॥ পাঁচ ॥
ইরাকের দজলা এবং ফোরাত নদীর মিলন মোহনার নিকটবর্তী উপকূলীয় অঞ্চলে মুসলমানদের আবাস ছিল। জুলুম এবং নির্যাতনের মধ্য দিয়ে তারা কালাতিপাত করত। এখন সেখানকার হালচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদেরকে পূর্বের মতই নির্যাতিত এবং চলাচলকারী লাশ বলেই মনে হত। কিন্তু ঘরে ঘরে তাদের শুরু হয়েছিল ব্যাপক তৎপরতা। তারা গোপনে তীর-ধনুক এবং বর্শা তৈরি করতে থাকে। মুসান্না বিন হারেছার পক্ষ হতে যে নির্দেশ তারা পেত তা কানে কানে সকলের পর্যন্ত পৌঁছে যেত। দিনে লুকিয়ে লুকিয়ে প্রতি ঘরে ঘরে যে তীর বর্শা তৈরি হত রাতের আঁধারে তা মরুভূমির দুর্গম অঞ্চলে মুসান্নার হেড কোয়ার্টারে পাচার করা হত। এলাকার যুবক শ্রেণীর লোকও উধাও হতে থাকে। ইরানীদের সীমান্তবর্তী চৌকিতে এবং তাদের সেনাবহরে মুসলমানদের গেরিলা হামলা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পায়। মুসলমানরা শত্রুদের অগোচরে নিয়মিত সেনারূপে সুসংগঠিত হচ্ছিল এবং দৈনন্দিন তাদের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
ইয়ামামায় হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাহিনীর অবস্থা ছিল এর সম্পূর্ণ উল্টো। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ামামায় গিয়ে সৈন্যদেরকে ঘরে ফেরার ইখতিয়ার দিলে ১০ হাজার সৈন্যের মধ্যে মাত্র ২ হাজার রয়ে যায়। আর বাকী ৮ হাজার সবাই সাধারণ অনুমতি পেয়ে স্বদেশের উদ্দেশে রওয়ানা হয়। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফার নামে পত্র লিখে পাঠান। তিনি পত্রে সমস্ত বৃত্তান্ত উল্লেখ করে লেখেন যে, এখন তার সাথে মাত্র ২ হাজার সৈন্য রয়েছে। তিনি বিশেষভাবে তাগাদা দিয়ে আরো লেখেন যে, অচিরেই তার সেনা সাহায্যের প্রয়োজন।
আমীরুল মু’মিনীন হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু নিজের আসনে উপবিষ্ট। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর দূত এসে হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কে তার প্রেরীত পত্র হস্তান্তর করেন। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু পত্র পেয়েই জোরে জোরে পড়তে শুরু করেন। উপস্থিত পরামর্শদাতা ও অন্যান্যদের বিষয়টি শুনানো এবং এ ব্যাপারে তাদের অভিমত জানাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
“আমীরুল মু’মিনীন।” পত্র পাঠ শেষ হলে এক পরামর্শদাতা বলেন–“খালিদের জন্য সেনা সাহায্য দ্রুত পাঠানো দরকার। মাত্র ২ হাজার সৈন্য নিয়ে যরথুস্ত্রের বিরুদ্ধে লড়ার কল্পনাও করা যায় না।”
“কা‘কা বিন আমরকে ডাক!” আমিরুল মু’মিনীন নির্দেশ দেন। একটু পরে বলিষ্ঠ দেহবিশিষ্ট মধ্যমাকৃতির এক সুদর্শন যুবক খলীফার সামনে এসে দাঁড়ায়।
“কা‘কা!” আমীরুল মু‘মিনীন আগত যুবকের উদ্দেশে বলেন–“খালিদের সাহায্যের খুবই প্রয়োজন। দ্রুত প্রস্তুতি নিয়ে ইয়ামামার উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে যাও। সেখানে পৌঁছে খালিদকে বলবে, আমিই তোমার সাহায্য।”
“শ্রদ্ধাবর আমীরুল মু‘মিনীন!” এক পরামর্শদাতা বিস্ময়াভিভূত হয়ে বলেন “জানি আপনি উপহাস করছেন না। কিন্তু যে সেনাপতির ৮ হাজার সৈন্য চলে গেছে তাকে সাহায্য হিসেবে মাত্র এক ব্যক্তি প্রদান করা উপহাসই লাগছে।”
আমীরুল মু’মিনীন অস্বাভাবিক গভীর ছিলেন। তিনি হযরত কা’কা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর আপাদ-মস্তক একবার গম্ভীর নিরীক্ষণ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন “যে মুজাহিদ বাহিনীতে কা’কা-এর মত টগবগে যুবক থাকবে তারা পরাজিত হবে না।”
হযরত কা’কা রাযিয়াল্লাহু আনহু তৎক্ষণাৎ ঘোড়ায় চেপে বসেন এবং মদীনা ছেড়ে বেরিয়ে যান। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আল্লামা তবারী, ইবনে ইসহাক, ওকিদী এবং সাইফ বিন উমর এই ঘটনা বর্ণনা করে লেখেন যে, এর পূর্বেও এমন ঘটনা আরেকবার ঘটেছিল। হযরত ইয়াম বিন গনাম রাযিয়াল্লাহু আনহু নামক এক সেনাপতি এক রণাঙ্গন হতে জরুরী সেনা সাহায্য চেয়ে মদীনায় দূত পাঠালে খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু শুধু হযরত আবদ ইবনে আউফ আল হিময়ারী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সাহায্য হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তখনও উপস্থিত লোকজন বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদের ঐ জবাবই দিয়েছিলেন, যা তিনি কা’কা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর উদ্দেশে প্রেরণের সময় দেন।
আসল ঘটনা হলো, খলীফা হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে নিরাশ করতে চাচ্ছিলেন না। কিন্তু তাকে ব্যাপক সাহায্য করার মত মদীনায় তখন সৈন্য ছিল না। কেননা রণাঙ্গন এই একটি মাত্র ছিল না। প্রখ্যাত সেনাপতিদের সকলেই বিভিন্ন রণাঙ্গনে যুদ্ধরত ছিলেন। এ সকল যুদ্ধ মুরতাদদের বিরুদ্ধে জারী ছিল। ইসলামের শত্রুরা যখন নিশ্চিত হয়ে যায় যে, যুদ্ধের ময়দানে মুসলমানদের পরাজিত করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয় তখন তারা ইসলামকে দুর্বল করে করে শেষ করে দিতে এই পন্থা অবলম্বন করে যে, কিছু লোক নবুওয়াতের দাবী করে বসে এবং চানক্য পন্থায় মানুষদেরকে নিজের ভক্ত ও অনুসারী বানাতে থাকে। ইসলাম গ্রহণকারী কতক গোত্রও ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে যায় এবং ইসলাম বিচ্যুতির এই ধারাবাহিকতা দ্রুত প্রসার লাভ করতে থাকে। ধর্মান্তরিতের প্রাদুর্ভাবের পশ্চাতে ইহুদীবাদীর হাত ছিল। তারাই নেপথ্যে থেকে এ ফেৎনা ছড়ায়।
খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খেলাফতের পুরো সময়টা এই ফেৎনার মূলোৎপাটনের পিছনে ব্যয় হয়। কেবল ওয়াজ-নসিয়ত আর তাবলীগের দ্বারা এই ফেৎনা দমানো যেত না। এর জন্য সশস্ত্র জিহাদের প্রয়োজন ছিল। এ পর্যায়ে কয়েকটি রণাঙ্গন একই সময়ে সৃষ্টি হয়। মদীনায় আপাতত কোন সৈন্য ছিল না। কোন রণাঙ্গনে সৈন্য ঘাটতি দেখা দিলে অপর রণাঙ্গন হতে সৈন্য এনে সে ঘাটতি পূরণ করা হত।
