“তার সবচেয়ে বড় সফলতা হলো” খলীফা বলেন–“সে যরথুস্ত্রের প্রজাধীন মুসলমানদেরকে এক প্লাটফর্মে সমবেত করে রেখেছে এবং তাদের মাঝে এমন প্রেরণা সৃষ্টি করেছে যে তারা যরথুস্ত্রের চরম নির্যাতন নিপীড়নের মধ্য দিয়েও ইসলামকে বুকে আগলে রেখেছে। উবলা এবং ইরাকের মুসলিম জনবসতি এলাকা ইরানীদের বর্বরতা অনুশীলনস্থলে পরিণত হয়েছে। চরম এ সংকটময় মুহূর্তে নিজের ধর্ম-বিশ্বাস আঁকড়ে ধরে থাকা অর্থহীন প্রতিভাত হয়। তারা মুখে শুধু এতটুকুই যদি বলে দেয় যে, ইসলাম এবং মদীনার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই তবে মুহূর্তে তাদের সকল বিপদ-দুর্দশার অবসান ঘটবে। এটা সম্পূর্ণ মুসান্না এবং তার কয়েকজন সাথীর কৃতিত্ব ও অবদান যে, তারা এ ক্রান্তি লগ্নেও তথাকার মুসলমানদেরকে ইসলাম চ্যুত হতে দেয়নি। বরং উল্টো তাদের চেতনা-বিশ্বাসকে এমন দৃঢ় ও পরিপক্ক করে দিয়েছে যে, তারা যরথুস্ত্রের বিরুদ্ধে ভয়ঙ্কর এ্যাকশন ও অপরেশানে সদা তৎপর থাকে।”
“আমিরুল মু’মিনীন!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “মুসান্না কি করল না করল এটা বড় কথা নয়; আসল কথা হলো মুসলমান হিসেবে আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য হলো যারা মুসলমান হওয়ার কারণে অমুসলিমদের লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের শিকার তাদের ভরপুর সাহায্য করা।”
“তুমি কি বলতে চাও, এখনই আমাদের ইরানীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো উচিত?” খলীফা জিজ্ঞাসা করেন।
“জ্বী হ্যাঁ, আমীরুল মু’মিনীন! হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “ইরানীদের বিরুদ্ধে লড়তে আমাদের অসুবিধা কোথায়? সেখানকার পরিস্থিতিই তো ভিন্ন; আমাদের অনুকূলে, আপনার বর্ণনা হতে জানা গেছে যে, মুসান্না ইতোমধ্যে সেখানে কিছুটা সফলতা লাভ করেছে এবং আক্রমণের জন্য সে আমাদের পথকে সুগম করে দিয়েছে। নৈশ হামলাকারী এবং গেরিলা বাহিনীর দ্বারা ঠিক ততটুকু সম্ভব যা মুসান্না করেছে। তাদের দ্বারা কোন এলাকা অধিকার করা সম্ভব নয়; এটা নিয়মিত সৈন্যবাহিনীর কাজ। এ কাজটি যে কোন মূল্যে আমাদের করতেই হবে। মুসান্নার সফলতাকে আমরা এগিয়ে না নিলে তার ক্ষতি দু’টি। একটি হলো, তার সকল সফলতা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। দ্বিতীয় হলো যরথুস্ত্ররা মুসান্না এবং মুসলমানদের থেকে এর জন্য প্রতিশোধ নিবে। তা ছাড়া ইরানীদের সাহস বেড়ে যেতে পারে।…
মুসান্না তো আপনাকে জানিয়েছে যে, সে ইরানীদের এমন ক্ষতিসাধন করেছে যে, তাদের আবেগে বিরাট ভাটা পড়েছে। এমতাবস্থায় যদি তাদেরকে হাফ ছাড়ার সুযোগ দেয়া হয় তাহলে তারা নবোদ্যমে জেগে উঠবে এবং মুসলমানদেরকে পাইকারী হারে হত্যা করবে। তারা সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে এবং ভবিষ্যৎ কন্টকমুক্ত করতে আলোচ্য সীমান্তবর্তী এলাকার নিয়ন্ত্রণ মজবুত করবে। তারা তাদের সীমান্ত এলাকা ঝুঁকিমুক্ত করতে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলও অধিকার করে নিতে পারে। এই বিপদ মোকাবিলার একটিই মাত্র পথ খোলা ; আর তা হলো কালক্ষেপণ না করে মুসান্নার সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া এবং যরথুস্ত্র আমাদের উদ্দেশে সৈন্য মার্চ করার পূর্বেই তাদের দেশে আমাদের পৌঁছে তাদেরকে পিছু হটতে বাধ্য করা।”
অধীনস্থ সৈন্যদের নিয়ে জলদি ইরাক অভিমুখে যাত্রা করার নির্দেশ দিয়ে খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বিদায় জানান।
“খালিদের বিদায় মুহূর্তে খলীফা বলেন “তোমার অধীনস্থ সৈন্যদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন স্বীয় পরিবার-পরিজন থেকে দূরে এবং অনেক যুদ্ধে তারা অংশগ্রহণ করেছে। ইরানীদের মত শক্তিশালী বাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের দ্বারা যুদ্ধ করানো মনে হয় ঠিক হবে না। এর জন্য চাই তেজোদ্যম বাহিনী। জিহাদী জযবায় উজ্জীবিত একঝাক সৈন্যের। কেবল এমন সৈন্যই পারবে জানের বাজি দিতে। পাহাড়ের মত অবিচল হয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে। বাধ্য করে কাউকে রণাঙ্গনে পাঠানোর পক্ষপাতী আমি নই। সবচেয়ে ভাল হয় তুমি নিজেই একটি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী তৈরি করে নাও। তাদের মধ্যে এমন ধরনের লোক রাখবে যারা মুরতাদদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। তোমার বাহিনীতে হয়ত এমন লোকও আছে যারা পূর্বে মুরতাদ বাহিনীতে ছিল। পরে পরাজিত হয়ে ইসলামী বাহিনীতে ঢুকে পড়ার মাঝে মঙ্গল দেখে সামিল হয়ে গেছে। এমন লোকদেরকে তোমার বাহিনীতে রাখবে না। আমরা বিরাট শক্তিধর শত্রুর সাথে মোকাবিলা করতে যাচ্ছি। ফলে আমি কোনরূপ বিপদের ঝুঁকি নিতে চাই না।”
“আমিরুল মু‘মিনীন!” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন–“মুরতাদ বাহিনী হতে যারা আমার বাহিনীতে ঢুকেছে তাদেরকে আমার বাহিনী হতে বিদায় করে দেবার অনুমতি দিচ্ছেন?” “বিদায় করে দেয়া ভিন্ন কথা ওলীদের বেটা!” খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–“তুমি গিয়ে সৈন্যদের বলবে, যারা ঘরে ফিরে যেতে চায় তাদের যাবার অনুমতি রয়েছে। এরপর দেখবে তোমার সাথে কতজন থাকে। যদি থেকে যাওয়া সৈন্যদের সংখ্যা খুবই কম হয় তাহলে খেলাফত এই কমতি কোন না কোন উপায়ে পূর্ণ করবে।… যাও ওলীদের পুত্র। আল্লাহ তোমার সহায় হোন।” খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু দৃঢ় ইচ্ছা এবং ঈমানে বলীয়ান ছিলেন। ইরাকে হামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি যে কোন মূল্যে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে চান। হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এরও আন্তরিক চাহিদা ছিল তাঁর একের পর এক লড়াইয়ের সুযোগ আসুক। তিনি খলীফার ইচ্ছাকে আরো সুদৃঢ় ও মজবুত করে দেন।
