“সম্মানিত আমিরুল মু’মিনীন!” মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন–“পরামর্শ সাপেক্ষে সিদ্ধান্তই সর্বোত্তম। তবে আমিরুল মু’মিনীনের কাছে আমার কথা শেষ করার অনুমতি চাইব এবং বিনীত অনুরোধ জানাব যেন তিনি আমার কথাগুলো সেনাপতিদের বৈঠকে তুলে ধরেন।…
দজলা এবং ফোরাতের মিলন মোহনার নিকটবর্তী একটি বিস্তীর্ণ এলাকায় আরব গোত্রসমূহের বসবাস। সকলেই মুসলমান। ধর্মীয় পরিচয়ে তারা মুসলমান হওয়ায় তারা অগ্নি উপাসক সম্রাটের জুলম-নির্যাতনের ব্লাকবোর্ডে পরিণত হয়েছে। ন্যূনতম মসজিদেও তাদের কোন অধিকার স্বীকৃত নেই। ইরানীদের হাতে তাদের জান নিরাপদ নয়। ইজ্জত-আবরু সতত হুমকির সম্মুখীন।…
সেখানে মুসলমানরা প্রচুর রবিশস্য ও ফল-ফলাদি উৎপন্ন করে কিন্তু বেচারাদের ভাগ্যে কিছুই জোটে না। ক্ষেতের ফসল এবং বাগিচার ফল পাকতেই আগুন পূজারী ভূস্বামী এবং ইরানী সৈন্যরা জোরপূর্বক সমস্ত ফসল ও ফল নিয়ে যায়। হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রমকারী মুসলমানদেরকে তারা সাধারণ শ্রমিক ও ধিকৃত জাতি বলে মনে করে। তারা সারাক্ষণ ভীত ও তটস্থ থাকে। মুসলমান হওয়াই তাদের একমাত্র অপরাধ। তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ হল, তারা কুফরীর সয়লাবের মাঝেও ইসলামের চেরাগ জ্বালিয়ে রেখেছে। তারা মদীনাকে আলোর মিনার মনে করে।…
“আমিরুল মু’মিনীন! দুশমন শক্তিশালী-এই প্রশ্ন মনে জায়গা দিলে ক্রমে তাদের শক্তি বাড়বে বৈ কমবেনা। অপরদিকে নির্যাতিত মুসলমানদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় তারা নিরাশ হয়ে নিজেদের মুক্তির স্বার্থে এমন পন্থা অবলম্বন করতে পারে যা ইসলামের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। আমার গেরিলা বাহিনী যে সফলতা অর্জন করেছে এবং আপনার সৈন্যদের জন্য যে অনুকূল পরিবেশ করেছে তা শত্রুর করতলগত হয়ে যেতে পারে।… রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজলুম মুসলমানদের সাহায্যে এগিয়ে যেতেন না?”
“আল্লাহর কসম! আমি তাদের সাহায্যে এগিয়ে যাব” খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন এবং পাশে বসা এক সেনাপতির কাছে জানতে চান যে, ওলীদের পুত্র খালিদ বর্তমানে কোন এলাকায় আছে?”
“ইয়ামামায় আপনার পরবর্তী নির্দেশের অপেক্ষায় আছেন সেনাপতি উত্তরে বলেন।
“দ্রুতগামী কোন দূত মারফৎ খালিদকে জরুরী নির্দেশ দিয়ে পাঠাও যে, সে যেন জলদি মদীনা এসে পৌঁছে।” খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন “আল্লাহর তরবারী ছাড়া ইরান সম্রাটের সাথে আমরা টক্কর লাগাতে পারি না।” এরপর তিনি হযরত মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সম্বোধন করে বলেন “আর তুমি মুসান্না এখনই তোমার দেশে ফিরে যাও এবং আরব গোত্র হতে লড়াইয়ের যোগ্য যত লোক সংগ্রহ করা সম্ভব করে ফেল। এখন তোমাদেরকে প্রকাশ্য ময়দানে যুদ্ধ করতে হবে। অবশ্য তোমরা গেরিলা পন্থায়ও লড়াই অব্যাহত রাখতে পার। কিন্তু এখন তুমি নিজ ইচ্ছায় লড়তে পারবে না। খালিদ সর্বাধিনায়ক থাকবে। তুমি তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলবে।”
“যথা আজ্ঞা আমিরুল মু’মিনীন!” মুসান্না বিন হারেছা বলেন “আরেকটি আবেদন করতে চাই।… ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে আরব গোত্রসমূহের মধ্যে কিছু খৃষ্টানসহ অন্যান্য ধর্ম-বিশ্বাসের লোকও আছে। তারা সবাই অগ্নিপূজারীদের বিরোধী। পারস্যের অগ্নিপূজকরা মুসলমানদের সাথে যে নির্দয় আচরণ করে তাদের সাথেও ঠিক তেমন নির্মম ব্যবহার করে। যদি আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেন তবে আমার অনুরোধ থাকবে অমুসলিম আরবদের সাথে যেন তেমন সদয় আচরণ করা হয়, মুসলমানদের সাথে যেমন করা হবে।”
“ঠিক আছে; এমনটিই হবে” আমীরুল মু’মিনীন বললেন–“যারা ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি ইসলাম তাদের মাথাব্যাথার কারণ হবে না।… তুমি আজই রওয়ানা হয়ে যাও।”
হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন ইয়ামামায় অবস্থান করছিলেন। হেড কোয়ার্টার থেকে তার প্রতি এ নির্দেশই ছিল। লায়লা উরফে উম্মে তামীম এবং বিনতে মুযাআ-দুই নববধূ তাঁর সঙ্গেই ছিল। দূত মারফৎ আমীরুল মুমীনিনের জরুরী তলব পেয়েই হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু ইয়ামামা থেকে রওয়ানা হয়ে যান এবং সোজা মদীনায় গিয়ে পৌঁছেন।
“মুসান্না বিন হারেছার নাম কখনো শুনেছ?” খলীফা হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে জানতে চান।
“জ্বী শুনেছি,” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জবাবে বলেন–“এ কথাও আমার কানে এসেছে যে, ইরানী বাহিনীর বিরুদ্ধে সে সীমিত পর্যায়ের যুদ্ধ শুরু করেছে তবে আমার সঠিক স্থান জানা নেই যে, তার এ সীমিত পর্যায়ের যুদ্ধ নিছক ব্যক্তিস্বার্থ নাকি ইসলামের স্বার্থে সে এ যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছে।”
“সে এখানে এসেছিল”– আমীরুল মু’মিনীন বললেন–“যে জিহাদের অবতারণা সে শুরু করেছে তাতে তার কিঞ্চিৎ ব্যক্তিস্বার্থ নেই। আমি তোমাকে এ ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য ডেকে পাঠিয়েছি যে, মুসান্নার সাহায্যে আমরা এখনই লাব্বায়েক বলব নাকি পারস্য সাম্রাজ্যের সাথে টক্কর দেয়ার মত শক্তি সঞ্চয়ের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করব?”
“সে কোন ধরনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে?” হযরত খালিদ রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে চান। হযরত আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু এ তথ্য জানিয়ে বলেন যে, মুসান্না বর্তমানে গেরিলা ধরনের আক্রমণ চালাচ্ছে এবং সে ইতোমধ্যে ব্যাপক সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
