য সরবরাহ করে।
***
“মাত্র এক জন?” হযরত কা’কা’ বিন আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সমীপে পৌঁছলে খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজ তাবুতে রাগে পায়চারি করতে করতে বলেন “এক ব্যক্তি মাত্র?…আমীরুল মু’মিনীনকে তো আমি স্পষ্টভাষায় জানিয়েছি যে, আমার অধীনে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার সৈন্য রয়েছে। খেলাফতও আমার থেকে এই আশা রাখে যে, আপাদমস্তক বর্মাচ্ছাদিত ইরানী সৈন্যদের সাথে আমি সংঘর্ষে লিপ্ত হব।”
“শ্রদ্ধেয় সেনাপতি!” হযরত কা’কা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “৮ হাজার সৈন্যের স্থান আমি পুরো করতে না পারলেও অপূর্ণ রাখব না। সময় আসতে দিন। যে আল্লাহর রাসূলের কালেমা উচ্চারণ করি তার পবিত্রাত্মার সামনে আপনার মস্তক অবনত হতে দিব না।”
“ধন্যবাদ আরব রত্ন!” অনিন্দ্য সুন্দরী লায়লা হযরত কা’কা’ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর কাঁধে জোরে হাত রেখে বলেন “তুমি যে ধর্মের পূজারী তোমার মত নব যুবকরা তা কেয়ামত পর্যন্ত জিন্দা রাখবে।”
“খোদার কসম!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দ্বিতীয় স্ত্রী বিনতে মুযাআ অত্যন্ত আবেগের সাথে বলেন “এই নওজোয়ান ৮ হাজার সৈন্যের শূন্যতা পূরণ করতে পারে।”
“আমি ইয়ামামায় বসে থাকব না” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের মনের সাথে কথা বলার ভঙ্গিতে উচ্চারণ করতে থাকেন, “মুসান্না নিশ্চয়ই আমার পথ চেয়ে আছে। আমি তাকে নিঃসঙ্গ হতে দেব না। …” এটুকু বলেই তিনি চুপ করে যান এবং ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলেন “জগতের মালিক প্রভু ওগো! আমি তোমার নামে শপথ করছি স্বীয় নামের খাতিরে অন্তত আমাকে সাহায্য কর। আমাকে পাহাড়সম হিম্মত এবং দৃঢ়তা দান কর, যেন আমি ঐ আগুনে ঝাঁপ দিয়ে তাকে নির্বাপিত করতে পারি যরথুস্ত্রে যার ইবাদত করে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি ছাড়া ইবাদতের উপযুক্ত কেউ নেই এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার রাসূল।”
“জনাব খালিদ! আপনি সাহস হারিয়ে ফেলছেন?”–লায়লা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে ভেঙ্গে পড়তে দেখে বলেন–“আপনি কি বলতেন না যে, যারা আল্লাহর রাহে জিহাদ করে স্বয়ং আল্লাহ তাদের সাহায্য করেন?”
“আমি সাহস হারাব না”–হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু লায়লার সান্ত্বনার জবাবে বলেন– “কিন্তু কথা হলো, আমি পরাজিত হতে অভ্যস্থ নই।… আল্লাহ অবশ্যই সাহায্য করবেন। খোদার কসম! আমি সম্মান-মর্যাদা ও সুনাম-সুখ্যাতির আকাঙ্ক্ষী নই। ইরান সম্রাটের শাহী সিংহাসনও আমি চাইনা। আমি চাই আল্লাহর জমিন ইসলামের অধীনে চলে আসুক এবং আল্লাহর জমীনে বসবাসরত প্রত্যেকটি লোক আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এ বিশ্বাসী ও তাঁদের অনুগত হোক।
***
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পাশে রয়ে যাওয়া দু’হাজার সৈন্য ইয়ামামার একটি ময়দানে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে দণ্ডায়মান। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ঘোড়ার পিঠে আসীন।
“বীর মুজাহিদ সেনানীরা!”–হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু মুষ্টিমেয় সৈন্যদের উদ্দেশে তেজস্বীকণ্ঠে বলেন–“ইসলামের সুমহান বাণী দূর-দূরান্ত পৌঁছে দিতে আল্লাহপাক আমাদের নির্বাচন করেছেন। পরিবার-পরিজন এবং পার্থিব ধন-সম্পদ যাদের অতি প্রিয় তারা চলে গেছে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের কোন ক্ষোভ কিংবা অভিযোগ নেই। তারা বিভিন্ন রণাঙ্গনে জান বাজি দিয়ে আমাদের সাথে থেকে যুদ্ধ করেছে। এক দীর্ঘ সময় ধরে তারা আমাদের সঙ্গ দিয়েছে। আল্লাহ তাদেরকে যথাযথ পুরস্কৃত করুন।… তোমরা আমার সঙ্গ ছাড়নি। এই ত্যাগের বিনিময় আমি নই ; আল্লাহ নিজেই তোমাদের দিবেন। আমরা বড়ই পরাক্রমশালী শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চলেছি। আমাদের সংখ্যার স্বল্পতার দিকে তাকাবে না। বদরে তোমরা কতজন আর কুরাইশদের সংখ্যা কত ছিল? উহুদেও মুসলমানরা সংখ্যায় কম ছিল। আমি সে সময় শত্রু পক্ষের একজন ছিলাম। তোমাদের মাঝেও অনেক এমন আছে যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে বদর প্রান্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছিলে। তখন আমরা বড়ই আস্ফালন করে বলেছিলাম যে, আমরা এই মুষ্টিমেয় মুসলিম সৈন্যদেরকে ঘোড়ার পায়ের তলায় পিষে মারব। তোমাদের মনে নেই সেদিন সংখ্যায় যারা বেশী ছিল তারাই এক সময় স্বল্প সংখ্যক বাহিনীর হতে চরম মার খেয়ে পিছু হটে গিয়েছিল?… কেন এমন হয়েছিল?… কারণ ছিল একটাই, আর তা হলো মুসলমানরা হকের উপর ছিল; আর আল্লাহ হকপন্থীদের সাথে থাকেন। আজ তোমরা হকের ঝাণ্ডাবাহী।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাতে একটি কাগজ ছিল। তিনি এ সময়ে সেটি খুলে নিজের সামনে রাখেন।
আমীরুল মু’মিনীন আমাদের উদ্দেশে একটি পত্র লিখে পাঠিয়েছেন। তিনি লিখেছেন : “ইরানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য আমি খালিদ বিন ওলীদকে পাঠালাম। খেলাফতের পক্ষ হতে পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত তোমরা খালিদের নেতৃত্বে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবে। যে কোন পরিস্থিতিতে খালিদকে ছেড়ে যাবে না। শত্রু যতই শক্তিশালী হোক না কেন। কাপুরুষতা প্রদর্শন করবে না। তোমরা তো তারাই, যারা ঘরে ফেরার ইখতিয়ার পেয়েও ‘আল্লাহর তরবারী’–খালিদের সঙ্গ ছাড়নি। তোমরা সবকিছুর উপরে ঐ রাস্তা অবলম্বন করেছ যাকে আল্লাহর রাস্তা বলা হয়। কল্পনা কর ঐ বিরাট সওয়াবের কথা আল্লাহর রাহে জিহাদকারীরা যা প্রাপ্ত হয়। আল্লাহ তোমাদের সহায় ও সহায়ক হবেন। তোমাদের সৈন্য ঘাটতি তিনিই পূর্ণ করবেন। সকল অবস্থায় তাঁর সন্তুষ্টি ও সন্তোষ অর্জনে সচেষ্ট থাকবে।”
