মুসলিম বাহিনী বিপর্যস্ত। খালিদ বাহিনীর কৌশলী ও অতর্কিত আক্রমণে মুজাহিদরা দিশেহারা হয়ে যায়। বল চলে যায় মুসলমানদের দখল থেকে কুরাইশদের দখলে। নিশ্চিত বিজয় হাতের মুঠোয় এসেও ছুটে যায়। এটা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ না মানার ফল। অর্জিত বিজয় দ্বারা সামান্য ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।
দুর্ধর্ষ বাহাদুর। খালিদ এবং ইকরামা সমরবিদ্যায় ছিল অতুলনীয়। মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করতে এখন তাদের আর কোন বাধা ছিল না। আল্লাহ ব্যতীত তাদের সাহায্য করারও ছিল না কেউ। খালিদ দেখতে পান যে, মুসলমানরা দু’ভাগে বিভক্ত। বড় অংশটি সর্বাধিনায়ক নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মুষ্টিমের কতক সাহাবী নবীজীর সাথে ছিলেন। এ ক্ষুদ্র দলটি গনিমতের মালের পেছনে না পড়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকেন। সংখ্যায় তাঁরা ছিলেন বিশজনের মত। হযরত আবু দুজানা রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত সা’দ বিন আবী ওয়াক্কাস রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আব্দুর রহমান বিন আউফ রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত উবায়দা রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত তালহা বিন আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু, হযরত মুসআব বিন উমাইর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রমুখ ছিলেন তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আহতদের সেবা-শুশ্রুষার উদ্দেশে আগত চৌদ্দজন মহিলাদের মধ্যে দু’জন ছিলেন রাসূলের সাথে। একজন হযরত উম্মে আম্মারা রাযিয়াল্লাহু আনহা এবং অপরজন হযরত উম্মে আয়মন রাযিয়াল্লাহু আনহা নাম্মী এক হাবশী মহিলা। হযরত উম্মে আয়মন রাযিয়াল্লাহু আনহা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ভূমিষ্ঠের সময় ধাত্রী ছিলেন। অবশিষ্ট বারজন মহিলা তখনও পর্যন্ত জখমিদের উদ্ধার এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
খালিদ সন্ধানী দৃষ্টি হেনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে খুঁজতে থাকেন। তার পক্ষে রণাঙ্গনে বেশিক্ষণ ঘোরাফেরা করা সম্ভব ছিল না। কারণ তার অধীনে একটি অশ্বারোহী দল ছিল। তার উপস্থিতিই তাদেরকে সংঘবদ্ধ ও সুসংহত করে রাখে।
তিনি অজ্ঞের মত আক্রমণের পক্ষপাতি ছিলেন না। তার নীতি ছিল শত্রুর দুর্বল পয়েন্টে এমন আঘাত হানো, যেন দ্বিতীয় আঘাত করার পূর্বেই তারা মুখ থুবড়ে পড়ে।
আজ চার বছর পর যখন তিনি একাকী মরুভূমি মাড়িয়ে যাচ্ছেন, তখন তার মন-মস্তিষ্কে ঘোড়া দৌড়াচ্ছিল। মুসলিম বাহিনীর তকবীর-ধ্বনি তার স্মৃতিতে ঝংকার তোলে। এই তকবীর-ধ্বনি শুনে তার মনে হয়েছিল, নিজেদেরকে সাহসী, নির্ভীক ও মৃত্যুভীতিমুক্ত প্রকাশ করতে মুসলমানরা এভাবে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে তুলছে। একবার ঘৃণা আর তাচ্ছিল্যতায়, আরেকবার তার অধরদ্বয় মুচকি হেসে ওঠে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন, মুসলমানদের হত্যা করা হবে বেশি, রাজবন্দি বানানো হবে কম। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থান তিনি এখনও শনাক্ত করতে পারেননি। ইতোমধ্যে রণাঙ্গনের অপর প্রান্তে চেয়ে দেখেন, আবু সুফিয়ান পলায়নপর কুরাইশদের সুসংহত করেছে আবার। সে এসেই কমান্ডার-বিচ্ছিন্ন মুসলিম বাহিনীর বড় দলটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলমানরাও বীরবিক্রমে জীবনবাজি রেখে লড়ে চলছে। জীবনের শেষ যুদ্ধ মনে করে তারা অমিত তেজ আর বীরত্বের এমন নৈপুণ্য প্রদর্শন করে যে, সংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও কুরাইশরা আবার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়।
কুরাইশদের বিপদ আঁচ টের পেয়ে খালিদ রীতিমত অগ্নিগোলকে পরিণত হন। তিনি তার বাহিনীকে মুসলমানদের উপর তুফান সৃষ্টির নির্দেশ দেন। নিজের তরবারি কোষবদ্ধ করেন। হাতে তুলে নেন ভয়ংকর বর্শা। তিনি পার্শ্বদিক হতে মুসলিম বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। পরিস্থিতি অনুকূলে আনতে তিনি নতুন কৌশল অবলম্বন করেন। বীরত্ব প্রদর্শনকারী মুজাহিদদের বেছে বেছে বর্শা ছুড়তে থাকেন। তার বর্শায় কোন মুজাহিদ নিহত হলে আনন্দ প্রকাশের জন্য চিৎকার করে বলতেন– ‘আমি আবু সুলাইমান’ –প্রতিটি বর্শার সাথে তার উচ্চকিত আওয়াজ শুনা যেত আমি আবু সুলাইমান।
চার বছর পর মদীনা যাত্রাকালে আজ আবার তার কর্ণকুহরে ঝংকার তোলে– “আমি আবু সুলাইমান” তিনি সঠিকভাবে মনে করতে পারেন না যে তার বর্শা সেদিন কয়জন মুসলমানের দেহ ভেদ করে যায়। তিনি সেদিন কিছু সময়ের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথা ভুলে যান। অল্পক্ষণ পরই খবর পান যে, মুসলিম বাহিনী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং ইকরামা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অবস্থান শনাক্ত করে তার নিকট পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছে।
খবর সত্য। আসলেও মুসলমানদের উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ন্ত্রণ ছিল না। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ অবস্থায় গিয়ে দাঁড়ায় যে, বিক্ষিপ্ত বাহিনীকে পুনর্গঠিত করে যুদ্ধকে আবার অনুকূলে নিয়ে আসা সম্ভব ছিল না। কিন্তু নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ও সাথিদের জীবন বাঁচাতে রণাঙ্গন ছেড়ে চলে যাওয়া সঙ্গত মনে করেননি। অথচ বাস্তবতার দাবি ছিল এ মুহূর্তে ময়দান ছেড়ে যাওয়া। তিনি একটি ভাল অবস্থান খুঁজছিলেন। যেহেতু তার জানা ছিল যে, কুরাইশরা তাকে তালাশ করছে এবং খোঁজ পেলেই তাকে কেন্দ্র করে ভয়ানক সংঘর্ষ বেঁধে যাবে। সর্বদিক বিচার করে শেষে একটি পাহাড়ের দিকে রওয়ানা হন। সাথে অবস্থানরত সাহাবায়ে কেরাম নিরাপত্তার জন্য তাঁকে বৃত্তাকারে ঘিরে রাখেন।
