হযরত মুসান্না বিন হারেছার নেতৃত্বাধীন দুর্ধর্ষ জিহাদী দলটি মরুভূমির বেশ ভেতর এক দুর্গম স্থানকে নিজেদের আস্তানা হিসেবে বেছে নেয়।
ক’দিনের সফল অপারেশনেই আস্তানা গনীমতের মালে টইটুম্বর হয়ে যায়। এক পর্যায়ে তারা কেবল ইরানী অধ্যুষিত এলাকায় গেরিলা আক্রমণ চালাতে শুরু করে। মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু সীমান্ত এলাকায় ইরানী সৈন্যদের ব্যাপক নাকানি-চুবানি খাইয়ে ঠুটো জগন্নাথে পরিণত করে ছাড়ে। ইরানী বাহিনীর একাধিক সিনিয়র কমান্ডার এক এক করে মুসান্নার হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়। ফলে সৈন্যরা ভীষণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে তাদের পিছু নেয়া ছেড়ে দেয়।
হযরত মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু আরেকটি পদক্ষেপ নেন। দক্ষিণ ইরাকে যে সমস্ত মুসলিম গোত্র ইরানীদের নির্যাতনে মানবেতর জীবন-যাপন করছিল তাদের মাঝে সর্বোচ্চ প্রভাব বিস্তার করে সকলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। তিনি অধীনস্ত দেরকে দু’টি শ্রেণীতে ভাগ করেন। একদল ছিল গেরিলা হামলার দায়িত্বে নিয়োজিত আর অপর দলটিকে তিনি মুসলিম আবাসিক এলাকায় রাখেন। তাদের দায়িত্ব ছিল পারস্পরিক একতা টিকিয়ে রাখা এবং রণাঙ্গনের ফলাফল সম্পর্কে সাধারণ মুসলমানদের অবগত করিয়ে তাদেরকে আশ্বস্ত করা। গেরিলা বাহিনীর প্রতিনিয়ত সফলতার সংবাদ এলাকাবাসী এভাবে জানতে পারছিল। ফলে অনাস্থা দূর হয়ে তাদের মাঝে ক্রমে আস্থা সৃষ্টি হতে থাকে। তারা মুক্তির সূর্যোদয় দেখতে বড়ই উন্মুখ ও পাগলপারা ছিল। এটাই ছিল খোদায়ী মদদ, যার প্রতীক্ষায় তারা ইরানীদের সকল নির্যাতন-নিপীড়ন মুখ বুজে সহ্য করে আসছিল এবং ইসলাম ধর্ম বুকে আঁকড়ে রেখেছিল। নতুবা ইসলাম ত্যাগ করে অগ্নিপূজারী হওয়ার মাধ্যমে তারা অতি সহজে ইরানীদের নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারত।
‘তিন-চার দিন সে গায়েব হয়ে যাবে’– খুদ্দাম জোহরাকে একথা বলে মুসান্না বিন হারেছার নেতৃত্বাধীন গেরিলা বাহিনীর হেড কোয়ার্টারে চলে গিয়েছিল এবং তাদেরকে ইরানী কমান্ডার শিমুর বাড়াবাড়ির ঘটনা সব খুলে বলেছিল। গেরিলা বাহিনী খুদ্দামের আহ্বানে সাড়া দেয়। ইরানীদের বিনোদনের দিনকে তারা অপারেশনের জন্য বেছে নেয়। খুদ্দাম নিজেই গেরিলা বাহিনীকে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। গেরিলা বাহিনী অতি নিপুণতা ও দক্ষতার সাথে সফল হামলা চালায়। গেরিলা দল হামলা করেই দ্রুত মারকাজে ফিরে যায়। এদিকে খুদ্দামও তৎক্ষণাৎ নিজের বাড়ী ফিরে আসে।
পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী এলাকা এবং ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলে আরব মুসলিম গোত্রসমূহের উপর প্রভাব বিস্তার এবং তাদেরকে ইসলামের উপর দৃঢ়-অবিচল রেখে ইরানীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে গড়ে তোলার বিস্তারিত রিপোর্ট হযরত মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু কে প্রদান করেন।
“আল্লাহ তোমার প্রতি রহম করুন ইবনে হারেছা।” খলীফা তার নাতিদীর্ঘ বিবরণ শুনে বলেন “তুমি ইরানীদের বিরুদ্ধে সৈন্য প্রেরণের পরামর্শ দেয়ার উদ্দেশ্যে এলে আমাকে এর জন্য ভাবতে হবে। তুমি কি জাননা ইরানী সৈন্যসংখ্যা যেমন বেশী তেমনি তাদের যুদ্ধাস্ত্র ও রসদ সামগ্রীর কোন অভাব নেই? উপায়-উপকরণ বিহীন এবং হেড কোয়ার্টার থেকে এত দূরে গিয়ে স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে শক্তিধর বিশাল বাহিনীর মোকাবিলা করার যোগ্য এখনো আমরা হয়ে উঠিনি। কিন্তু তাই বলে পারস্য সাম্রাজ্যের বিষয়টি আমার বিবেচনাধীন নেই তা নয়।”
“আমীরুল মু’মিনীন!” মুসান্না রাযিয়াল্লাহু আনহু বুকে হাত রেখে বলেন–“যদি এক ব্যক্তি এত বড় রাষ্ট্রের সৈন্যদের সাথে টেক্কা দিতে পারে এবং তাদের অন্তরে মুসলিম সৈন্যদের ব্যাপারে গভীর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে তাহলে আমি আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা রেখে বলতে পারি যে, একটি সুশৃঙ্খল ও নিয়মিত বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে অনেক কিছু করতে পারে। আমি ঐ আগুনপূজারী সাম্রাজ্যের আভ্যন্তরীণ করুণ অবস্থা সম্পর্কে সম্যক অবহিত। শাহী খান্দানের লোকেরা রাজ সিংহাসন দখলকে কেন্দ্র করে ভীষণ অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত। আপনার জানা আছে যে, ইতোমধ্যে সম্রাট হিরাক্লিয়াস পারস্য বাহিনীকে নিনওয়া এবং দস্তাযারদ দুই রণাঙ্গনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছে। হিরাক্লিয়াসের সৈন্যরা পারস্য সাম্রাজ্যের রাজধানী মাদায়েনের ফটক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল প্রায়। এরপর ইরানীরা তাদের হারানো গৌরব আর পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। তাদের আয়েশী জীবন ও বিলাসিতার প্রতি তাকালে মনে হয় তারা নিজেদেরকে সামলে নিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এখন তাদের মাঝে রাজমুকুট নিয়ে রশি টানাটানি চলছে। ইয়ামান তাদের হাত থেকে খসে গেছে। ইয়ামানের গভর্নর বাযান ইসলাম গ্রহণ করেছে। তার অধীনস্থ প্রজারা ইরানী জিঞ্জির ভেঙ্গে ফেলতে ভীষণ উদগ্রীব। ইরানীদের শাসনাধীন দক্ষিণ অঞ্চলের মুসলমান গোত্রগুলো আমার ইশারা এবং মদীনার সৈন্যদের প্রতীক্ষায় অপেক্ষমাণ।”
“তোমার উপর আল্লাহর রহমত অঝোর ধারায় বর্ষিত হোক মুসান্না!” আমীরুল মু‘মিনীন বলেন “নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিটি কথা আমার অন্তরে গেঁথে যাচ্ছে। তুমি যা চাচ্ছ আমি তাই করতে চাই। তবে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে সেনাপতিদের সাথে আলোচনা করলে ভাল হয় না?”
