দু’বার ইরানী সৈন্যরা অদৃশ্য শত্রুর পিছু নেয়। হামলাকারীদের পদচিহ্ন ধরে ধরে অনেক দূর এগিয়ে যায়। কিন্তু তারা তাদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারে না। কারণ খানিক দূর এগিয়ে যেতেই সবুজ-শ্যামল ভূমি শেষ হয়ে বিস্তীর্ণ মরু এলাকা শুরু হয়ে যেত। মরু এলাকাটি মোটেও সমতল ছিল না; যত্রতত্র অসংখ্য বালুর ঢিবি ও উঁচু উঁচু টিলা ছিল। সামনে বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল থাকলেও সেখানে বিচিত্র আকৃতির অসংখ্য টিলা ভয়ঙ্কর রূপ ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। এখানে-সেখানে বালুর পাহাড় ছিল। আগুনের লেলিহান ফুলকি তার অভ্যন্তর হতে উদগত হচ্ছে মনে হত। মাইলের পর মাইল জুড়ে এই ভয়ঙ্কর মরু এলাকায় চৌকস মরুভেদী ব্যক্তিই কেবল যেতে পারত। কোন নতুন লোকের পক্ষে এখানে যাওয়াই সম্ভব ছিল না। আর গেলেও প্রাণ নিয়ে ফিরে আসা ছিল সম্পূর্ণ অসম্ভব।
ইরানী সৈন্যরা মরুভূমির গোলক ধাধার সাথে পরিচিত ছিল না। তারা প্রতিশোধ স্পৃহায় গেরিলা বাহিনীর পিছু পিছু এই মরু অঞ্চলে গিয়ে করুণ পরিণতির সম্মুখীন হয়। ইরানের অশ্বারোহী বাহিনী পশ্চাদ্ধাবন করতে গিয়ে মানুষ ও ঘোড়ার পদচিহ্ন পেয়ে পুলকিত হয়ে ওঠে। তারা এটাকে গেরিলা বাহিনীর পদচিহ্ন মনে করে চিহ্ন ধরে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু এই চিহ্নের অনুসরণ তাদেরকে সরাসরি মৃত্যুর মুখে নিক্ষেপ করে। দুর্গম অঞ্চলে ইরানী সৈন্যরা পা দিতেই তাদের উপর তীরের বৃষ্টি হতে থাকে। প্রথম চোঁটেই কতক অশ্বারোহী এবং কয়েকটি ঘোড়া ঘায়েল হয়। আহত ঘোড়া নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে এদিক-ওদিক ভেগে যায়। পুরো বাহিনীতে হুলুস্থুল পড়ে যায়। এদিকে তীর মুষলধারায় আসতে থাকে কিন্তু ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবার কারণে তীর অধিকাংশই লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে থাকে।
দুর্গম এই নিম্নাঞ্চল থেকে কয়েকজন অশ্বারোহী বেরিয়ে আসে। তাদের হাতে বর্শা ছিল। তাদের পরনে লম্বা কোর্তা এবং মাথায় কালো কাপড় এমনভাবে বাঁধা ছিল যে, তাদের গর্দান এবং চেহারাও ঢাকা পড়েছিল। চোখ দু‘টো খোলা ছিল মাত্র। কারো সাধ্য ছিল না তাদের চেনা কিংবা চিহ্নিত করা। অশ্বের পায়ে এবং অশ্বারোহীদের বাহুতে এমন ছন্দময় বিদ্যুৎ গতি ছিল যে, পূর্ব হতেই আতঙ্কিত ইরানী বাহিনী অস্ত্র ধরার কথা ভুলে যায়। তারা অসহায়ভাবে নেকাবধারীদের বর্শার আঘাতে আঘাতে আহত হয়ে লুটিয়ে পড়তে থাকে। কতক প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালায়। তারা টিলা এবং ঢিবি অধ্যুষিত নিম্নাঞ্চল থেকে বের হতে পারলেও বিস্তীর্ণ মরুভূমির গোলক ধাঁধায় গিয়ে পতিত হয়। টিলাগুলো একই ধরনের হওয়ায় দিশেহারা হয়ে চক্কর খেতে থাকে। বিপদজনক এ ধরনের টিলা অসংখ্য এবং মাইলের পর মাইল জুড়ে থাকায় কোন নতুন ব্যক্তি এর মধ্যে একবার পা দিলে তার পক্ষে এ মরুফাঁদ মুক্ত হয়ে বের হওয়া সম্ভব হত না। ক্রমে সে গভীর থেকে গভীর মরু অঞ্চলে হারিয়ে যেত। একসময় ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে হাল ছেড়ে দিত। পিপাসায় কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত। অতঃপর মরুভূমির এই অদ্ভুত, বালিফাড়ি বড় নির্দয় ও করুণভাবে তার প্রাণ সংহার করত।
আরেকবার ইরানী সৈন্যরা গেরিলা বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবনে গেলে নতুন এক স্থানে তারা আক্রমণের শিকার হয়। প্রচণ্ড তীরবৃষ্টির মুখে সৈন্যরা দিগ্বিদিক হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় তাদের কণ্ঠকুহরে একটি আওয়াজ ভেসে আসে “যরথুস্ত্রের ভক্তরা; আমি মুসান্না বিন হারেছা।…যরথুস্ত্রেকে আসতে বলবে।… মুসান্না বিন হারেছা।… হুরমুজকে এ নামটি জানিয়ে দিবে… মুসান্না বিন হারেছা।” ইরানী সৈন্যদের মধ্য হতে যারা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হয় তারাও আধামরা ছিল। তারা পরে তাদের কমান্ডারকে মরুভূমির এই রহস্যময় কণ্ঠ সম্পর্কে অবহিত করে।
এরপরে ইরানীদের সীমান্তবর্তী চৌকিতে লাগাতার গুপ্ত হামলা চলতে থাকে। কিন্তু তারা গেরিলা বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন এবং তাদের অনুসন্ধান করার সাহস করেনি। কোন কোনদিন গুপ্ত হামলার সাথে সাথে এই আওয়াজও শোনা যেত “আমি মুসান্না বিন হারেছা।… আগুন পূজারীরা শোন! আমার নাম মুসান্না বিন হারেছা।”
এরপর থেকে মুসান্না বিন হারেছা নামটি ভীতি, ভূত-পেত্নী-প্রেতাত্না ইত্যাদি নামে পরিণত হয়। ইরানী সৈন্যরা এ নামটি শুনলেই আঁৎকে উঠতে থাকে। তারা মুসান্না বিন হারেছা কিংবা তার গ্রুপের কোন এক সদস্যকে ধরতে প্রাণান্তচেষ্টা চালায় কিন্তু অসীম সাহসী হওয়া সত্ত্বেও যখন তারা গেরিলা বাহিনীর কবলে পড়ত, চরম আতঙ্ক এবং ভয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যেত।
॥ চার ॥
৬৩৩ খৃস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের কোন একদিনে মুসলিম জগতের খলীফা হযরত আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সামনে এক সাধারণ দূরদেশীর মত যিনি বসা ছিলেন তিনিই হলেন এই হযরত মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু। তিনি দক্ষিণ ইরাকের অধিবাসী এবং স্বীয় গোত্র-বনূ বকরের নেতা ছিলেন। তার ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ও নেপথ্যের বিবরণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। শুধু নিজ গোত্র নয়; বরং অত্র এলাকায় অবস্থানরত প্রত্যেকটি গোত্রের ইসলাম গ্রহণ তাঁরই অনবদ্য কৃতিত্বের ফল ছিল।
ইয়ামামা যুদ্ধের সমাপ্তির মধ্য দিয়ে যখন মুরতাদ ফেতনার অবসান ঘটে দক্ষিণ ইরাকে তখন হযরত মুসান্না বিন হারেছা রাযিয়াল্লাহু আনহু ইরানীদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড জিহাদ শুরু করেন। ইরান সাম্রাজ্যের মুসলিম প্রজাদের তিনি নিজের পক্ষে টেনে নেন এবং তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী তৈরি করেন। গেরিলা হামলার মাধ্যমে তিনি জিহাদের সূচনা ঘটান। লক্ষ্যস্থল ও টার্গেট হিসেবে প্রাথমিকভাবে সীমান্তবর্তী সেনা ব্যারাকগুলো নির্বাচন করেন। প্রতি রাতে কোন না কোন চৌকিতে গুপ্ত হামলা চলতেই থাকে। তাদের গেরিলা আক্রমণ এত তীব্র ও দ্রুত হত যে, ব্যারাকের সৈন্যরা ঘুরে দাঁড়াবার ফুসরৎ পেত না। চোখের পলকে কার্য সিদ্ধি করে তারা নিরাপদে বেরিয়ে হাওয়া হয়ে যেত।
